–তা তো আমরা করি নি। আমরা সবাই এখনও এ তল্লাট ছেড়ে পালই নি। ফ্রান্সিস বলল।
–কিন্তু তীর থেকে দূরে গিয়ে তোমাদের জাহাজ নোঙর করেছে। রাজা বললেন।
আমরা যুদ্ধে জড়াতে চাই নি। হ্যারি বলল।
–কিন্তু আমার যুদ্ধ জাহাজ এই হুয়েনভা বন্দরে আসবে যুদ্ধ করার জন্যে–এই, সংবাদটা তোমরা আগেই ফার্নান্দোকে জানিয়েছো। রাজা বললেন।
–এসব মিথ্যে অপবাদ। হ্যারি বলল।
রিকার্ডো চিৎকার করে বলে উঠল–থামো। তারপর সেনাপতির দিকে তাকিয়ে বললেন–সবকটাকে বেত মারুন।
সেনাপতি ছুটে বেরিয়ে গেল। একটু পরেই একজন পাহারাদারকে নিয়ে কেবিনে ঢুকলো। তার হাতে চাবুক জড়ানো। রিকার্ডো প্রথমে আলখাতিবকে দেখিয়ে বলল –আগে এটাকে মার। গুপ্তচরবৃত্তির শাস্তিটা আগে ওটাকে বুঝিয়ে দে। পাহারাদার এগিয়ে এলো। ফ্রান্সিস ডানহাত তুলে চিৎকার করে উঠল–আমাদের অন্যায়ভাবে চাবুক মারা হচ্ছে। চাবুকের মার খাবার মতো কোনো কাজ আমরা করি নি। রাজা রিকার্ডো এক ঝটকায় উঠে পড়লেন। গা থেকে চাদরটা খসে পড়ল। খালি গায়ে দ্রুত পাহারাদারের কাছে এলেন। চাবুকটা কেড়ে নিয়ে এলোপাথারি ফ্রান্সিসদের গায়ে চাবুক মারতে লাগলেন। ফ্রান্সিস হ্যারিকে আড়াল করে দাঁড়াল। এই চাবুকের মার হ্যারি সহ্য করতে পারবে না। চাবুকের মার চলল। আলখাতিব সহ্য করতে পারল না। আর্তনাদ করে উঠল। ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো নিঃশব্দে মার খেতে লাগল। রাজারিকার্ডো এক সময় চাবুক ফেলে দিয়ে হাঁপাতে লাগলেন। বাঁ বাহুতে তলোয়ারের কোপ পড়েছে। আহত। বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছেন। কাজেই অল্পক্ষণের মধ্যেই রাজা রিকার্ডো চাবুক মারা বন্ধ করলেন। তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে সেনাপতির দিকে তাকিয়ে বললেন –সবকটাকে বন্দী করুন। আমার রাজ্যে নিয়ে চলুন। চাবুকের মারের জন্যে পিঠ জ্বলে যাচ্ছে ফ্রান্সিসদের। আন্দাজে বুঝল –পিঠে রক্ত বেরিয়েছে। চাবুক পিঠ কেটে বসে গেছে। ফ্রান্সিস চোখ বুজে মার খেয়েছে। এবার চোখ খুলে বলল —
আমার বন্ধুদের কী হবে?
