সেনাপতি ফ্রান্সিসের কাছে এলো। মৃদুস্বরে বলল–
–রাজা রিকার্ডো তোমাদের কী শাস্তি দিয়েছেন তা তুমি জানো?
–হ্যাঁ জানি। ফ্রান্সিস বলল।
–তোমার বন্ধুদের সেটা বলো। সেনাপতি বলল।
এবার ফ্রান্সিস বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল–ভাইসব–রাজা রিকার্ডো বলেছে এই জাহাজের নিচের দিকে একটা কয়েদখর মতো আছে আমাদের সেখানে বন্দী করে রাখবে যাতে আমরা পালাতে না পারি। ক্যামেরিনালে রাজা রিকার্ডোর রাজত্ব। সেখানে আমাদের বন্দী করে রাখা হবে। ভাইকিংদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হল। শাঙ্কো বলল ফ্রান্সিস আমরা এভাবে বন্দীদশা মেনে নেব?
এছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। অসময়ে লড়াইয়ের ফল তো দেখলে–তিনজন প্রিয়বন্ধুকে হারালাম। ফ্রান্সিস বলল।
সেনাপতি তাড়া লাগাল–এবার সবাই সিঁড়ির দিকে চলল। নিচে নামতে হবে। ভাইকিংরা আর কেউ কিছু বলল না। সিঁড়িঘরের দিকে চলল। ফ্রান্সিস সেনাপতিকে বলল–দেখুন–একটা অনুরোধ ছিল।
–সেনাপতি বলল–বলো।
ফ্রান্সিস মারিয়াকে দেখিয়ে বলল–ইনি আমাদের দেশের রাজকুমারী।কয়েদ-ঘরের কষ্ট ইনি সহ্য করতে পারবেন না। এঁকে কোনো কেবিনঘরে রাখুন।
–দেখি–রাজাকে বলে। সেনাপতি বলল।
মারিয়া মাথা ঝাঁকিয়ে বললনা–না। আমি তোমাদের সঙ্গেই থাকবো।
–মারিয়া-জাহাজের নিচের কয়েদঘরে কী অমানুষিক কষ্ট তা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। ফ্রান্সিস বলল। হ্যারি কাছেই ছিল। বলল–ফ্রান্সিস ঠিক কথাই বলেছেন রাজকুমরী। আমাদের সঙ্গে আপনার থাকা চলবে না।
মারিয়া আর কোনো কথা বলল না।
সেনাপতি চলে গেল শৌখিন জাহাজটায়। রাজার সঙ্গে কথা বলে এলো। ফ্রান্সিসদের কাছে এসে বলল উনি রাজকুমারীকে দেখতে চান কথা বলতে চান।
–বেশ তো চলুন। ফ্রান্সিস বলল।
–না। রাজমশাই একা কথা বলতে চান। সেনাপতি বলল।
–বেশ রাজকুমারীকে নিয়ে যান। ফ্রান্সিস বলল।
কয়েকজন সৈন্যসহ সেনাপতি শৌখিন জাহাজের ডেকটা কাছাকাছি আনল। মারিয়াকে বলল–উঠে যান। মারিয়া দুই জাহাজের অলী ফঁকটা ডিঙিয়ে গেল। তারপর সেনাপতির পেছনে পেছনে চলল।
মারিয়াকে রাজার কেবিনঘরে পৌঁছে দিয়ে সেনাপতি চলে এলো। রাজা রিকার্ডোর কেবিনখরটা মারিয়া তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল। মারিয়া রাজপ্রাসাদে বড়ো হয়েছে। এসব ওর কাছে নতুন কিছু নয়। ও অবাক হল না। যেমন ফ্রান্সিসরা হয়েছিল।
রাজা রিকার্ডো হেসে বললেন–শুনলাম তুমি নাকি রাজকুমারী।
–হ্যাঁ মারিয়া বলল।
–কোন্ দেশের? রাজা বললেন।
–ভাইকিং দেশের। মারিয়া বলল।
–তা রাজপ্রাসাদ আর সেখানকার আরাম আয়েস ছেড়ে এভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছেন কেন?
