ফ্রান্সিস পা দিয়ে টেনে টেনে চাবির রিংটা কয়েদঘরের দরজার কাছে আনল। তারপর হাত দিয়ে টেনে কাছে আনল। হাত বাড়িয়ে কয়েদঘরের চাবিটা খুঁজতে লাগল। কিন্তু বারান্দার মশালের আলোয় দেখেও বুঝল না কোষ্টা কয়েদঘরের চাবি। হ্যারি বলল– ফ্রান্সিস আমাকেরিংটা দাও!ফ্রান্সিস রিংটা হ্যারির দিকে সরিয়ে দিল।হ্যারি খুবমনোযোগ দিয়ে চাবিগুলো একটা একটা করে সরিয়ে সরিয়ে চাবি খুঁজতে লাগল। মশালের আলোয় দেখল একটা লম্বা চাবি বেশ পরিষ্কার। বাকি চাবিগুলো কেমন ময়লা। কোনো কোনোটা আবার জংধরা। হ্যারি চাবিটা এগিয়ে আনল। বলল–ফ্রান্সিস–এই চাবি দেখো—কেমন পরিষ্কার। তার মানে এই চাবিটা নিয়মিত ব্যবহৃত হয়। তাই ময়লা জমে নি। এটাই কয়েদঘরের তালার চাবি। ফ্রান্সিস চাবিটা নিল। কয়েদঘরের দরজাটা ফাঁক ফাঁক লোহার গরাদ দিয়ে তৈরি।
ফ্রান্সিস চাবিটা নিয়ে দরজার তালার কাছে এলো। গরাদের ফাঁক দিয়ে হাত গলিয়ে চাবিটা তালার মধ্যে ঢোকাল। একটু চাপ দিয়ে জোরে মোচড় দিতেই তালাটা শব্দ করে খুলে গেল। ভাইকিংরা মৃদুস্বরে ধ্বনি তুলল–ও-হো-হো।
সবাই কয়েদঘরের বাইরে চলে এলো। আগে যারা বন্দী ছিল তারা কয়েদঘর থেকে বেরিয়েই এদিক-ওদিক ছুটে পালাল।
ফ্রান্সিস বলে উঠল–ভাইসব, তোমরা আমাদের জাহাজে ফিরে যাও। আমি মারিয়াকে নিয়ে যাচ্ছি।হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস,তুমি জানোনা রাজকুমারী এখন কোথায়?
–না, জানি না। তবে খুঁজে বের করতে হবে। লড়াইর শেষে ফার্নান্দোর সৈন্যরা নিচ্ছুই রিকার্ডোর প্রাসাদ লুঠ করবে। তার আগেই আমি মারিয়াকে নিয়ে পালিয়ে জাহাজে যাবো।
-বেশ। তাই করো। আমরা জাহাজে ফিরে যাচ্ছি। হ্যারি বলল।
দল বেঁধে যেও না। ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাও। বোঝাই যাচ্ছে রাজারিকার্ডোর সৈন্যরা হেরে গেছে। এখন রাজা ফার্নান্দোর সৈন্যরা বিশ্রাম করবে। এই সুযোগে পালাও। রাজা ফার্নান্দোর হাতে ধরা পড়লে বলবে রাজা রিকার্ডো আমাদের কয়েদঘরে বন্দী করে রেখেছিল। মুক্তি পেয়ে আমরা এখন আমাদের জাহাজে ফিরে যাচ্ছি। ফ্রান্সিস বলল।
ভাইকিংরা সামনের প্রান্তরে ছড়িয়ে পড়ল। তারপর চলল জাহাজঘাটের দিকে। ফ্রান্সিস চলল। রাজপ্রাসাদের দিকে। ফ্রান্সিস প্রান্তরে নামল। চারপাশে তাকিয়ে দেখল পূর্বদিকে কিছু সৈন্য চলাফেরা করছে।
ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমদিকে ঘুরে দাঁড়াল। দ্রুতপায়ে চলল রাজারিকার্ডোর প্রাসাদের দিকে। প্রাসাদের কাছে এসে ফ্রান্সিস প্রাসাদের সিংহদ্বারের দিকে গেল না। দূরে থেকে দেখল সিংহদ্বারের সম্মুখে রাজা ফার্নান্দোর সেনাপতি আর রাজার দেহরক্ষী দুটো ঘোড়ার চড়ে সিংহদ্বার পাহারা দিচ্ছে।
ফ্রান্সিস পেছনের দরজার দিকে গেল। রাজা রিকার্ডো পালালে পেছনের দরজা দিয়েই পালাবে।
ফ্রান্সিস পেছনের দরজার কাছাকাছি আসতেই দেখল দরজা খুলে গেল রাজবাড়ির গাড়ি বেরিয়ে এলো। ফ্রান্সিস সমস্যায় পড়ল। মারিয়া কি এই গাড়িতেই আছে? ফ্রান্সিস দ্রুত ভাবতে লাগল কী করবে এখন?
