সেদিন রাতে ভাইকিংরা তাড়াতাড়ি খেয়ে নিল। রাত একটু গম্ভীর হতে সবাই ডেক-এ এসে দাঁড়াল। ভাইকিংরা নিরস্ত্র। জলদস্যুরা সশস্ত্র। একটা অসম লড়াই।
ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বলল–আমরা ঐ জলদস্যুদের সঙ্গে খালি হাতে লড়াই করতে পারবো না।ওরা নরপশু।ওদের মনে দয়ামায়া বলে কিছু নেই। কাজেই আমরা মুখোমুখি লড়াইয়ে যাবো না। আমরা আমাদের জাহাজের পেছন দিয়ে উঠবো। পাহারাদার জলদস্যুদের বুদ্ধিবলে হারিয়ে জাহাজ উদ্ধার করবো। জাহাজ চালিয়ে পালাবো। ফ্রান্সিস থামলো।
ফ্লেজার বলল–আমি এই জাহাজটা আমাদের জাহাজের ঠিক পেছনে গিয়ে থামাবো। হালের খাঁজে পা রেখে শাঙ্কো জাহাজে উঠবে। দড়ির মই ফেলে দেবে আমরা সবাই উঠবো। তারপর লড়াই পাহারাদার জলদস্যুদের সঙ্গে।
ফ্লেজার জাহাজের হুইল ধরল। আস্তে আস্তে জাহাজ পেছোতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ছোটো জাহাজটা ফ্লেজার ওদের জাহাজের ঠিক পেছনে আনল।
শাঙ্কো ওদের জাহাজের ঝুলন্ত দড়িদড়া ধরে হালের খাঁজে পা রেখে রেখে জাহাজের ডেক-এ উঠে এলো। ডেক-এ উঠে এলো। সিঁড়ি ঘরের আড়ালে দাঁড়াল। তার আগে দড়ির মইটা নামিয়ে দিল। মই বেয়ে ফ্রান্সিস হ্যারি উঠে এলো। ডেক এ গড়িয়ে গিয়ে ওরা সিঁড়িঘরের পেছনে চলে এলো। উঠে দাঁড়াল। সিঁড়িঘরের আড়াল থেকে ডেক এর দিকে মাস্তুলের দিকে তাকাল। কুয়াশায় অস্পষ্ট চাঁদের আলোয় দেখল চারজন জলদস্যু খোলা তলোয়ার হাতে ডেক-এ ঘোরাঘুরি করছে।
ওদিকে ফ্রান্সিসের দেখাদেখি চার-পাঁচজন ভাইকিং বন্ধু ডেক-এর পাটাতনে গড়িয়ে গিয়ে ফ্রান্সিসের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল।
ফ্রান্সিস আস্তে ডাকল–শাঙ্কো।শাঙ্কো এগিয়ে গেলো।ফ্রান্সিস গলা নামিয়ে বলল– ডেক-এর শেষের দিকে যে দুটো জলদস্যু খোলা তলোয়ার হাতে বসে আছে তার মধ্যে বাঁ দিকেরটা তোমার ডানদিকেরটা আমার। ফ্রান্সিস থামল। তারপর আস্তে বিস্কোকে ডাকল। বলল–যে দুটো জলদস্যু খোলা তলোয়ার। কানে বাতাসের শনশন্ শব্দ। ঢেউ ভেঙে পড়ার শব্দ।
ফ্রান্সিস চাপাম্বরে ডাকল–শাঙ্কো। তারপর ছুটে ডেক পার হয়ে গিয়ে ডানদিকের জলদস্যুটার ঘাড়ে গিয়ে পড়ল। এই হঠাৎ আক্রমণে জলদস্যুটা ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেল। ও পেছনে উল্টে পড়ল। হাত থেকে তলোয়ার ছিটকে গেল। ফ্রান্সিস তলোয়ারটা দ্রুত হাতে তুলে নিয়ে জলদস্যুটার বুকে ঢুকিয়ে দিল। ওদিকে শাঙ্কোও অন্য জলদস্যুটার বুকে ছুরি বসিয়ে দিয়েছে।
এবার অন্য জলদস্যু চারজন অন্য ভাইকিংদের হাতে মারা গেল।
