যুদ্ধের উন্মাদনা থিতিয়ে এসেছে। সৈন্যদের হৈ হৈ চিৎকার থেমে গেছে। তবে আহতদের আর্তনাদ গোঙানি এখনও শোনা যাচ্ছে।
ভোর হল। ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগল। সূর্যের স্নিগ্ধ আলো ছড়াল সমুদ্রের ঢেউয়ের মাথায় ফ্রান্সিসদের জাহাজের গায় দূরে তীরভূমির গাছপালায়। ফ্রান্সিস বলল–হ্যারি এই পৃথিবী কত সুন্দর। ঈশ্বরের আশীর্বাদের মতো এই আলো এই বাতাস। নির্দয় মানুষেরা এই পরিবেশেও পরস্পর হানাহানি করে। আহত হয়ে মরে। অশ্চর্য!
তখন একটু বেলা হয়েছে। সকালের খাবার নিয়ে ফ্রান্সিস হ্যারি আর মারিয়া ডেক এ এলো। রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে রইল। তাকিয়ে রইল তীরভূমির দিকে। আল-খাতিবও ফ্রান্সিসদের সঙ্গে দাঁড়াল।
ওরা অপেক্ষা করতে লাগল। হঠাৎ দেখল রিকার্ডোর সৈন্যরা দলে দলে ছুটে আসছে। ওদের জাহাজে উঠে আসছে। ফ্রান্সিস বলল–আলখাতিব–রিকার্ডোর সৈন্যরা কি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে আসছে?
–হ্যাঁ। যুদ্ধে রাজা রিকার্ডো মনে হয় হেরে গেছেন। আলখাতিব বলল। তখনই দেখা গেল একটা ঘোড়ার পিঠে কে বসে আছে। তাকে ঘিরে সৈন্যরা জাহাজঘাটার দিকে আসছে। আলখাতিব বলে উঠল–যা ভেবেছি তাই। ঘোড়ার পিঠে বসে আছে রাজা রিকার্ডো। বোধহয় আহত। ঐ দেখুন–আরো সৈন্য আসছে। আহতদের কাঁধে করে নিয়ে আসছে।
রাজা রিকার্ডোকে সৈন্যরা ধরাধরি করে জাহাজে উঠতে সাহায্য করল। রাজা রিকার্ডোকে জাহাজে তোলা হল। সঙ্গে সঙ্গে জাহাজের নোঙর তোলা হল। পরিশ্রান্ত, আহত সৈন্যদের তখনও আনা হচ্ছিল। কিন্তু তাদের তীরে রেখেই জাহাজ চলতে শুরু করল। যুদ্ধকরে ক্লান্ত আহত সৈন্যদের কথা রাজা রিকার্ডো লএকবারও ভাবলো না। জাহাজঘাটায় শুইয়ে রাখা আহত সৈন্যদের আর্তনাদে গোঙানিতে ভরে উঠল জাহাজঘাটা। কিন্তু রাজা রিকার্ডোর জাহাজ ফিরল না। মাঝ সমুদ্রের দিকে আসতে লাগল। ফ্রান্সিস বলল-হ্যারি–মনে আছে সেই রাজা হুঁকোমোক-এর কথা। আহত তৃষ্ণার্ত সৈন্যদের সঙ্গে রাজা হুঁকোমক রাত জেগে তাদের চিকিৎসা ও জলপানের ব্যবস্থা করেছিলেন। সভ্যদেশের রাজা হয়ে রিকার্ডো তার সৈন্যদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করল। আহত সৈন্যদের সুস্থ সৈন্যদের রাজা ফার্দিনান্দোর দয়ার ওপর ছেড়ে দিয়ে এলো। যুদ্ধজয়ী রাজা ফার্নান্দো ঐ পরিতাক্ত সৈন্যদের হত্যাও করতে পারে। হত্যা না করলেও বন্দী করে রেখে দেবে। কয়েদঘরের জঘন্য পরিবেশে তিলে তিলে মরবে ওরা।
ফ্রান্সিসরা দেখল জাহাজঘাটা থেকে রাজা রিকার্ডোর সৈন্যরা সমুদ্রতীর ধরে এদিক ওদিক পালাচ্ছে।