–আমার যুদ্ধ জাহাজের একেবারে নিচে আছে ছোটো কয়েদঘর। সবাইকে সেখানে রাখা হবে। রাজা বললেন।
ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বলল–হ্যারি–তুমি ভালো আছো তো।
–তুমি তো আমাকে চাবুকের মার খেতেও দাওনি। সব মার নিজে গায়ে নিয়েছে। হ্যারি বলল।
–শাঙ্কো? ফ্রান্সিস শাঙ্কোর দিকে তাকিয়ে বলল।
–আমি ভালো আছি। শাঙ্কো বলল।
–জ্বালা যন্ত্রণা। ফ্রান্সিস বলল।
–তা তো হবেই। কিন্তু আমি সহ্য করছি। আমার জন্যে ভেবো না। শাঙ্কে বলল।
তখনই একজন সৈন্য ছুটতে ছুটতে কেবিনঘরে ঢুকল। রাজা রিকার্ডোকে মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল–একদল বিদেশি আমাদের যুদ্ধ জাহাজ আক্রমণ করেছে। তখনই বাইরে হৈ হল্লা চিৎকার আহতদের আর্তনাদ শোনা গেল। ফ্রান্সিস হ্যারির দিকে চেয়ে বলল–হ্যারি–সর্বনাশ হল। এই অবস্থায় বোকার মতো লড়াইয়ে নেমেছে।
রাজা রিকার্ডো চিৎকার করে বলল–যারা সুস্থ আছে তাদের লড়াইয়ে নামতে বলল। হোক লড়াই।
–একটু ধৈর্য ধরতে পারল না। হ্যারি মৃদুস্বরে বলল।
–হ্যাঁ ইশ্বর–ওরা এটা কী করল। শাঙ্কে বলল।
রাজা রিকার্ডো বলল–যাও তোমাদের বন্ধুদের লড়াই বন্ধ করতে বলো।
বেশ–আমরা যাচ্ছি। ফ্রান্সিস বলল।
রিকার্ডোর শৌখিন জাহাজ থেকে ফ্রান্সিসরা রিকার্ডোর যুদ্ধ জাহাজে উঠে এলো। দেখল ভাইকিংদের সঙ্গে রিকার্ডোর সৈন্যদের জোর লড়াই চলছে জাহাজের ডেক-এ। ফ্রান্সিস দুহাতে চেটো গোল করে মুখের কাছে এনে চিৎকার করে বলল–ভাইসব লড়াই থামাও। তখন বিস্কোকে দেখল ফ্রান্সিস। বিস্কো তলোয়ার চালাতে চালাতে বলল– আমরা শুনেছি– তোমাদের চাবুক মারা হয়েছে। তার বদলা নিচ্ছি। ফ্রান্সিস আবার চিৎকার করে বলল–বিস্কো ফ্লেজার–তোমরা লড়াই থামাও। আমার কথা শোনো। বদলা নেবার সময় এখন নয়।
আস্তে আস্তে লড়াই থেমে গেল। ডেক-এ শোনা গেল আহতদের আর্তনাদ গোঙানি। ফ্রান্সিস ডেক-এ উঠে এলো। বলল- বিস্কো শাঙ্কো তোমরা দেখো আমাদের বন্ধুদের কী অবস্থা। শাঙ্কে বিস্কো আহত বন্ধুদের খুঁজে খুঁজে নিয়ে এলো ডেক-এ। দেখা গেল তিনজন ভাইকিং বন্ধু মারা গেছে। তিনটি বন্ধুর মৃতদেহ ডেক-এ রাখা হল। ফ্রান্সিসরা তাদের ঘিরে দাঁড়াল। ভাইকিং বন্ধুরা কেউ কেউ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ফ্রান্সিসের চোখেও জল। কত সুখ আনন্দে দুঃখের বন্ধু এরা তিনজন। ভেনকে ডাকা হল। মারিয়াও ততক্ষণে লড়াই থেমে গেছে দেখে যুদ্ধ জাহাজের ডেক-এ এসেছে। মৃত বন্ধুদের দেখে মারিয়া চিৎকার করে কেঁদে উঠল। ফ্রান্সিস দেখল। কিছু বলল না।
ততক্ষণে ভেন এসে গেছে। ওর জোব্বামতো পোশাকের পকেট থেকে একটা ছেঁড়া খোঁড়া বাইবেল বের করল। একটা পাতা খুলে একটু পড়ল। বলল–আমেন। সবাই মৃদুস্বরে বলল, আমেন।
তিনটি মৃতদেহ পর পর তুলে সমুদ্রের জলে নিক্ষেপ করা হল। বন্ধুরা কিছুক্ষণ নতমস্তকে দাঁড়িয়ে রইল।
ফ্রান্সিস এতক্ষণে লক্ষ্য করল যে রাজা রিকার্ডোর সৈন্যরা ওদের ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। ফ্রান্সিস বুঝল একটু বেচাল হলে এরা ঝাঁপিয়ে পড়বে।
সেনাপতি ভেন-এর কাছে গেল। বলল–আমাদেরও সাতজন সৈন্য মারা গেছে। তাদের শেষকৃত্যটা আপনি করুন।
–চলুল। ভেন বলল।
ভেনকে সেনাপতি নিয়ে ডেক-এর শেষদিকে এলো। দেখা গেল সাতটা মৃতদেহ পড়ে আছে। ভেন জোব্বামতো পোশাকের পকেট থেকে ছেঁড়াখোঁড়া বাইবেলটা বের করল। আধপাতা পড়ল। অন্য সৈন্যরা মৃতদেহগুলি পরপর সমুদ্রের জলে ফেলে দিল। এতগুলি মৃত মানুষ। সবাই জলে নিক্ষিপ্ত হল। নিজের বন্ধুদের জন্যে তো বটেই শত্রু পক্ষের মৃত সৈন্যদের জন্যেও ফ্রান্সিসের চোখ ভিজে উঠল।
