–না–না। আমি ভালোভাবেই আছি। মারিয়া বলে।
সেদিন এরকমই কথা প্রসঙ্গে মারিয়া বলল–
–মহামান্য রাজা–একটা প্রার্থনা ছিল।
বলো।
–আমার স্বামী তার আর বন্ধুদের আপনি সন্দেহের বশে কয়েদ করে রেখেছেন। মারিয়া বলল।
–হ্যাঁ–ওরা সত্যিই গুপ্তচরের কাজ করেছিল কিনা সেটা নিয়ে সেনাপতি তদন্ত করছে। যদি তোমার স্বামী ও বন্ধুরা নির্দোষ প্রমাণিত হয় তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তাদের মুক্তি দেওয়া হবে। রাজা বললেন।
–ঠিক আছে আপনার সিদ্ধান্ত। এই নিয়ে কিছু বলার নেই। মারিয়া আস্তে আস্তে বলল।
সেদিন যে লোকটি রাজার ক্ষতস্থান ধুইয়ে ওষুধ দিয়ে পট্টি বেঁধে দেয়–সে এলো। মারিয়া ওর কাছ থেকে ওষুধ নিয়ে রাজার ক্ষতে ওষুধ লাগিয়ে নিপুণ হাতে পাট্টি বেঁধে দিল। যে লোকটি পট্টি বাঁধে সে হেসে বলল–আপনি আমার চেয়ে ভালো পারেন। মারিয়া হেসে বলল–এসব ছোটোবেলায় মা আমাকে শিখিয়েছেন। মা আমাকে ছোট্টখাটো জ্বর সর্দি ব্যথার ওষুধও শিখিয়েছেন। রাজাও খুশি হলেন। মারিয়ার ব্যান্ডেজ বাঁধায় অনেকটা আরাম পেলেন। বললেন–তুমিই আমার পট্টি বেঁধে দেবে প্রত্যেকদিন।
এটা মারিয়ার প্রতিদিনের কাজ হল। মারিয়া মোটেই বিরক্ত হল না। ও সাগ্রহেই কাজটা করতে লাগল। ফ্রান্সিসের মুক্তির কথা মারিয়া আর বলে নি।
রাজা নিজে থেকেই ফ্রান্সিসদের মুক্তি দেবে তার জন্যেই মারিয়া অপেক্ষা করতে লাগল।
মারিয়া সারাদিন দুবেলা ফ্রান্সিসদের কয়েদঘরের সামনে আসে। মারিয়ার শরীর ভালো আছে জেনে ফ্রান্সিস খুশি হয়। দুজনে কয়েদঘরের দরজার কাছে কথাবার্তা বলে। এ সময় পাহারাদাররা কিছুটা সরে এসে দাঁড়িয়ে থাকে। ফ্রান্সিস আর মারিয়া কথা বলে মারিয়া বলে। তোমরা কেমন আছো?
কয়েদঘরে বন্দীরা যেমন থাকে–তেমনি আছি। অখাদ্য খাবার, হাত ছড়িয়ে শোবার উপায় নেই। অতিরিক্ত গরম ঘাম জলতেষ্টা এসব নিয়ে ভালোই আছি। ফ্রান্সিস বলল। মারিয়া বলে–আর আমি পালঙ্কে শুয়ে ঘুমোচ্ছি নানা সুস্বাদু খাবার খাচ্ছি।
যাকগে আমাদের নিয়ে দুশিন্তা করো না। সময় সুযোগমতো ঠিক পালাবো। ফ্রান্সিস বলল।
–রাজা বলেছে–সেনাপতি সব খোঁজখবর নিচ্ছে তোমাদের ব্যাপারে। তোমরা বিশেষ করে আলখাতিবকে সেনাপতি গুপ্তচর প্রমাণ করবার চেষ্টা করছে। মারিয়া বলল।
–হ্যাঁ–তাই সব ভোগান্তি ভুগছি আমরা। ফ্রান্সিস বলল।
–বলছিলাম-রাজাকে কি আবার তোমাদের মুক্তি দেবার কথা বলবো? মারিয়া বলল।
–কোনো লাভ নেই। আগে তো একবার বলেছো। কোনো লাভ হয়নি। ছেড়ে দাও–যা হবার হবে। ফ্রান্সিস বলল।
মারিয়া এবার হ্যারি শাঙ্কোদের ডেকে কথা বলে। তারপর চলে আসে।
সেদিন মধ্যরাত। আকাশে চাঁদ অনুজ্জ্বল। ক্যামেরিনালের জাহাজঘাট জনশূন্য। ছ’সাতটা জাহাজ কম করে নোঙর করে আছে। জাহাজগুলোয় কাঁচটাকা আলো জ্বলছে। সমুদ্রের জল ঝলাৎ ঝলাৎ শব্দে তীরভূমিতে ভেঙে পড়ছে। সমুদ্রের জলের ওপর এখানে ওখানে নীল কুয়াশার জটলা।
কুয়াশার জটলার মধ্যে দিয়ে দুটো যুদ্ধজাহাজ আস্তে আস্তে তীরে এসে ভিড়লো। যুদ্ধজাহাজ দুটো রাজা ফার্নান্দোর। দুটো পাটাতন ফেলা হল। একটা পাটাতন পাশে হাত পাঁচেক। অন্যটা সাধারণ মাপের। বোঝা গেল মোটা পাটতন দিয়ে ঘোড়া নামানো হবে।
প্রথমে একটা ধবধবে সাদা ঘোড়া নামানো হল। রাজা ফার্নান্দো জাহাজ থেকে বেরিয়ে এলো। পাটাতন দিয়ে হেঁটে তীরে উঠলেন। পেছনে সেনাপতি।