–আমার স্বামীর ইচ্ছেই আমার ইচ্ছে। মারিয়া বলল।
–বেশ ভালো রাজা বললেন।
–এইভাবে দেশে দেশে দ্বীপে দ্বীপে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন আমার স্বামী। আমিও তার সঙ্গে ঘুরে বেড়াই। মারিয়া বলল।
–ও। এসব এক ধরনের পাগলামি। রাজা বললেন।
–বাইরে থেকে দেখলে তাই মনে হবে। মারিয়া বলল।
–তোমার ভালো লাগে এসব? রাজা বললেন।
–নিশ্চয়ই। মারিয়া বলল।
যাক গে–এসব কথা। একটু থেমে রাজা রিকার্ডো বললেন–
–তোমার সঙ্গে নিশ্চয়ই দামি দামি গয়নাগাঁটি আছে? আঙ্গুলের আংটিটা দেখিয়ে মারিয়া বলল–শুধু এই আংটিটা ছাড়া আমার কোনো গয়নাগাঁটি নেই।
–উঁহু তুমি মিথ্যে কথা বলছো। রাজা বললেন।
–ঠিক আছে। আপনি তল্লাশি তো হবেই রাজা বললেন।
–তোমাদের জাহাজে তল্লাশি করান। মারিয়া বলল।
–তাহলে তো সবই জানবেন। মারিয়া বলল।
–তোমার স্বামীর নাম কী? রাজা বললেন।
–ফ্রান্সিস। মারিয়া বলল।
–আমার হাতে আজ চাবুকের মার খেয়েছে। রাজা বললেন।
–হ্যাঁ। মারিয়া মাথা ওঠানামা করে বলল।
–ঠিক আছে। তোমাদের দুজনকে আলাদা কেবিনঘর দেওয়া হবে। রাজা বললেন।
দুজন নয়–একজন। মারিয়া বলল।
তার মানে? রাজা বললেন।
–শুধু আমি থাকবো। ফ্রান্সিস থাকবো না। মারিয়া বলল।
–সে কি ঐ কয়েদঘরে থাকবে নাকি? রাজা বললেন।
–হ্যাঁ বন্ধুদের সঙ্গে ফ্রান্সিস ঐ কয়েদঘরেই থাকবে। মারিয়া বলল।
–ও। তাহলে তুমি একাই থাকবে? রাজা বললেন।
–হ্যাঁ।
দরজায় দ্বারী ছিল পাহারায়। গায়ে যোদ্ধদের বেশ। হাতে পেতলের ঝঝকে বর্শা। রাজা রিকার্ডো তুড়ি দিল। দ্বারী এগিয়ে এসে মাথা নুইয়ে দাঁড়াল। রাজা বললেন সেনাপতিকে ডাক। দ্বারী চলে গেল। একটু পরেই সেনাপতি এলো। রাজা বললেন–
–এই রাজকুমারী যে কেবিনঘরে থাকতো সেই ঘরটায় তল্লাশি চালাও। নিশ্চয়ই সোনাদানা দামি পাথরটাথর পাওয়া যাবে। কী বলেন?
আজ্ঞে হ্যাঁ। এরা গুপ্তধনও খুঁজে বেড়ায়। কাজেই এদের কেবিনঘরে মূল্যবান কিছু পাওয়া যাবেই। সেনাপতি বলল।
–হুঁ। তাহলে আপনি যান আর তল্লাশি চালান আর এই রাজকুমারীকে একটা কেবিনঘরে রাখবেন। রাজা বললেন।
সেনাপতি মাথা নুইয়ে বলল ঠিক আছে। আপনার হুকুমমতো সব কাজ হবে।
মারিয়াকে নিয়ে সেনাপতি বেরিয়ে আসছে তখন মারিয়া ঘরটা আর একবার ভালো করে দেখল। ভাবল–আমাদের প্রাসাদে বাবার মন্ত্রণাকক্ষও এর চেয়ে সুন্দর। তবে রাজা রিকার্ডো বড়লোক সন্দেহ নেই। ওদিকে ভেন যুদ্ধে আহত বন্ধুদের চিকিৎসা করতে শুরু করল। ভালো ওষুধ পেয়েছে। তাই ভাবলসবাইকে সুস্থ করা যাবে। মারিয়া সেনাপতি যুদ্ধ জাহাজে ফিরে এলো। ফ্রান্সিস এগিয়ে এলো। বলল– রাজা কী বললেন?
ঐ রাজার কেমন ধারণা হয়েছে আমার কেবিনে মূল্যবান কিছু গোপন রাস্তা আছে। সেনাপতিকে হুকুম দিয়েছে সেসব খুঁজে বের করতে। আমি আঙুলের একটি আংটি দেখিয়ে যখন বললাম –এই আংটি ছাড়া আমার কাছে দামি কিছু নেই। কথাটা শুনে রাজা যেভাবে তাকালো তাতে বুঝলাম কথাটা উনি বিশ্বাস করেন নি। মারুক গে।
