একজন সৈন্য ফ্রান্সিসের কাছে এলো। বলল কী ব্যাপার বলো তো? ফ্রান্সিস মারিয়াকে দেখিয়ে বলল ইনি আমাদের দেশের রাজকুমারী। সেনাপতিকে অনুরোধ করবো একে যেন রাজ-অন্তঃপুরে রাখা হয়।
–কিন্তু সেনাপতি তো এখন নিজের বাড়িতে গিয়ে বিশ্রাম করছেন। যুদ্ধে হেরে গিয়ে সেনাপতির এখন মন খারাপ। উনি এখন কিছু শুনতে চাইবেন না। সৈন্যটি বলল।
–তাহলে আমাকে পাহারা দিয়ে সেনাপতির বাড়িতে নিয়ে চলো। আমাদের সমস্যাটা বুঝিয়ে বললে–উনি শুনবেন। উনি হয়ত রাজিও হবেন। সৈন্যটি একটুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল–চলল। দেখা যাক।
মারিয়া তখন একটা কাঠের বাটিভর্তি জল নিয়ে এলো। ফ্রান্সিসের দিকে এগিয়ে ধরল। ফ্রান্সিস হাসল। মারিয়াও হাসল। নিশ্চিন্ত হল যে, ফ্রান্সিসের মাথা ঠাণ্ডা হয়েছে। ভীষণ জল তেষ্টা পেয়েছে এটা ফ্রান্সিস বুঝল জল দেখে। বাটিমুখে ঠেকিয়ে ঢ ঢক্ করে জল খেয়ে নিল। বাটিটা মারিয়াকে ফিরিয়ে দিল। মারিয়া বলল–আমিও খাবো।
বেশ চলো। ফ্রান্সিস বলল। ঐ বাটিটা ছিল কয়েদঘরের। একজন সৈন্যকে মারিয়া ফিরিয়ে দিল। তারপর চলল ফ্রান্সিসের সঙ্গে। সেই সৈন্যটিই ফ্রান্সিস ও মারিয়াকে নিয়ে যাবার জন্যে এগিয়ে এলো। ফ্রান্সিস বলল–তুমি একা যেও না। আরো দুতিনজন সৈন্য সঙ্গে নাও। নইলে তুমি একা আমাদের নিয়ে যাচ্ছে–সেনাপতি এটা ভালো চোখে দেখবে না।
–তাও তো বটে। সেনাপতি রেগে গেলে বিপদে পড়বো। সৈন্যটি তখন আরও তিন সঙ্গীকে সঙ্গে নিল। সবাই চলল সেনাপতির বাড়ির দিকে।
ওদিকে লোহার গরাদের মধ্যে দিয়ে বন্ধুরা দেখছিল ফ্রান্সিস-মারিয়া যাচ্ছে। হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস নিশ্চয়ই সেনাপতির কাছে যাচ্ছে।
-কেন? শাঙ্কো বলল।
রাজকুমারীর খাবার ব্যবস্থা করতে। হ্যারি বলল।
–ফ্রান্সিস কী চায়? শাঙ্কো বলল।
–ফ্রান্সিস চায় রাজকুমারী রাজা রিকার্ডোর অন্তঃপুরে থাকুক। হ্যারি বলল।
–দেখো–সেনাপতি রাজি হয় কিনা দেখো। শাঙ্কো বলল।
মনে হয় রাজি হবে। হ্যারি বলল।
ওরা ফ্রান্সিসের চলে যাওয়া দেখতে লাগল।
তিনজন সৈন্যসহফ্রান্সিস মারিয়া সেনাপতিরআবাসের সামনে এলো। দেখল একজন প্রহরী পেতলের বর্শা হাতে পাহারা দিচ্ছে। সৈন্যটি ঐ প্রহরীর কাছে গিয়ে কী বলল। বোধহয় সেনাপতির সঙ্গে দেখা করবে এরকম কিছু বলল। প্রহরীটি ইঙ্গিতে ওদের অপেক্ষা করতে বলে বাড়িটার প্রধান দরজার সামনে গেল। বিরাট দরজা ওক কাঠের। সেই কাঠ কুঁদে কুঁদে নানা নকশা আঁকা।
দরজা খুলে প্রহরীটি ভেতরে গেল।কিছু পরে বেরিয়ে এলো। বলল–এসো। দু’জন সৈন্য বাইরে রইল। ফ্রান্সিস ও মারিয়া সৈন্যটির সঙ্গে ভেতরে ঢুকল।
একটা ঘর। ঘরের দুদিকে দুটো জানালা। তাতেও ঘরটার অন্ধকার অন্ধকার ভাবটা কাটেনি। ঘরের মাঝখানে একটা শ্বেতপাথরের গোল টেবিল। টেবিলের চারপাশে চারটে চেয়ার ওক কাঠের। পায়াগুলোও বাঁকা। বসার জায়গায় সাটিন কাপড় ঢাকা। তার নীচে পাখির পালকের গদী। ঘরের দেয়াল পালিশ করা রঙিন ছবি আঁকা। ফ্রান্সিস বসল। একটু পরেই সেনাপতি ঢুকল। পরনে সাধারণ পোশাক। ঢোলাহাতাহলুদ জামা। তাতে নীল সুতোর কাজ করা।
সেনাপতি ঢুকতে ফ্রান্সিসরা উঠে দাঁড়িয়েছিল। সেনাপতি হাতের ইঙ্গিতে ওদের বসতে বলল। দুজনে বসল। সেনাপতি ফ্রান্সিস আর মারিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল তোমরা এসেছো কেন?
