হতে পারে। হ্যারি বলল।
–হ্যারি–চলো সবকিছু ভালো করে দেখি। ফ্রান্সিস বলল।
দুজনে ঘরটায় বোনাটোনা সব দেখল। লুকিয়ে রাখা কিছুই খুঁজে পেল না।
ফ্রান্সিস আয়নাটার সামনে এলো। আয়নাটা ঘুরিয়ে নিজের মুখ দেখল। আরও ঘোরাল। কাঠের দেওয়াল। কাঠের ছাত দেখল। আবার দেওয়াল। দেওয়ালের পরে মেঝে। ফ্রান্সিস আয়না ঘোরানো বন্ধ করে বলল–হ্যারি এই আয়নাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
তখনকার মতো দুজনে চলে এলো।
একদিন কাটল। ফ্রান্সিসদের জাহাজ ঢেউ ভেঙে চলেছে।
আকাশ নির্মেঘ। চারদিকে ঝলমল রোদ। পালে জোর হাওয়া। ভাইকিংদের দাঁড় টানতে হচ্ছে না। ডেক-এর এখানে-ওখানে ওরা শুয়ে বসে আছে। গল্প গুজব করেছে।
সেদিন দুপুরে ফ্রান্সিস সেই সাজঘরে এলো। এই কেবিনঘরে নিশ্চয়ই রহস্যময় কিছু আছে। আলফান সেটা বলেনি। ফ্রান্সিসের কেমন একটা বিশ্বাস এটা।
ফ্রান্সিস আয়নাটার কাছে এলো। আয়নাটা আস্তে আস্তে ঘোরাতে লাগল। সেই কাঠের ছাত, দেওয়াল মেঝে আয়নায় দেখা যাচ্ছে। দুচারবার ঘুরিয়ে থামতেই হঠাৎ ফ্রান্সিসের নজরে পড়ল আয়নায় দেখা যাচ্ছে ছাত আর দেওয়ালের জোড়ের কাছে একটা লম্বাটে কাঠের ছোটো তক্তামতো। ফ্রান্সিস আয়নার দিকে তাকিয়ে রইলো। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সেই তক্তার গায়ে খুঁড়ে খুঁড়ে কিছু লেখা। ফ্রান্সিস পেছন ফিরল। সেই কাঠের তক্তার গায়ে কি লেখা? ফ্রান্সিস এগিয়ে গেল। লেখাটা কী বুঝতে পারল না। ফ্রান্সিস হ্যারিকে ডাকতে গেল। হ্যারিকে নিয়ে এলো। ঐ লেখাটা দেখাল। হ্যারিও অবাক।
হ্যারি বলল–কাছে উঠে গেলে বোঝা যাবে কী লেখা।
ফ্রান্সিস ছুটল শাঙ্কো আর বিস্কোকে ডাকতে।
শাঙ্কো বিস্কো এলো। অন্য ভাইকিং বন্ধুরাও ঘরের দরজার কাছে ভিড় করল। ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে বলল
খুঁজেপেতে দ্যাখো একটা মইটই পাও কি না। না পেলে জাহাজে যে কাঠ রাখা আছে তাই দিয়ে একটা মই বানাও।
শাঙ্কো আর বিস্কো চলে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা ছোটো মই তৈরি করে আনল। মই পাতা হল। মই দিয়ে ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে উঠে লেখাটার সামনে গেল। কোন্ ভাষায় লেখা কিছুই বুঝল না। ও নেমে এলো। হ্যারিকে উঠতে বলল। হ্যারি মই বেয়ে লেখাটার কাছে এলো। লেখাটা দেখতে দেখতে বলল–পোর্তুগীজ ভাষায় কিছু লেখা। তবে উল্টে করে লেখা। আয়নায় দ্যাখো, সোজা পড়া যাবে। বলো, আমি এখানে মিলিয়ে দিচ্ছি।
ফ্রান্সিস আয়নায় লেখাটা পড়ে পড়ে বলল–আয়না তোমার ভাগ্য গড়ে দেবে।
হ্যারি বলল–ঠিক এটাই লেখা আছে ঐ লম্বাটে কাঠের তক্তায়।
