মাস্তুলের ওপর থেকে গলা চড়িয়ে পেড্রো বলল–দক্ষিণ দিকে দ্যাখো। ফ্রান্সিসরা দেখল দুটো জাহাজ এই হুয়েনভা বন্দরের দিকেই আসছে। একটা যুদ্ধজাহাজ। একটা শৌখিন জাহাজ।
কী করবে ফ্রান্সিস? হ্যারি বলল।
বুঝতে পারছি না জাহাজ দুটো এত গভীর রাতে এদিকে এই হুয়েনভা বন্দরে আসছে কেন?
–ফ্রান্সিস আমি নিশ্চিত ওরা লড়াই করতে আসছে। এই হুয়েনভা থেকে রাজধানী সেভিল পর্যন্ত রাজা ফার্নান্দোর রাজত্ব। যারা আসছে তারা লড়াই করে হুয়েনভা বন্দর দখল করবে। হ্যারি বলল।
দুটো জাহাজ খুব দ্রুতবেগে আসছে। ততক্ষণে ঐ জাহাজ দুটো অনেক কাছে এসে পড়েছে। ফ্রান্সিস তাড়াতাড়ি জাহাজচালক ফ্লেজারের কাছে এলো। বলল–ফ্লেজার জানি না কেন দুটো জাহাজ এই হুয়েনভা বন্দরে আসছে। এরা কারা আমরা জানি না। কিন্তু এই সমুদ্রতীরের জাহাজ ঘাটায় আমরা থাকবো না। জাহাজ ছাড়ো। যতটা সম্ভব মাঝ সমুদ্রের দিকে জাহাজ নিয়ে চলো। এখানে এখন থাকা বিপজ্জনক।
ফ্রান্সিসদের জাহাজ আরব সমুদ্রের দিকে সরে এলো। ফ্রান্সিসরা দেখল দুটো জাহাজ থেকেই অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত সৈন্যরা দলে দলে নেমে এলো। এত সৈন্য। কিন্তু কেউ কোনো কথা বলছে না। চারদিক নিঃশব্দ। শুধু সমুদ্রের শোঁ শোঁ হাওয়ার শব্দ। আর তীরে ঢেউ ভেঙে পড়ার শব্দ।
সৈন্যরা যুদ্ধ জাহাজ থেকে নেমে আসতে লাগল। যতটা সম্ভব জুতোয় কোনোরকম শব্দ না তুলে ওরা নেমে আসতে লাগল। পরপর। তারপর রাস্তায় উঠে সারি বেঁধে দাঁড়াল। সেনাপতি নামল জাহাজ থেকে। একেবারে সামনে গিয়ে দাঁড়াল। একটু গলা চড়িয়ে বলল–সৈন্যবাহিনী–এখান থেকে পাঁচশো হাত দূরে ডানদিকে রাজা ফার্নান্দোর সৈন্যদের সৈন্যাবাস।নিঃশব্দে ঐ সৈন্যাবাসে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। ঐ সৈন্যদের প্রস্তুত হবার সময় দেওয়া চলবে না। তারপর নিরস্ত্র ওদের হত্যা করতে হবে। চলো সব।
সৈন্যদল ছুটল। যতটা সম্ভব নিঃশব্দে ওরা সৈন্যাবাসের কাছে গেল। সৈন্যাবাসে কোনো সাড়াশব্দ নেই। ওরা সৈন্যাবাসে ঢুকে দেখল–একজন সৈন্যও নেই। ওরা প্রত্যেকটি ঘর দেখল। কোনো ঘরে কোনো সৈন্য নেই।, ওরা বাইরে এলো। চাঁদের আলোয় পুবদিকে তাকিয়ে দেখল ওখানকার প্রান্তরে যুদ্ধাস্ত্রে সজ্জিত রাজা ফার্নান্দোর সৈন্যরা সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে।
বেশ কিছুক্ষণ দুই সৈন্যবাহিনীই স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তারপর রাজা রিকার্ডো তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে প্রান্তরের দিকে ফার্নান্দোর সৈন্যবাহিনীর দিকে ছুটে গেল। রাজা ফার্নান্দোর সৈন্যবাহিনীও ছুটে এলো।দুই সৈন্যবাহিনী পরস্পরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। শুরু হল লড়াই।
