আলফান বলল–ধরুন এ দুটো গালিয়ে সোনার চাকতি করা হল। কটা চাকতি হবে? একটুক্ষণ ভাবল মালিক। তারপর বলল–সাত আটটা চাকতি হবে।
–ঠিক আছে। এই দুটো রেখে দাও। আমাকে চাকতি গড়ে দেবে। আরফান বলল।
ফেরার পথে আলফান বলল–আপনারা কালকেই জাহাজটা নিতে পারেন। দাম তো আমি পেয়ে গেলাম।
ফ্রান্সিসরা সরাইখানায় ফিরে এলো। সব ভাইকিংরা ফ্রান্সিসদের ঘিরে ধরল। ফ্রান্সিস সব ঘটনা বলল। ভাইকিংরা আনন্দে ধ্বনি তুলল–ও-হো-হো।
মারিয়া হেসে বলল–কী সুন্দর জাহাজটা।
এবার দেশের দিকে–তাই না! ফ্রান্সিস হেসে বলল।
-বাঃ এটা কি আমি একা চাইছি? তোমার কি দেশে ফেরার ইচ্ছে নেই? মারিয়া বলল।
–আছে বৈদিক। কিন্তু ওখানে নিশ্চিন্ত অলস জীবনে যাওয়ার ইচ্ছে আমার একেবারেই নেই। ফ্রান্সিস বলল।
পরদিন সকালের খাবার খেয়েই ফ্রান্সিস চললু, জাহাজঘাটার দিকে। সকলেই আনন্দে অধীর। যা-তোক একটা জাহাজ পাওয়া গেছে। এবার দেশে ফেরা।
আলফান ওর বড়ো জাহাজটার ডেক-এ দাঁড়িয়েছিল।
ফ্রান্সিস আনফানের কাছে গেল। আলফান বলল–এবার জাহাজটা বুঝে নিন। আপনারা। তবে জাহাজটার ডেক দেওয়াল কেবিনঘর সবকিছুই পরিষ্কার করতে হবে। তার জন্যে লোক লাগালে আমি দেব।
দরকার পড়বে না। আমরাই সাফটাফ করবো। তবে সাফটাফ করতে গেলে যেসব জিনিস লাগে সেসব আমাদের দেবেন, তা হলেই হবে। হ্যারি বলল।
আলফান সেসব নিজের জাহাজ থেকে এনে দিল। ভাইকিং বন্ধুরা আঁটা বুরুশ বালতি নিয়ে জাহাজটা পরিষ্কার করতে লেগে পড়ল। মারিয়ার নির্দেশেই কাজ হতে লাগল।
শাঙ্কো আর বিস্কো বন্দরের বাজারে গেল। আটা ময়দা চিনি এমনি সব খাওয়ার জিনিস বেশি করে কিনে নিয়ে এলো।
ফ্লেজার আর পেড্রো সঙ্গে আর কয়েকজনেক নিয়ে গেল বন্দরে। দুটো পিপে ভর্তি ফি করে খাবার জল নিয়ে এলো।
বিকেলের মধ্যেই জাহাজটার চেহারা ফিরে গেল।
পেড্রো জাহাজের কোণাখামচি থেকে তিনটে কাঁচটাকা আলো বের করল। তেল ভরে রাখল।
এ সময়ে আলফান ফ্রান্সিসদের জাহাজে এলো। চারদিক দেখেটেখে বলল–বাঃ বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করেছেন।
আলফান ওর খাবার সাজঘরে এলো। সঙ্গে ফ্রান্সিস। আলফান চারদিক তাকিয়ে নিয়ে বলল–এ ঘরটাও বেশ পরিষ্কার করেছেন। বাবার সাজঘর ছিল এটা। ফ্রান্সিস বলল
–একটা ব্যপার লক্ষ্য করলাম।
–কী ব্যাপার? আলফান বলল।
–আপনি এই ঘরটা এইভাবে রেখে দিয়েছেন।
-হ্যাঁ। শুধু সুগন্ধি তেল, সেন্ট, আতর এসব আমার কাছে রেখেছি। আলফান বলল।
–এই ঘরটা কি তাহলে আপনার বাবার আমলে যেমন ছিল তেমনি আছে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
– হ্যাঁ। আলফান বলল।
–কেন বলুন তো? ফ্রান্সিস বলল।
একটু চুপ করে থেকে আলফান বলল বাবার সৃষ্টিটা আমি বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছি।