ফ্রান্সিস চোখ বুজল। ভাবল। চোখ খুলে বলে উঠল–এই তক্তাটা খুলতে হবে। খুলতে পারলে পাওয়া যাবে আলফানের বাবার ধনসম্পদ। হ্যারি ততক্ষণে নেমে এসেছ। ফ্রান্সিস মই বেয়ে উঠল। হাত বাড়িয়ে বলল–একটা পেরেক তোলা হাতুড়ি দাও। শাঙ্কো ছুটল। খুঁজে খুঁজে কাঠ রাখার ঘরে হাতুড়ি পেল। এনে ফ্রান্সিসকে দিল।
ফ্রান্সিস তক্তার গায়ে পোঁতা পেরেক খুলতে লাগল। একপাশের দুটো পেরেক খুলতেই তক্তাটা আলগা হল। সঙ্গে সঙ্গে ঝরঝর করে সোনার চাকতি পড়তে লাগল কাঠের মেঝের ওপর। টুং টাং শব্দ হত লাগল। ফ্রান্সিস বাকি দুটো পেরেকও খুলে ফেলল। সব সোনার চাকতি পড়ে গেল।
ভাইকিং বন্ধুরা ধ্বনি তুললো– ও-হো-হো৷
ফ্রান্সিস নেমে এলো। বলল–একটা দড়ির বস্তা আনতে। আনা হল বস্তা। সব সোনার চাকতি ঐ বস্তাটায় রাখা হল। ভাইকিংরা আনন্দে হৈ হৈ শুরু করেছে তখন।
ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসব–এই সোনার দাবিদার আলফান। কিন্তু সে এখানে নেই। জাহাজ ঘুরিয়ে ফিরে গিয়ে আলফানকে ওর পৈতৃক সম্পদ দেব তাও সম্ভব নয়। কাজেই এই সোনার মালিক এখন আমরা। লিসবনে পৌঁছে দুটো কাজ করতে হবে এই সোনা দিয়ে। একটা ভালো জাহাজ কিনবো। তারপর লিসবন বন্দর শহরে নিজেদের পোশাক কিনবো। গ্যাব্রিয়েল ঠিকই বলেছিল–আমরা যেন ভিখিরি হয়ে গেছি। ফ্রান্সিস বলল।
দিন চারেক পরে ফ্রান্সিসরা পোর্তুগালের রাজধানী বন্দর শহরলিসবনে এসে পৌঁছাল।
সবে ভোর হয়েছে তখন। বেশ কুয়াশায় ঢাকা লিসবন শহর। বন্দরে কত জাহাজ। জাহাজগুলোর মাথায় কত দেশের পতাকা উড়েছে। কিন্তু জাহাজ জাহাজঘাটায় রয়েছে। আর কিছু জাহাজ বন্দরে থেকে একটু দূরে দূরে নোঙর ফেলে ভাসছিল।
হ্যারি ডেক-এ দাঁড়িয়ে দেখছিল। হঠাৎ কিছুদূরে দুটো জাহাজকে দেখল। একটা জাহাজ দেখতে ঠিক ওদের জাহাজের মতো। কতদিন যে ওদের ঐ জাহাজে কেটেছে। কুয়াশায় ঢেকে গেল জাহাজ দুটো। হ্যারি দ্রুত পায়ে ছুটে গেল জাহাজ চালক ফ্লেজারের কাছে। বলল
–ফ্লেজার-জাহাজ থামাও। এক্ষুণি।
ফ্লেজার জাহাজ থামল। হ্যারি ছুটল ফ্রান্সিসকে ডাকতে। ফ্রান্সিসের সঙ্গে মারিয়াও ডেক-এ উঠে এলো।
হ্যারি হাত পঞ্চশেক দূরে জাহাজ দেখল। তখনই কুয়াশা কেটে গেল। স্পষ্ট দেখা গেল জাহাজ দুটো। নিজেদের জাহাজটা দেখেই ফ্রান্সিস চিনল। আনন্দে চিৎকার করে উঠতে গিয়ে থেমে গেল।
ততক্ষণে ওদের জাহাজটা যে দেখা সেটা সবভাইকিং বন্ধুরা জানাল।সবাই জাহাজের ডেক-এ এসে দাঁড়াল।
ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বলল–ভাইসব–সামনের জাহাজটা গ্যাব্রিয়েলের। পেছনে বাঁধা জাহাজটা আমাদের। আমার দৃঢ় বিশ্বাস গ্যাব্রিয়েল আমাদের জাহাজ বিক্রি করতেই এখানে এসেছে। এখনও খদ্দের পায়নি। অপেক্ষা করেছে। কিন্তু আমরা অপেক্ষা করবো না। আজ রাতেই আমাদের অভিযান।
