–রাজা রিকার্ডোই প্রথমে বুঝতে পারেন। আমাদের জাহাজ দুটো যখন তীরে ভিড়ল তোমরা তোমাদের জাহাজ মাঝ সমুদ্রের দিকে এখানে চলে এলে। সেনাপতি বলল।
–আমরা যুদ্ধে জড়াতে চাইনি। ফ্রান্সিস বলল।
–গুপ্তচরবৃওি কি যুদ্ধে জড়ানো না? সেনাপতি বলল।
নিশ্চয়ই।কিন্তু আমাদের মিথ্যে অপরাদ দেওয়া হচ্ছে। গুপ্তচরবৃওি করে আমাদের কী লাভ? ফ্রান্সিস বলল।
–প্রচুর স্বর্ণমুদ্রা। সেনাপতি বলল। ফ্রান্সিস রাগম্বরে গলা চড়িয়ে বলল–না– আমরা গুপ্তচরবৃওি করি নি। আমরা এই প্রথম রাজা ফার্নান্দো আর রাজা রিকার্ডোর লড়াইর খবর জানলাম। ফ্রান্সিস বলল।
সেনাপতি একটু চুপ করে থেকে বলল–তাহলে শোনো-লড়াই শুরুর পরে আমাদের জাহাজের নজরদার একটা লোককে সমুদ্রে সাঁতরে গিয়ে তোমাদের জাহাজে উঠতে দেখেছে।
হ্যাঁ–একজন এ দেশীয় লোকনাম আলখাতিব আমাদের জাহাজে এসে আশ্রয় নিয়েছে। ফ্রান্সিস বলল।
–তাকে দিয়েই তোমরা গুপ্তচরবৃওি করিয়েছে। সেনাপতি বলল।
–ঠিক আছে। আলখাতিবকে ডাকছি। ওকেই জিজ্ঞেস করুন। ফ্রান্সিস কথাটা শেষ করে বিস্কোর দিতে তাকাল। বলল–আলখাতিবকে নিয়ে এসো।
বিস্কো কিছুক্ষণের মধ্যেই আলখাতিবকে নিয়ে এলো।
ফ্রান্সিস বলল–আলখাতিব বলো তো তুমি কি আগে আমাদের কখনো দেখছো।
–না। আলখাতিব মাথা নেড়ে বলল।
সেনাপতি বলল—শোন্–তুই আগে থেকেই এদের চিতিস। এদের কথামতোই তুই গুপ্তচরের কাজ করতিস।
আলখাতিব ভীত মুখে বলে উঠল—না না আমি এদের আজকেই প্রথম দেখলাম। –
-তুই কোথায় থাকিস? সেনাপতি বলল।
–এই হুয়েনভা নগরে। আমাদের বাড়িঘর তৈরির পৈতৃক ব্যবসা।
–তুই সমুদ্র সাঁতরে এই জাহাজে এসে উঠলি কেন? সেনাপতি বলল।
–এরা বিদেশি বলে। এখানে বিপদে পড়বে না বলে। আলখাতিব বলল।
–বিপদের কথা ভেবেছিলি কেন? সেনাপতি বলল।
–এখানে রাজা ফার্নন্দোর কয়েদঘরে আমি বেশ কয়েক বছর বন্দী হয়ে ছিলাম। আজকে লড়াইয়ের ডামাডোলে কয়েদঘরের লোহার দরজা ভেঙে আমরা যারা বন্দী ছিলাম সবাই পালিয়েছি। আলখাতিব বলল।
–তোকে বন্দী করা হয়েছিল কেন? সেনাপতি বলল।
–সে অনেক কথা। আলখাতিব বলল।
–তবু অল্প কথায় বল্। সেনাপতি বলল। একটু থেমে আলখাতিব বলতে লাগল–সেভিলে প্রায় দেড়শ বছর আগে মাডিস নামে এক রোমান সম্রাট রাজত্ব করতেন। তাঁর রাজ্য আক্রান্ত হতে পারে এই আশঙ্কায় তাঁর রাজকোষের বহু মূল্যবান পাথর সোনার চাকতি এসব জিরাল্ডাটাওয়ারে লুকিয়ে রেখেছিলেন। এই জিরাল্ডা টাওয়ার তিনিই নির্মাণ করিয়েছিলেন। এই ব্যাপারে তিনি আমার প্রপিতামহের মোনক্কার সাহায্য নিয়েছিলেন। আমরা বংশনুক্রমিক সেই গল্প শুনে আসছি। মোনক্কা ছিলেন স্থপতি-বাড়িঘর তৈরি করতেন।
–হুঁ। তারপর? সেনাপতি মাথা ওঠানামা করে বলল।
