–তাতেই হবে। আমাদের জন্যে ভেবো না। তুমি নিজে ভালো থেকো। ফ্রান্সিস। বলল।
কিছুটা এসে সৈন্যটি মারিয়াকে বলল–আমার সঙ্গে আসুন। সৈন্যটির সঙ্গে মারিয়া চলে গেল।
রাজ-অন্তঃপুরে ঢোকার দরজাটার সামনে এসে সৈন্যটি ও মারিয়া দাঁড়াল। কালো দরজায় নানা রঙীন চিত্র। মারিয়া চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে তাতেই একজন পরিচারিকা দরজা খুলে বেরিয়ে এলো। সৈন্যটি পরিচারিকাটির দিকে এগিয়ে গেল। বলল–শোনো-রাজার হুকুম–এই রাজকুমারী অন্তঃপুরে বন্দী থাকবে।নজর রাখবে পালাতে না পারে। এঁর স্বামী আর তার বন্ধুরা কয়েদঘরে বন্দী হয়ে আছে। ইনি সকালে ও বিকেলে দুবার কয়েদঘরে যেতে পারবেন। তোমরা কেউ সঙ্গে করে নিয়ে যাবে সঙ্গে করে নিয়ে আসবে। সবধান পালাতে দেবে না।
–আসুন। পরিচারিকার সঙ্গে মারিয়া রাজ-অন্তঃপুরে ঢুকল। মারিয়া দেখল– মেঝে শ্বেতপাথরের। পাথরের দেয়ালে নানা রঙের ছবি আঁকা। পরিচারিকারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। একটু এগোতেই কানে এলো বীণার সুরেলা বাজনা। যত এগোচ্ছে বাজনা তত স্পষ্ট হচ্ছে। কী সুন্দর সুরঝংকার। মারিয়া গানবাজনা কম শোনেনি।ও রাজপ্রাসাদের একটা ঘরই আছে নানা বাজনার। মারিয়ার অদ্ভুত ভালো লাগল। মারিয়া যে ঘরে বাজনার আসর বসেছে সেখানে এলো।
একটি সুসজ্জিত বিছানায় বসে এক মহিলা তন্ময় হয়ে গ্রীক বীণা বাজাচ্ছেন। চোখ ঝুঁজে বাজাচ্ছেন। তাই মারিয়াকে দেখলেন না। সহচরীরা গোল হয়ে বসে বীণার বাজনা শুনছে। মারিয়াও একপাশে বসে পড়ল।
বাজনা চলল।
একসময় বাজনা থামল। মারিয়ার তখন কান্না পাচ্ছে। এত সুন্দর বাজনা। আবার নিজেদের প্রাসাদেও তো বাজনা শুনেছে। সে কথাটাই মনে পড়তে মারিয়ার দুচোখ জলে ভরে উঠল।
মারিয়ার দিকে মহিলাটি তাকালো। যে পরিচারিকাটি মারিয়াকে নিয়ে এসেছিল সে মহিলাটিকে বলল-রানিমা। রানি ফিরে তাকালেন।
পরিচারিকা মারিয়াকে দেখিয়ে বলল-রানিমাইনি এক দেশের রাজকুমারী। এখানে এসে বন্দী হয়েছেন। মাননীয় রাজা এঁকে অন্তঃপুরে থাকতে বলেছেন।
রানি হেসে বললেন–তোমার নাম কী?