গাড়িটার দরজা জানালা বন্ধ। ফ্রান্সিস স্থির করল এই গাড়িটাই ধরতে হবে। ও গাড়িটার পেছনে পেছনে ছুটল। ততক্ষণে রাজা ফার্নান্দোর সেনাপতি আর দেহরক্ষী গাড়িটা দেখতে পেয়েছে। ওরা ঘোড়া ছুটিয়ে এলো। ফ্রান্সিস দ্রুত ছুটে গিয়ে দেহরক্ষীর ঘোড়ার রেকাবে রাখা বাঁপাটা ধরে মুচড়ে দিল। দেহরক্ষী ব্যথায় ঝাঁকিয়ে উঠল। ফ্রান্সিস এবার পা ধরে প্রাণপণে হাল্কা টান দিল। দেহরক্ষী হুড়মুড় করে ঘোড়ার পিঠ থেকে মাটিতে পড়ে গেল। পায়ের বাথায় কেঁকাতে লাগল। ফ্রান্সিস দ্রুত ঘোড়ার পিয়ে উঠে বসল। ঘোড়া চালাল রাজা রিকার্ডোর গাড়ির পেছনে।
ফ্রন্সিসের সামনে ঘোড়ায় ছুটে চলছে সেনাপতি। তার পেছনে ফ্রান্সিস ঘোড়াছুটিয়ে চলেছে। সেনাপতির হাতে খোলা তলোয়ার। বুকে বর্ম। মাথায় শিরস্ত্রাণ। ফ্রান্সিস নিরস্ত্র শুধু নিরস্ত্র নয়।কয়েদঘরে কিছুদিন কাটিয়ে আর ঐ অখাদ্য খাবার খেয়ে শরীরও দুর্বল।
ফ্রান্সিস দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে সেনাপতির চলন্ত ঘোড়ার পাশে এলো। সেনাপতি ফ্রান্সিসকে লক্ষ্য করে তলোয়ার চালাল। ফ্রান্সিস দ্রুত সরে গেল। এবার ফ্রান্সিস সেনাপতিকে ছাড়িয়ে গাড়িটার কাছে এলো। তখনও ফ্রান্সিসের মনে দ্বন্দ্ব। মারিয়া কি এই গাড়িতে আছে না প্রাসাদেই রয়ে গেছে।
চলন্ত গাড়ির পাশে এলো ফ্রান্সিস। গাড়ির দরজা জানালা বন্ধ। ফ্রান্সিস হাঁপাচ্ছে তখন। গলা চড়িয়ে ডাকল–মারিয়া। গাড়ির ভেতর থেকে মারিয়াও গলা চড়িয়ে ডাকল–ফ্রান্সিস। ফ্রান্সিসের মুখে হাসি ছুটল। ওর আন্দাজই ঠিক। ফ্রান্সিস মনে অনেক জোর পেল। যাক্–মারিয়া সুস্থ আছে। এতক্ষণে রিকার্ডোর প্রাসাদ নিশ্চয়ই আক্রান্ত হয়েছে। অন্তঃপুরেও লুঠ চলছে। মারিয়া ওখানে থাকলে বেঁচে থাকতো কিনা সন্দেহ।
ফ্রান্সিস পিছিয়ে এলো। সেনাপতিকে তাড়াতে হবে। সেনাপতির কাছে এসে ঘোড়া চালাতে লাগল। দেখল সেনাপতি তলোয়ার কোষে ধরে রেখেছে। ঘোড়ার জিনের সঙ্গে বাঁধা চাবুকটা বের করেছে। ফ্রান্সিস কাছাকাছি আসতেই সেনাপতি চাবুক হাঁকাল। ফ্রান্সিসের পিঠে চাবুকের মার লাগল। পিঠটা জ্বালা করে উঠল। সেনাপতি আবার চাবুক চালাল। এবার চাবুকের মারটা লাগল গলার কাছে। গলার কাছে জ্বালা করে উঠল। চাবুকের পরের মারটা ফ্রান্সিসের গায়ে লাগল না। কারণ ফ্রান্সিস তখন অনেকটা সরে গেছে। সেনাপতি ডান হাতে চাবুক ঘোরাতে লাগল। আবার চাবুকহাঁকাল। ফ্রান্সিস দ্রুত হাতে চাবুকটা ধরে ফেলল। তারপর সেনাপতি কিছু বোঝার আগেই চাবুকটা চেপে ধরে শরীরের সব শক্তি নিয়ে মারল হ্যাঁচকা টান। সেনাপতি ঘোড়ার পিঠে টাল খেল।ফ্রান্সিস আবার সজোরে মারল টান। সেনাপতি ঘোড়ার পিঠ থেকেছিটকে মাটিতে পড়ে গেল। ফ্রান্সিস আর দাঁড়াল না। ঘোড়া ছুটিয়া চলল।