শাঙ্কো দ্রুত পায়ে জাহাজের সামনে এলো। জলদস্যুদের জাহাজটার সঙ্গে মোটা কাছিতে বাঁধা ওদের জাহাজটা শাঙ্কো ছোরা বের করল। ছোরা দিয়ে ঘষে ঘষে কাছিটা কেটে ফেলল। ওদের জাহাজটা আস্তে আস্তে হাত কুড়ি-পঁচিশ সরে এলো।
ওদিকে নীচের অস্ত্রঘরে দুজন জলদস্যু অস্ত্রঘর পাহারা দিচ্ছিল। হাতে খোলা তলোয়ার। সেই দুটোকে বিস্কো আর অন্য দুইজন ভাইকিং মোকাবিলা করল।
অন্ধকার থেকে দ্রুত ছুটে গিয়ে বিস্কো একটা জলদস্যুর মাথায় ভাঙা দাঁড় দিয়ে ঘা মারল। ঐ জলদস্যু আর উঠল না। অন্য জলদস্যুটার হাতে ভাঙা দাঁড়ের ঘা মারতে হাত থেকে তলোয়ার ছিটকে গেল। ওটাকে ধরে আর শুয়ে থাকা জলদস্যু দুটিকে বিস্কোরা জলে ছুঁড়ে ফেলে দিল।
নিজেদের জাহাজটা বেশি দূরে সরে আসার পর ভাইকিংরা ধ্বনি দিল–ও-হো-হো।
পেড্রো ছুটে গিয়ে মাস্তলটাকে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করল। কয়েকজন ভাইকিং আনন্দে ডেক-এ গড়াগড়ি খেতে লাগল। একজন ভাইকিং বন্ধু ডেক-এর কাঠে জুতো ঠুকে ঠুকে তাল দিতে লাগল। আরও কয়েকজন ভাইকিং তালে তালে হাত-পা ছুঁড়ে নাচতে লাগল।
সম্রাটের রাজকোষ
হুয়েনভা বন্দর শহর। ফ্রান্সিসদের জাহাজে তীরে ভেড়ানো। ফ্রান্সিস বলেই রেখেছে। পরদিন ওরা নিজেদের দেশের দিকে জাহাজ চালাবে। ভাইকিংরা খুব খুশি। কতদিন পর দেশে ফেরা। নিজেদের দুঃসাহসিক অভিযানের কথা কত মূল্যবান ধনসম্পদ কত বুদ্ধি খাঁটিয়ে ফ্রান্সিস উদ্ধার করেছে। কতবার ওরা মৃত্যু মুখ থেকে ফিরে এসেছে। বিশেষ করে ফ্রান্সিস হ্যারি আর বিস্কো সব কাহিনী ওরা দেশবাসীকে বলবে।
মানুষের সঙ্গে যেমনি লড়াই করেছে তেমনি প্রচন্ড ঝড়ের সঙ্গেও লড়াই করেছে। কতবার ঝড়ের প্রচন্ড শক্তিশালী ঝাপটায় ওদের জাহাজ ডুবতে ডুবতে উঠে পড়েছে। ঢেউয়ের মাথায়। সমুদ্রের জলে ডুবে যাওয়ার হাত থেকে ওরা বেঁচে গেছে।
সেদিন গভীর রাত। জ্যোৎস্নালোকিত সমুদ্র। ঢেউয়ের মাথায় চাঁদের আলো নাচছে।
মাস্তুলের মাথায় বসে থাকা নজরদার পেড্রোর একটু তন্দ্রামতো এসেছিল। তন্দ্রা ভাবটা চলছিল পেড্রোর। হঠাৎ ধড়ফড় করে জেগে উঠল। একবার চারদিকে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে নিচ্ছে তখনই দেখল দক্ষিণ দিক থেকে দুটো জাহাজ আসছে বন্দরের দিকে। দেখল–একটা যুদ্ধ জাহাজ আর একটা শৌখিন ছোটো জাহাজ।
পেড্রো লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল।নীচের জাহাজের ডেক-এর দিকে তাকিয়ে গলা চড়িয়ে বলল –ভাইসব সাবধান, দুটো জাহাজ আসছে এদিকে। ফ্রান্সিসকে খবর দাও। দু’চারজন ভাইকিং ডেক-এ ঘুমিয়েছিল। দুজনের ঘুম ভেঙে গেল পেড্রোর ডাকে। পেড্রোর কথা শুনল। উঠে দাঁড়াল। ছুটলো ফ্রান্সিসকে খবর দিতে।
একটু পরেই ফ্রান্সিস আর হ্যারি ডেক-এ উঠে এলো। পেছনে মারিয়া।