এবার সশস্ত্র সৈন্যরা পাটাতন দিয়ে হেঁটে পার হয়ে তীরের ওপরের রাস্তায় এসে সারিবদ্ধ বেঁধে দাঁড়াল।
সাদা ঘোড়াটাকে তীরের পরেই উঁচু রাস্তাটায় এলে দাঁড় করিয়ে রাখা হল। রাজা ফার্নান্দো সেখানে এলেন সাদা ঘোড়াটায় উঠলেন।
চারদিক নিস্তব্ধ। শুধু জলে ঢেউয়ের শব্দ আর শন্ শন্ বাতাসের শব্দ।
আরো দুটো ঘোড়া নামানো হল। সে ঘোড়া দুটোয় চড়ল সেনাপতি আর একজন রাজার দেহরক্ষী।
রাজা তলোয়ার উঁচিয়ে আক্রমণের ইঙ্গিত করল। সব সৈন্য আস্তে আস্তে খাপ থেকে তলোয়ার খুলল যাতে কোনোরকম শব্দ না হয়।
রাজা উত্তর মুখে ঘোড়া আস্তে আস্তে চালালেন। সৈন্যরাও পেছনে পেছনে চলল। এত সৈন্যর চলা। একটু শব্দ হল।
রাজ্য রিকার্ডো সৈন্যদের সৈন্যাবাসে পৌঁছতে দেরি হল না। রাজারিকার্ডোর সৈন্যরা তখন নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে।
হঠাৎ রাজা ফার্নান্দো তলোয়ার তুলে সৈন্যাবাস দেখাল। সঙ্গে সঙ্গে তার সৈন্যবাহিনী রাজা রিকার্ডোর সৈন্যদের আবাসে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তাদের হৈ হৈ চিৎকারে রাজা রিকার্ডোর সৈন্যরা ঘুম থেকে উঠে পড়ল। দেখল রাজা ফার্নান্দোর সশস্ত্র সৈন্যরা তাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। পালাবার পথ নেই।দু-একজন পালাতে চেষ্টা করল। কিন্তু ফার্নান্দোর সৈন্যদের হাতে মারা পড়ল।
এবার শুরু হল একপেশে লড়াই। রাজা রিকার্ডোর সৈন্যরা মারা পড়তে লাগল। শুরু হল চিৎকার আর্তনাদ গোঙানি মৃত্যু। অস্ত্রহীন রাজা রিকার্ডোর সৈন্যরা পালাতে লাগল।
ওদিকে ফ্রান্সিসরা জেগে উঠেছে। সবাই কয়েদঘরের লোহার দরজার সামনে এসে ভিড় করে দাঁড়াল। অল্প আলোয় দেখল রাজা ফার্নান্দোর সশস্ত্র সৈন্যরা। নিরস্ত্র রাজা রিকার্ডোর সৈন্যদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। রাজা রিকার্ডোর সৈন্যরা নিরস্ত্র। তারা মরতে লাগল।
কয়েদঘরের পাহারাদার সৈন্যদের ওপর রাজা ফার্নান্দোর সৈন্যরা যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল। পাহারাদার তিনজন সশস্ত্র। ওরা লড়াই চালাল। কিন্তু পারল না। দুজন ওখানেই মারা গেল। অন্য পাহারাদারটি গুরুতর জখম হয়ে কয়েদঘরের দরজার সামনে গড়িয়ে পড়ল। সেই পাহারাদারের কোমরেই গোঁজা আছে চাবির বড়ো রিংটা। ফ্রান্সিস এটাই চাইছিল। কয়েদঘরের দরজার দুপাশে মশাল জ্বলছিল। তারই আলোয় ফ্রান্সিস দেখল আহত পাহারাদারটি পাথরের বারান্দায় পড়ে আছে। ফ্রান্সিস লোহার শিকের ফাঁক দিয়ে হাত বাড়াল। আহত পাহারাদারের বুক পর্যন্ত হাত গেল। কিন্তু চাবির বড়ো রিংটা কোমরে গোঁজা। ফ্রান্সিস মেঝেয় শুয়ে পড়ল। তারপর পা বাড়াল পাহারাদারের কোমরে গোঁজা চাবির রিং-এর দিকে। আস্তে আস্তে ডানপাটা বাড়াতে বাড়াতে চাবির রিং-এর কাছে আনল। বুকে পায়ের বুড়ো আঙুলটা রিং-এর মধ্যে গলিয়ে জোরে টান দিল। চাবির রিংটা ঝাঁকুনি খেয়ে সরে এলো। কিন্তু পড়ে গেল না। ফ্রান্সিস তখন হাঁপাচ্ছে। ওদের সকলের মুক্তি নির্ভর করছে ঐ চাবির রিং-এর ওপর। ফ্রান্সিস আবার পা বাড়াল। আবার রিং-এর মধ্যে পা ঢুকিয়ে ঝাঁকুনি দিল। চাবির রিংটা কোমর থেকে খসে পাথুরে বারান্দায় পড়ে গেল।ঝং করে শব্দ হল। কিন্তু সৈন্যরা লড়াইয়ে ব্যস্ত। শব্দটা কারো কানে গেল না।
