রাজকুমারীকে এনে যখন তার জন্যে নির্দিষ্ট কেবিনঘরে রাখা হল তখন নিজেকে বড়ো একা মনে হল। কিন্তু উপায় নেই। রাজা রিকার্ডোর সন্দেহের এখনও নিরসন হয় নি। এখনও তার বিশ্বাস ফ্রান্সিস হ্যারি আর আলখাতিব গুপ্তচরবৃত্তি করেছে। এই গুপ্তচরদের বিশেষ করে আলখাতিবের আগাম খবরের জন্যেই তাকে পরাজয় মেনে নিতে হয়েছে।
ওদিকে সেনাপতি ফ্রান্সিসের কাছে এলো। বলল–আমার সঙ্গে চলো তোমাদের কেবিনঘরগুলো তল্লাশি চালাবো।
–শুধু আমার আর রাজকুমারীর কেবিনঘরটা তল্লাশি নিলে হত না? ফ্রান্সিস বলল।
না আমরা সব কেবিনঘর দেখবো। সেনাপতি বলল।
–বেশ। চলুন। ফ্রান্সিস বলল।
–আমিও যাবো। হ্যারি বলল। সেনাপতি হ্যারির দিকে তাকাল। বলল–বেশ তো চলো।
তিনজনে যুদ্ধজাহাজ থেকে ফ্রান্সিসদের জাহাজে উঠে এলো। সেনাপতি একে একে খালি কেবিনঘরগুলো ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল। দামি কিছুই পেল না। ফ্রান্সিসকে জিজ্ঞেস করল- তোমার আর রাজকুমারীর কেবিঘর কোন্টা? ফ্রান্সিস ওর আর রাজকুমারীর কেবিনঘরটা দেখাল। সেনাপতি সেদিকে চলল।ফ্রান্সিস তখন উত্তেজনায়। একটু কেঁপে কেঁপে উঠেছে। মারিয়ার চামড়ার ব্যাগে সোনার অনেক চাকতি রাখা হয় আছে। মারিয়া তো সেসব সরাবার সময়ও পায়নি। ধরা পড়তেই হবে। রাজা রির্কাডো সব নিয়ে নেবে। হাসবে। উল্লসিত হবে। ভালো দাও মারা গেছে। যেভাবে তোক যখন ওরা মুক্তো হবে তখন হাতে একটা সোনার চাকতিও থাকবে না। এসব ভাবতে ভাবতে নিজের কেবিনঘরে ঢুকল। সেনাপতি হ্যারিও ঢুকল।
সেনাপতি কাপড় চোপড় সরিয়ে খুঁজতে লাগল। দুটো লম্বাটে ছোটো বাক্সও পেল। একটাতে দেখল সেলাই ফোঁড়াইয়ের সরঞ্জাম। অন্য বাক্সটায় বোম পিন এসব রয়েছে।
কিন্তু সেনাপতি হাল ছাড়ল না। মারিয়ার ব্যাগগুলি খুলে খুলে দেখতে লাগল। বড়ো বড়ো ব্যাগগুলোর নতুন পুরোনো পোশাক। সেই পোশাকের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে খুঁজতে লাগল। বেশ কিছুক্ষণ সেনাপতি তল্লাশি চালালো। দামি বলতে পেল–হাতলে সোনারুপোর কাজ করা দুটো চিরুনি। দুটো চিরুনিই সেনাপতি নিল।
–ও দুটো চিরুনি রাজকুমারীর। চিরুনি দুটো রেখে দিল। হ্যারি বলল।
বা। এতে সোনারুপোর কাজ করা। কাজেই দামি। রাজাকে দিতে হবে। একেবারে খালি হাতে রাজার কাছে গেলে রাজা যাচ্ছেতাই বলে আমাকে অপমান করবে। সেই আপমানের হাত থেকে তো বাঁচা যাবে। সেনাপতি বলল।
–তাহলে নিয়ে যান। ফ্রান্সিস বলল।
তিনজনে যুদ্ধজাহাজে ফিরে এলো। সেনাপতি রাজা রিকার্ডোর কাছে চলল। ফ্রান্সিস জোরে দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়ল। বলল–মারিয়া সোনার চাকতিগুলো দামি পাথরগুলো কোথাও লুকিয়ে রেখেছে। সেসব রাজা রিকার্ডোর হাতে পড়ল না– আমরা বেঁচে গেলাম।
–দেখতে হবে না ফ্রান্সিস, এ রাজকুমারীর কাজ। উনি দারুণ বুদ্ধিমতি। হ্যারি বলল।