ফ্রান্সিস তাদের জাহাজ থেকে শুনতে পেল তলোয়ারের ঠোকাঠুকির শব্দ। সৈন্যদের যুদ্ধকালীন চিৎকার আহতদের গোঙানির শব্দ। লড়াই চলল।
নজদার পেড্রো গলা চড়িয়ে বলল–একটা লোক আমাদের জাহাজের দিকে সাঁতার আসছে। এবার ফ্রান্সিসরাও উজ্জ্বল জ্যোৎস্নায় দেখতে পেল একটা লোক দ্রুত সাঁতার আসছে। ফ্রান্সিসদের জাহাজের হাল ধরে একটু বিশ্রাম নিল লোকটা। তারপর হাল বেয়ে বেয়ে ওপরে ডেক-এ উঠে এলো। ডেক-এর ওপর শুয়ে পড়ল। মুখ হাঁ করে শ্বাস নিতে লাগল। ভাইকিংরা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে নোকটাকে দেখতে লাগল। ওরা বুঝে উঠতে পারল না–লোকটা কে? তবে পরনে এদেশীয় লোকদের পোশাক।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি এবার লোকটার কাছে এলো। ফ্রান্সিস বলল–এবার উঠে বসো। লোকটা আস্তে আস্তে বসল। ফ্রান্সিস বলল–তুমি কে? আর কোথাও না গিয়ে আমাদের জাহাজে এলো কেন?
–আপনারা বিদেশি।তাইনির্ভয়ে এলাম।জানি এখানে কোনো বিপদ নেই। লোকটা বলল।
–তুমি বুঝলে কী করে যে আমরা বিদেশি? হ্যারি বলল।
জাহাজের গড়ন দেখে। আমাদের দেশের জাহাজের সঙ্গে প্রায় কোনো মিলই নেই। লোকটি বলল। ফ্রান্সিস হেসে বলল
–তুমি বেশ বুদ্ধিমান। তোমার নাম কী?
–আলখাতিব। আমি সোনীয়। লোকটা বলল।
–তুমি কোত্থেকে এলে? হ্যারি বলল।
রাজা ফার্নন্দোর কয়েদঘর থেকে। আলখাতিব বলল।
কী করে পালালে? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
–এখান থেকে বেশ কিছু দূরে ক্যামেরিনাল বন্দর। আলখাতিব বলল।
–হ্যাঁ সেই বন্দর শহরে আমরা থামি নি। পার হয়ে এখানে এসেছি। হ্যারি বলল।
–ঐক্যামেরিনাল এলাকার রাজারিকার্ডো। এই রিকার্ডো জাহাজে তার সৈন্যবাহিনী পাঠিয়েছে ফার্নান্দোকে হারাতে। সেভিল অঞ্চল দখল করতে। আলখাতিব বলল।
–ও! তাহলে দুই রাজার লড়াই? ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ। আর একটা মজার ব্যাপার কি জানেন? রিকার্ডো ফার্নান্দোর বড়ো ভাই। দুই ভাইয়ের লড়াই লেগেই আছে। রিকার্ডোর সৈন্যরা সৈন্যাবাস আক্রমণ করেছিল। কয়েদঘরের চারপাশে লড়াই চলছিল। আমরা কুড়ি পঁচিশজন বন্দী ধাক্কা দিয়ে দিয়ে লোহার দরজা ভেঙে পালিয়েছি। আলখাতিব বলল।
–ঠিক আছে। ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে বলল–যাও–আলখাতিবকে শুকনো পোশাক দাও। ওর থাকার ব্যবস্থা করো। আলখাতিব শাঙ্কোর সঙ্গে চলে গেল। অনেক ভাইকিং গিয়ে শুয়ে পড়ল। ডেক-এ দাঁড়িয়ে রইল ফ্রান্সিস, হ্যারি আর মারিয়া। কেউ কেউ ডেক-এ বসে রইল। ফ্রান্সিসরা দাঁড়িয়ে রইল যুদ্ধের ফলাফল জানতে।
ফ্রান্সিস আকাশের দিকে তাকাল। তারাগুলোর উজ্জ্বলতা কমে আসছে। অন্ধকার কেটে যাচ্ছে। আকাশ সাদাটে হয়ে আসছে। পুবদিকের দিগন্তে কমলা রং ফুটে উঠল। সূর্য উঠতে দেরি নেই।