–আপনি আপনার বাবাকে খুব ভালোবাসতেন। ফ্রান্সিস বলল।
-হ্যাঁ। বাবার স্মৃতিবিজড়িত এই ঘরটায় মাঝে মাঝে আসি। বসি। বাবার কথা ভাবি। আলফান বলল।
ফ্রান্সিস আর কিছু বলল না। আয়নাটার কাছে গেল। আয়নাটা দেখল। বলল– আলফান, এই আয়নাটা যেভাবে লাগানো হয়েছে তাতে শুধু লম্বা চেহারার মানুষই এই আয়নায় মুখ দেখতে পারবে।
আলফান হেসে বলল–না, এই আয়নাটা নামনো ওঠানো যায়। আলফান এসে আয়নাটা ধরল। তারপর আস্তে আস্তে আয়নাটা অর্ধেকটা নামাল আবার অর্ধেকটা ওঠাল। আবার অর্ধেকটা সম্পূর্ন ঘোরাল না। বলল–এইবার আপনার মুখ দেখতে পারবেন। ফ্রান্সিস এগিয়ে এলো। দেখল ওর মুখ দেখা যাচ্ছে। ফাটা আয়না সত্ত্বেও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে সবকিছু। সন্দেহ নেই দামি কাঁচের আয়না।
–এই আয়নাটা কি আপনার বাবার আমলে যেমন ছিল তেমনই আছে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–হ্যাঁ–একইভাবে আছে। আলফান বলল।
–এই ঘরের সবকিছুই তো এখান থেকে সরিয়েছেন। এই আয়নাটা সরাননি কেন? ফ্রান্সিস বলল।
–অন্তত একটা বাবার স্মৃতিচিহ্ন থাক এখানে। এজন্যে। আলফান বলল।
যাবার সময় আলফান বলল–আপনারা কবে জাহাজ ছাড়বেন।
কাল সকালেই। ফ্রান্সিস বলল।
জাহাজটার অনেককিছুই কিন্তু মেরামত করতে হবে। আলফান বলল।
–সেসব আমরা লিসবন বন্দরে করাবো। ফ্রান্সিস বলল।
সেদিন রাতে এই ছোটো জাহাজে শুতে অনেকেরই অসুবিধা হয়েছিল। কিন্তু কোনও ভাইকিং বন্ধু এই নিয়ে ফ্রান্সিসকে একটা কথাও বলল না। সব অসুবিধে মেনে নিল।
পরদিন সকালের খাবার খাওয়া হলে জাহাজ নোঙর তুলে ছাড়া হল। বেগবান বাতাস। পালগুলো ফুলে উঠল।
জাহাজ দ্রুতগতিতে চলল।
ফ্রান্সিস সেই সাজঘরটায় এলো। ওর কেমন মনে হল আলফান যে ঘরটা একই রকম রেখেছে তার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। শুধু বাবার স্মৃতি নয়—
আলফান কিছু ভেঙে বলেনি। হ্যারি ঘরটায় ঢুকল। বলল–কী দেখেছো?
ফ্রান্সিস বলল–হ্যারি–এই ঘরটায় নিম্মই গোপনীয় কিছু আছে।
–তোমার এরকম কথা মনে হল কেন? হ্যারি বলল।
–আলফান যে এই ঘরটার কিছুই পালটায় নি তার পেছনে কোনও একটা কারন আছে। ফ্রান্সিস বলল।
–সেটা কী? হ্যারি জানতে চাইল।
তা তো বুঝতে পারছি না। এই ঘরটা আলফান ওর বাবার আমলের মতোই রেখেছে। কারন এতে ওর পক্ষে সব খোঁজা সুবিধে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
-কী খুঁজবে? হ্যারি বলল।
–নিশ্চয়ই গোপনে রাখা এমন কিছু। ফ্রান্সিস বলল।
–তাহলে তো আলফান বহুদিন খুঁজেছে। কিছুই পায়নি। হ্যারি বলল।
–না পায়নি। তাই হতাশ হয়ে জাহাজটা বিক্রি করল। ফ্রান্সিস বলল।
