খোলা দরজা দিয়ে ফ্রান্সিসরা ঢুকল। শব্দ তুলে দরজা বন্ধ হয়ে গেল। শুয়ে বসে। থাকা ভাইকিংরা চেয়ে দেখল। শুধু বিস্কো উঠে এলো। বলল–ফ্রান্সিস–পালাবার সব রাস্তাই বন্ধ। তা ছাড়া ওসব ভেবেও লাভ নেই। রাজকুমারীকে ফেলে রেখে তো পালাতে পারবে না।
–দেখা যাক। সময় বুঝে সবদিক ভেবে মারিয়াকে নিয়ে পালাবো। এখন জাহাজ তো যাবে রাজা রিকার্ডোর রাজ্যের দিকে। রাজধানী ক্যামেরিনাল বন্দর শহরে জাহাজ ভিড়বে। জাহাজ থেকে আমাদের নামিয়ে ক্যামেরিনালের কয়েদঘরে বন্দী করে রাখা হবে। ওখানকার পাহাড়ের ব্যবস্থাটা দেখবো। মারিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা করতে হবে যাতে পালাবার সময় মারিয়াকে সঙ্গে নিয়ে পালাতে পারি।
ওদিকে রাজা রিকার্ডোর সৈন্যরা ফ্রান্সিসদের জাহাজটা ওদের যুদ্ধজাহাজের হালের সঙ্গে কাছি দিয়ে বাঁধলো। রাজা রিকার্ডো সেনাপতিকে হুকুম দিল জাহাজ ছাড়বার জন্য।
কিছুক্ষণ পর যুদ্ধজানের নোঙর তোলা হল। শৌখিন জাহাজের নোঙরও ভোলা হল। তার পাল খুলে দেওয়া হল।
জনাদশেক সৈন্য দাঁড়ঘরে নেমে এলো। সমুদ্রের জলে দাঁড় টানার শব্দ হল– ছলাৎ ছলাৎ ছপছপ।
জাহাজ তিনটি চলল।
সারারাত জাহাজ চলল।
ভোর হয় হয়। তখন জাহাজতিনটি ক্যামেরিনাল বন্দরশহরের জাহাজঘাটায় পৌঁছুল।
রাজা রিকার্ডো যুদ্ধে হেরে গেছে। এই দুঃসংবাদ রাজারিকার্ডোর রাজধানীতে আগেই পৌঁছে গেছে।
সূর্য উঠলো। দলে দলে ক্যামেরিনালের অধিবাসীরা জাহাজঘাটায় জমায়েত হতে লাগল। রাজা রিকার্ডো শৌখিন জাহাজ থেকে নামলেন। প্রাসাদের মধ্যে কোনো আনন্দের হৈ-হল্লা নেই। সবাই চুপচাপ। রাজা রিকার্ডো একটা খয়েরী রঙের ঘোড়ায় চেপে রাজপ্রাসাদের দিকে ঘোড়া ছোটালেন।
কিছুক্ষণ পরে যুদ্ধ জাহাজ থেকে সৈন্যরা একে একে নামল। জাহাজঘাটায় সৈন্যরা কয়েকজন ঘোড়ায় টানা গাড়ি নিয়ে এলো। এই গাড়িগুলোয় চাষীরা শস্য নিয়ে যায়। আট-দশজন আহত সৈন্যকে সৈন্যরা ধরাধরি করে নামাল। তারপর ঐ গাড়িগুলোয় শুইয়ে দিল বসিয়ে দিল। আহত সৈন্যদের নিয়ে গাড়িগুলো আস্তে আস্তে সৈন্যাবাসের দিকে চলল।
আটজন সৈন্য এবার কয়েদঘরের সামনে এলো। প্রত্যেকের হাতেই চার-পাঁচ হাত দড়ি, কয়েদঘরের লোহার দরজা খোলা হল। একজন একজন করে ভাইকিংদের কয়েদঘরের বাইরে নিয়ে আসা হতে লাগল। তারপর দড়ি দিয়ে হাত বাঁধা হতে লাগল। একজন একজন করে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ডেক-এ নিয়ে আসা হতে লাগল।
ফ্রান্সিস হাত বাঁধা অবস্থায় ডেক-এ উঠে এলো। দেখল-মারিয়া চুপ করে ডেক এর একপাশে দাঁড়িয়ে আছে। ফ্রান্সিসরা পাটাতনের ওপর দিয়ে হেঁটে জাহাজঘাটে নামতে লাগল। ওদের পেছনে মারিয়াও নামল।
এবার বেশ কয়েকজন সৈন্য ফ্রান্সিসদের পাহারা দিয়ে নিয়ে চলল। ফ্রান্সিস দেখল–