আমাদের একটা কথা বলার ছিল। ফ্রান্সিস বলল।
সেনাপতি সেই সৈন্যটার দিকে তাকিয়ে বলল–তুমি একা এই দুজনকে নিয়ে এলে কেন? তুমি তো জানো এরা বন্দী।
আজ্ঞে বাইরে আমার দুজন সঙ্গী রয়েছে। সৈন্যটি বলল।
–হুঁ। সেনাপতি মুখে শব্দ করল। তারপর ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে বলল তোমরা কী বলতে চাও বলল।
–একটা নিবেদন আছে আমাদের। ফ্রান্সিস বলল।
–বলো। সেনাপতি বলল।
মারিয়াকে দেখিয়ে ফ্রান্সিস বলল-ইনি আমাদের দেশের রাজকুমারী।
–হু। সেনাপতি মুখে শব্দ করল। বলল–তোমরা কী বলতে চাও বলো।
ফ্রান্সিস বলল–বলছিলাম যে কয়েদঘরে আমাদের বন্দী করে রাখা হয়েছে সেখানে ইনি থাকতে পারবেন না। ঐ পরিবেশ এর সহ্য হবে না।
–হু। তারপর?
–যদি রাজকুমারীকে রাজ-অন্তঃপুরে থাকতে অনুমতি দেন তাহলে আমরা উপকৃত হব।
সেনাপতি মাথার চুলে একবার আঙ্গুল বুলিয়ে বলল–কিন্তু এই অনুমতি তো আমি দিতে পারি না। রাজা অনুমতি দেবেন। আমাকে রাজার কাছে যেতে হবে। তোমরা বসো। আমি রাজামশাইয়ের সঙ্গে কথা বলে আসছি। তবে তোমাদের অনুরোধ রাখবেন কিনা বলতে পারছি না। কারণ যুদ্ধে হেরে গিয়ে রাজার মন মেজাজ ভালো নেই। তবু তোমাদের কথা বলবো। তারপর দেখা যাক।
সেনাপতি উঠে দাঁড়ালো তারপর খোলা দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। ফ্রান্সিসরা অপেক্ষা করতে লাগল।
প্রায় আধঘণ্টা পরে সেনাপতি ফিরে এলো। চেয়ারে বসে বলল-রাজা সম্মতি দিয়েছেন। তোমাদের রাজকুমারীকে অন্তঃপুরে থাকার অনুমতি দিয়েছেন। একমাত্র দিনের বেলা রাজকুমারী সকালে ও বিকেলে তোমাদের মোট দুবার দেখতে যেতে পারবেন। ফ্রান্সিস মারিয়া দুজনেই খুশি।
সেনাপতি চেয়ার ছেড়ে উঠল।ফ্রান্সিস মারিয়াও উঠে দাঁড়াল। সেনাপতি সৈন্যটিকে বলল–ওদের রাজকুমারীকে তুমি অন্দরমহলে পৌঁছে দিও।
ফ্রান্সিস ও মারিয়া সেনাপতির বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো।
সৈন্যটি এবার মারিয়াকে বলল–আপনি আমার সঙ্গে চলুন। মারিয়া ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে বলল–দিনে দুবার তোমাদের দেখতে যাবো।