দুজনে খুঁজে খুঁজে মারিয়ার কেবিনঘরে এলো।ফ্রান্সিস বলল–ঘরটা কেমন?মারিয়া বলল –একটা যুদ্ধ জাহাজ কত বিলাসী আয়োজন থাকে। যা আছে তার সমস্তই অধিকার নিতে হবে। এবার হ্যারি গলা নামিয়ে বলল–রাজকুমারী–রাজা রিকার্ডোর সেনাপতি আমাদের জাহাজে আপনার আর ফ্রান্সিসের ঘরে তন্নতন্ন করে খুঁজছে।
–কিছু পায় নি এই তো। মারিয়া দেখে বলল।
–হ্যাঁ শুধু আপনার চিরুনি দুটো পেয়েছে। ঐ দুটোতে তো সোনারুপোর কাজ আছে। তাই তাই নিয়েছে। হ্যারি বলল।
–চিরুনি দুটো ফেরা নিতে হবে। মারিয়া বলল।
–কিন্তু আমাদের সোনার চাকতিগুলো–ফ্রান্সিস বলতে গেল। মারিয়া হেসে ফ্রান্সিসকে হাত তুলে থামাল। ডান পায়ের কাছে গাউনটা তুললো। ফ্রান্সিস আর হ্যারি দেখল– একটা কাপড়ের ব্যাগমত পায়ের সঙ্গে ফিতে দিয়ে শক্ত করে বাঁধা।
–এটা তো–হ্যারি বলতে গেল।
হা কাপড়ের ব্যাগ। এর মধ্যেই ঠেসে ভরা আছে সোনার চাকতিগুলো আর মণি-মাণিক্য দামি পাথর–আর সব দামি জিনিস। মারিয়া বলল।
আশ্চর্য! ফ্রান্সিস আর হ্যারি মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। ফ্রান্সিস বলল তুমি কখন–মানে–
–রাজা রিকার্ডোর জাহাজ আমাদের জাহাজের দিকে আসছে দেখেই বুঝলাম আমরা বিপদে পড়লাম। রাজা রিকার্ডো সোনার খোঁজে আমাদের জাহাজ তল্লাশি করবেই। তখনই এই ব্যবস্থা করলাম। ফ্রান্সিস হেসে বলল–তোমার বুদ্ধির প্রশংসা করতে হয়।
সেনাপতি এসে দাঁড়াল। বলল–তোমরা এখানে? কয়েদঘরে চল।
ফ্রান্সিস বলল–মারিয়া দুশ্চিন্তা করো না, ভয় পেয়ো না। আমরা মুক্তো হবোই।
দুজনে সেনাপতির সঙ্গে হেঁটে চলল। সিঁড়ি ঘরের সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে লাগল। ফ্রান্সিস অস্ফুটস্বরে বলল–হ্যারি আবার সেই বন্দী জীবন, বিনা অপরাধে।
–রাজা রিকার্ডোর সূন্দেহ অত সহজে যাবে না। হ্যারি বলল।
–হ্যা–কপালে ভোগান্তি আছে। ফ্রান্সিস বলল।
নীচে যে ঘরটার সামনে এসে ওরা দাঁড়াল সেখানে এই দিনের বেলাও অন্ধকার অন্ধকার একটা কাঁচ-ঢাকা মোমবাতি জ্বলছে। তাতেই যতটুকু অন্ধকার কেটে গেছে। মোটা লোহার গরাদ দেওয়া ঘর। দুজন পাহারাদার পাহারা দিচ্ছিল। তাদের একজনকে সেনাপতি ইঙ্গিত করল। সে কোমরে ঝোলানো চাবির গোছা থেকে চাবি নিয়ে ঘরের দরজা খুলল। শব্দ হল ঢ–অং। সেনাপতি বলল–ভেতরে ঢোক। ফ্রান্সিস একবার চারদিকে তাকাল? আর কেউ নেই। শুধু পাহারাদার দুজন আর সেনাপতি। কয়েদঘরের দরজা খোলা। একবার যদি নিজেদের ডাক দেয়। দরজা খোলা পেয়ে ওরা অনায়াসে ছুটে আসতে পারে। সেনাপতি আর দুজন পাহারাদারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। পাহারাদার দুজন আর সেনাপতিকে উল্টে কয়েদঘরে ঢুকিয়ে দরজায় তালা দিয়ে, অনায়াসে ওরা পালাতে পারে। ফ্রান্সিস দীর্ঘশ্বাস ফেলল অসম্ভব। তাহলে মারিয়াকে ফেলে পালাতে হয়। মারিয়ার নিরাপত্তার জন্যে ওরা মনের দিক থেকে দুর্বল।