ক্যামেরিনাল বন্দর শহরটা খুব বড়ো না। লোকবসতিও মনে হল বেশি নয়। কিন্তু বাড়িঘরদোর বেশ সাজানো গোছানো। সামনেই চাররাস্তার মোড়ে স্কুলের বাগান। অজস্র ফুল আছে। মাঝখানে এক পরীর মূর্তি। শ্বেতপাথরের। পরী ঝারি থেকে জল ঢালছে। জমা জল থেকে ফোয়ারা। বেশ উঁচু পর্যন্ত ফোয়ারার জল উঠছে।
ফ্রান্সিসরা রাস্তা দিয়ে চলল।বিদেশি পোশাক পরা দুহাত দড়ি দিয়ে বাঁধা। চারপাশের লোজন ফ্রান্সিসদের দেখতে লাগল। বোঝাই যাচ্ছে বিদেশি। কিন্তু ওদের বন্দী করা হল কেন? ওদের বোধহয় কয়েদঘরে বন্দী করে রাখা হবে।
এর মধ্যেই সূর্য আকাশে উঠে এসেছে। চড়া রোদ। ফ্রান্সিসদের অসহ্য গরমের মধ্যে হাঁটতে হচ্ছে। খাওয়া এখনও জোটে নি।ফ্রান্সিস দেখল মারিয়া ওদের পেছনে পেছনে আসছে। মাথা ঢেকে বড়ো রুমাল বেঁধে নিয়েছে মারিয়া।
সৈন্যাবাসের সামনের মাঠটায় এলোওরা। পাহারাদার সৈন্যরা ওদেরদক্ষিণ দিককার একটা পাথরের ঘরের দিকে নিয়ে চলল।
ঘরটার সামনে এসে সবাই দাঁড়াল। দুজন সৈন্য গেল ঘরটার লোহার দরজার দিকে। একটু পরেই ফিরে এলো। গলা চড়িয়ে বলল–সবাই এই কয়েদঘরে ঢোকো। ফ্রান্সিসরা এগিয়ে গিয়ে দেখল লোহার দরজা খোলা। দুজন পাহারাদার সৈন্য খোলা তলোয়ার হাতে পাহারা দিচ্ছে। একজনু চাবির গোদা হাতে দাঁড়িয়ে আছে।
ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে রইল। অন্য বন্ধুরা একে একে কয়েদঘরে ঢুকতে লাগল। হ্যারি ফ্রান্সিসের কাছে এলো। বলল
রাজকুমারী মারিয়াকে বন্দী করে কোথায় রাখা হবে?
এই নিয়ে কথা বলতে হবে। তাই দাঁড়িয়ে আছি।
–রাজা রিকার্ডোর অন্দরমহলে রাজকুমারীকে রাখতে বলল। হ্যারি বলল।
তাই বলবো। কিন্তু সেনাপতি রাজি হবে কিনা তাই ভাবছি। সৈন্যরা তাড়া দিল। হ্যারি কয়েদঘরে ঢুকে পড়ল। ফ্রান্সিস তখন দাঁড়িয়ে আছে। দুজন সৈন্য ফ্রান্সিসের কাছে এলো। বলল–এই বিদেশি ভূত–দাঁড়িয়ে আছিস কেন? ফ্রান্সিসের মাথায় রক্ত চড়ে গেল। ভাবল–এই সৈন্যটাকে আমি খালি হাতেই নিকেশ করতে পারি। অনেক কষ্টে নিজেকে সংবরণ করল। মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে। ফ্রান্সিস সৈন্যটাকে বলল তোদের সেনাপতির সঙ্গে কথা বলবো। তাই দাঁড়িয়ে আছি। সেনাপতি কোথায়?
–সেনাপতি তোর চাকর নাকি–ডাকলেই আসবে। একজন সৈন্য বলল।
আমরাই কি তোদের চাকর নাকি। ফ্রান্সিস বলল।
–চাকর ছাড়া কি। সৈন্যরা বলল।
-তবে রে।কথাটা ফ্রান্সিস সৈন্যটির কোষবদ্ধ তলোয়ারটা দ্রুত হাতে একঝট্রায় খুলে আনল। তলোয়ারটা উঁচিয়ে বলল–তুইও একটা তলোয়ার নে। দু তিনজন সৈন্য তলোয়ার কোষমুক্ত করে ছুটে এলো। ফ্রান্সিসের তখন রুদ্রমূর্তি। তলোয়ার উঁচিয়ে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। লড়াই শুরু হয় হয়। মারিয়া ছুটে এলো। চিৎকার করে বলল-ফ্রান্সিস রোগে যেও না। মাথা ঠাণ্ডা করো। আমাদের বিপদ বাড়িও না। তলোয়ার ফেলে দাও। ফ্রান্সিসের অনড় শরীরটা নড়ল। তলোয়ারটা ছুঁড়ে ফেলল। সৈন্যরাও তলোয়ার কোষবদ্ধ করল।