–রাজা ফার্নান্দোর এক মন্ত্রী জানতো সেটা। ঐ মন্ত্রীই রাজাকে বলে আমাকে বন্দী করায়। চাবুক মেরে আমার কাছ থেকে জানতে চায় এই রাজকোষ গোপনে রাখার ব্যাপারে আমি কিছু জানি কি না। আমি বললাম আমি এসবের কিছুই জানি না। মন্ত্রী সেকথা মানলে না। আমাকে কয়েদঘরে বন্দী করল। আজকের লড়াইয়ের ডামাডোলের মধ্যে কয়েদঘর থেকে পালালাম।
–হুঁ। যাক তোমাকে রাজা রিকার্ডোর কাছে যেতে হবে।
–আমরা? ফ্রান্সিস বলল।
–আর হা–ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে বলল–তোমাকেও যেতে হবে।
–বেশ যাবো। সঙ্গে আমার এক বন্ধুও যাবে। ফ্রান্সিস বলল।
–বেশ–চলো। সেনাপতি বলল।
ফ্রান্সিসদের জাহাজের সঙ্গে শৌখিন জাহাজটার দূরত্ব মাত্র তিন হাত। সেনাপতি আর সঙ্গের দুজন সৈন্য লাফিয়ে আগে শৌখিন জাহাজটায় উঠল। ফ্রান্সিস হ্যারি আর শাঙ্কো পরে উঠল। সবশেষে আলখাতিব।
ওরা রাজা রিকার্ডোর শয়নকক্ষের সামনে এসে দাঁড়াল। একপাট দরজা বন্ধ। সেনাপতি দরজায় টোকা দিল।
–ভেতরে এসো। রাজা রিকার্ডোর গম্ভীর গলা শোনা গেল।
সেনাপতি দরজা খুলল। ভেতরে ঢুকল। ইঙ্গিতে ফ্রান্সিসদের ঢুকতে বলল।
ফ্রান্সিসরা ভেতরে ঢুকল। দেখল রাজা রিকার্ডো একটা সুসজ্জিত বিছানায় বসে আছেন। রাজার বাহুতে পট্টি বাঁধা। বোঝাই যাচ্ছে যুদ্ধে আহত হয়েছেন। গায়ে একটা ফুলতোলা দামি কাপড় জড়ানো। সেনাপতিমাথাঝুঁকিয়ে সম্মান জানিয়ে বলল–মহারাজ এই তিনজনেই গুপ্তচরবৃত্তির সঙ্গে জড়িত। ফ্রান্সিস বলে উঠল–মিথ্যে কথা।
–তোমরা বিদেশি? রাজা রিকার্ডো বললেন। রাজার বেশ ভারী গলা।
–হ্যাঁ। ফ্রান্সিস বলল।
–কোথায় দেশ তোমাদের? রাজা বললেন।
–আমরা ভাইকিং। ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ–তোমাদের কথা শুনেছি। বীর জাতি। একটু থেমে বললেন–কিন্তু একটা কথা আমাকে বোঝাও তো। আমরা নিঃশব্দে রাজা ফার্ণান্দোর সৈন্যাবাস আক্রমণ করতে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখি সৈন্যাবাসে কোনো সৈন্য নেই। তারা যুদ্ধাস্ত্রে সজ্জিত হয়ে প্রান্তরের শেষে দাঁড়িয়ে আছে। এটা কী করে হল?
ওরা আগে খবর পেয়েছিল বোধহয়। হ্যারি বলল।
–বোধহয় না। নিশ্চয়ই কোনো গুপ্তচর আগেভাগে আমাদের আক্রমণের কথা তাদের জানিয়েছিল। রাজা বললেন।
– হতে পারে। ফ্রান্সিস বলল।
হতে পারে নয়। তাই হয়েছে। তোমারাই আগেভাগে আমাদের আক্রমণের কথা ফার্নান্দোকে জানিয়েছে। রাজা রির্কাডো বললেন।
–কিন্তু আমাদের কী স্বার্থে? ফ্রান্সিস বলল।
–তোমরা বিদেশি। তোমাদের অর্থাভাব থাকবেই। অর্থের লোভে তোমরা এই কাজ করেছো। তোমাদের সুবিধে হল তোমরা বিদেশি। কাজ সেরে প্রাপা অর্থ নিয়ে জাহাজ চালিয়ে চলে যাবে আমাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। রাজা রিকার্ডো বললেন।