-মারিয়া।
তুমি কোন্ দেশের রাজকুমারী? রানি বললেন।
–ভাইকিং দেশের। মারিয়া বলল।
–তুমি বন্দী হলে কেন? রানি বললেন।
–আপনি তো জানেন রাজা রিকার্ডো রাজা ফার্নান্দোর সঙ্গে যুদ্ধে হেরে গেছেন। মারিয়া বলল।
–হ্যাঁ শুনেছি। রানি বললেন।
–আমরা জাহাজ চালিয়ে হুয়েভা বন্দরে এসেছিলাম। মারিয়া বলল।
–আমরা মানে কারা? রানি বললেন।
–আমি আমার স্বামী আর তার বন্ধুরা। মারিয়া বলল।
–ও। তারপর? রানি বললেন।
যুদ্ধে হেরে যাওযায় রাজা রিকার্ডোর কেমন সন্দেহহয় আমরা গুপ্তচর। আমরাই আগেভাগে রাজা ফার্নান্দোকে এই আক্রমণের কথা বলে দিয়েছি। মারিয়া বলল,
-তোমরা কি তাই করেছো? রানি বললেন।
না। আমরা এ দেশের কাউকে চিনি না, জায়গাও চিনি না।
–ও। তোমার স্বামী আর বন্ধুদের সঙ্গে তোমাকেও বন্দী করা হয়েছে।রানি বললেন।
-হ্যাঁ।তবে আমাকে কয়েদঘরে থাকতে হয়নি। রাজা রিকার্ডো আমাকে অন্তঃপুরে থাকার অনুমতি দিয়েছেন। মারিয়া বলল।
হু। তাহলে তুমি বন্দী? রানি বললেন।
–হ্যাঁ। আমরা দেশে যাবার জন্যে তৈরি হচ্ছিলাম তখনই গুপ্তচর এই বদনাম দিয়ে আমাদের বন্দী করা হয়েছে। মারিয়া বলল।
–তোমরা ভাইকিং জাতি। রানি বললেন।
হ্যাঁ। তোমরা বীর নির্ভীক। জাহাজ চালাতে ওস্তাদ তাই তো? রানি বলল।
–হ্যা–লোক তাই বলে। মারিয়া বলল।
–জিপসি কাদের বলে জানো তো? রানি বলল।
হা–জিপসিদের নিজেদের দেশে বলে কিছু নেই। যাযাবর–দেশে দেশে ঘুরে বেড়ায়। মারিয়া বলল।
–গতমাসে একদল জিপসি এসেছিল। একটি জিপসি মেয়ে, এক ভাইকিং যুবকের দুঃসাহসী অভিযানের কাহিনী নিয়ে রচিত গান শুনিয়ে গিয়েছে। রানি বললেন।
–সেই ভাইকিং যুবকের নাম ফ্রান্সিস। তাই না? মারিয়া বলল।
হা। তুমি চেনো তাকে? রানি বললেন।
–ফ্রান্সিস আমার স্বামী। মারিয়া বলল।
–সেকি! ফ্রান্সিস আর তার বন্ধুদের তাহলে এখানে বন্দী করে রাখা হয়েছে? রানি বললেন।
–আজ্ঞা হা। মারিয়া বলল।
–ও। রানি থামলেন। তারপর বললেন–রাজার মনটন এখন ভালো নেই ভাই ফার্নান্দোর কাছে যুদ্ধেপরাজিত হয়েছেন। আহতও হয়েছেন। কয়েকটা দিন যাক। রাজা একটু সুস্থ হলে তোমাদের মুক্তির কথা বলবো।
–ঠিক আছে। মারিয়া বলল। আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ।
মারিয়া অন্দরমহলেই রয়ে গেল। পরিচারক পরিচারিকারা মারিয়াকে যত্নেই রাখল। রানিও মারিয়াকে একেবারে বান্ধবীর মতো মেনে নিল। মারিয়া সুখেই রইল। কিন্তু ফ্রান্সিসদের জন্য দুর্ভাবনা কিছুতেই যেতে চায় না। সুসজ্জিত টেবিল ঝকঝকে কাঁটা চামচ থালা প্লেট। সুস্বাদু খাবার। এসবের মধ্যেও মারিয়ার মন বিষণ্ণ। ফ্রান্সিসরা না জানি কী অখাদ্য খাচ্ছে। কেমন আছে ওরা।
রানি প্রতিদিন সকালে রাজা রিকার্ডোকে দেখতে যান। মারিয়াও সঙ্গে যায়। রাজা উঠে বিছানায় বসে থাকেন। রানি এলে খুশি হন। মারিয়ার সঙ্গেও দুএকটা কথা বলেন। কিন্তু মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। রানি রাজাকে সন্ত্বনা দেন সুস্থ হন আবার যুদ্ধে নেমো। তোমার জয় হবেই। রাজা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল
না। আমার আর যুদ্ধজয়ের সম্ভাবনা নেই।
অত হতাশ হয়ে পড়ো না। রানি বলেন।
রাজা চুপচাপ থাকেন। মারিয়াকে বলেন–রাজকুমারী তোমার কোনো কষ্ট হচ্ছে না তো?