রাজা রিকার্ডোর শৌখিন জাহাজটা ফ্রান্সিসদের জাহাজের কাছাকাছি এলো। অন্য যুদ্ধ জাহাজটা এলো পেছনে পেছনে। শৌখিন জাহাজটা ফ্রান্সিসদের জাহাজের খুব কাছে এলো। ফ্রান্সিস হ্যারি মারিয়া তখনও ওদের জাহাজের ডেক-এ দাঁড়িয়ে ছিল। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল-হ্যারি–ব্যাপার সুবিধের মনে হচ্ছেনা। রাজা রিকার্ডোর শৌখিন জাহাজ আমাদের জাহাজের কাছে আসছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই রাজা রিকার্ডোর শৌখিন জাহাজটা ফ্রান্সিসদের জাহাজের গায়ে আস্তে ধাক্কা দিয়ে থেমে গেল। ফ্রান্সিসরা কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। ফ্রান্সিস একবার ভাবল দ্রুত জাহাজ চালিয়ে চলে যাই। তাহলে রাজা রিকার্ডোর যুদ্ধজাহাজ ওদের ধাওয়া করে ধরে ফেলবে। ওদের নিশ্চয়ই বন্দী করবে। আবার শুরু হবে বন্দীজীবন। তার চেয়ে দেখা যাক না রাজা রিকার্ডো কী বলে কী করে।
রাজা রিকার্ডোর শৌখিন জাহাজ থেকে রোগা লম্বা চেহারার একজন সশস্ত্র লোক ফ্রান্সিসদের জাহাজে উঠে এলো। সঙ্গে তিন চারজন সৈন্যও এলো। রোগা লম্বা সৈন্যটি বলল তোমাদের দলনেতা কে?
–আমি। ফ্রান্সিস এগিয়ে এলো।
–তোমরা বিদেশি। লোকটি বলল।
–হ্যাঁ–আমরা ভাইকিং। দেশে দেশে দ্বীপে দ্বীপে ঘুরে বেড়ানো আমাদের নেশা। কোথাও কোনো গুপ্তধনের খোঁজ পেলে আমরা তা উদ্ধার করি। ফ্রান্সিস বলল।
–উদ্ধার করে সেই গুপ্তধন নিয়ে পালিয়ে যাও। লোকটি বলল।
–আপনি কিন্তু তার কোনো প্রমাণ পান নি। মিথ্যে সন্দেহ। ফ্রান্সিস বলল।
লম্বা রোগা লোকটি বলল–যাক গে ওসব। আমি রাজা রিকোর্ডোর সেনাপতি। লোকটি বলল। ফ্রান্সিস একটু আশ্চর্য হল–এই লম্বা রোগা তালপাতার সেপাই রাজা রিকার্ডোর সেনাপতি? এবার সেনাপতি বলল–
–তোমাদের বন্দী করা হল।
–কেন? কোনো অপরাধে? হ্যারি বলল।
–আমরা প্রায় নিঃশব্দে খুব সতর্কতার সঙ্গে রাজা ফার্নান্দোর সেনানিবাস আক্রমণ করতে গিয়েছিলাম। দেখলাম রাজা ফার্নান্দোর সৈন্যবাহিনীর একজন সৈন্যও সেনানিবাসে নেই। সশস্ত্র সৈন্যরা সামনের প্রান্তরের শেষে যুদ্ধের জন্য তৈরি হয়ে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। সেনাপতি বলল।
–ওঁরা নিশ্চয়ই আপনাদের আক্রমণের সংবাদ আগে থেকে ওদের জানিয়েছিল। হারি বলল। সেনাপতি ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। বলল–ঠিক এই কথাটা বলতে চাইছি। ওরা কী করে আমাদের আক্রমণের সংবাদ জানল?
হয়তো তাদের নিয়োগ করা কোনো গুপ্তচর আগেভাগে খবরটা জেনে ওদের জানায়। ফ্রান্সিস বলল। সেনাপতি আবার ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল–হ্যাঁ–সেই গুপ্তচর হবে তোমরা? ফ্রান্সিস হ্যারি কোনো কথা বলতে পারল না। ওরা দুজনে অবাক হয়ে পরস্পরে মুখের দিকে তাকাল। হ্যারি বলল–
–আমারই যে সেই গুপ্তচর তার প্রমাণ আপনারা কীভাবে পেলেন?
