ফ্রান্সিসরা শেষ জাহাজটায় উঠল। দেখল একজন বয়স্কলোক জাহাজের ডেক পার হয়ে এগিয়ে এলো। কাছে আসতে জ্যোৎস্নায় দেখা গেল তার মাথার চুল কোঁকড়ানো। থুতুনিতে দাড়ি। বেশ বলিষ্ঠ দেহ। বলল আপনারা কী চান?
আপনার নাম কি আলফান? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
আলফান মাথা ওঠানামা করল। ফ্রান্সিস বলল–একটু দুরে এক সরাইখানা-ওয়ালা আমাদের বলল যে আপনি নাকি একটা জাহাজ বিক্রি করবেন।
–হ্যাঁ–আলফান বলল।
–শুনুন–হ্যারি বলল–আমাদের জাহাজ চুরি হয়ে গেছে আর এই বিদেশে বিভূঁইয়ে বেশ কয়েকদিন কাটছে আমাদের।
বুঝতে পারছি আপনারা বিদেশি। আলফান বলল।
হ্যাঁ–হ্যারি বলল।
–আসুন–জাহাজটা দেখুন। আলফান বলল।
আলফান পাটাতন দিয়ে নেমে এলো। পেছনে ফ্রান্সিস আর হ্যারি। ফ্রান্সিসদের কানে এলো মারিয়ার ডাক ফ্রান্সিস–আমরাও এসেছি। ফ্রান্সিসরা দাঁড়িয়ে পড়ল। দেখল মারিয়া আর শাঙ্কে আসছে। কাছে এসে মারিয়া হেসে বলল–তোমরা জাহাজঘাটায় এসেছো শুনে আমরাও এলাম। শাঙ্কে বলল–কী ব্যাপার ফ্রান্সিস?
–একটা জাহাজ কিনবো। সেটা দেখতে যাচ্ছি। চলো।
পাটাতন পাতা দিয়ে আলফান পাশের ছোটো জাহাজটার ডেক-এ উঠে এলো। ফ্রান্সিসরাও উঠল।
কেবিনে নামবার সিঁড়ির কাছে একটা কাঁচটকা আলো জ্বলছিল। আলফান আলোটা তুলে নিল। তারপর সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে এলো। ফ্রান্সিসরাও নামল। দুটো বেশি বড়ো কেবিনঘর। আলফান বলল–ডানদিকের ঘরটায় বাবা থাকতেন। বাঁদিকের ঘরটা ছিল শোবার আর সাজগোজ করার ঘর। বাবা বেশ শৌখিন ছিলেন। দেশ বিদেশের সুগন্ধি এঘরে রাখতেন। আমি সে-সব এখন আমার ঘরে রেখেছি। শুধু রয়ে গেছে আয়নাটা। আলফান সেই ঘরটায় ঢুকল। ফ্রান্সিসরাও ঢুকল। কাঠের দেওয়ালে টানা পাটাতন। সেই পাটাতনে আটকানো একটা বেশ বড়ো ডিম্বাকৃতির আয়না। আয়নাটার মাঝ বরাবর ফাটা।
–আপনার বাবা তো এই আয়না ব্যবহার করতেন? ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ। দিনরাতের মধ্যে কতবার যে মাথার চুল আঁচড়াতেন। আলফান বলল। কাঁচঢাকা আলোয় সব দেখতে দেখতে হ্যারি বলল।
আপনি বোধহয় এই ছোটো জাহাজটা বেশি ব্যবহার করেন না।
–না। তবে মাঝে মাঝে রাতে থাকতে আসি। আলফান বলল।
এবার ফ্রান্সিসরা কাঠের তক্তাপাতা বিছানা রান্নাঘর আর একটা ছোটো কেবিনঘর সব দেখল। বোঝাই যাচ্ছে খুব শৌখিন ছিল এই ছোটো জাহাজটা।
সবাই ওপরের ডেক-এ উঠে এলো। মারিয়া ফ্রান্সিসকে ফিসফিস্ করে বলল– খুব সুন্দর জাহাজটা। এটা কেন।
ফ্রান্সিস হাসল। মৃদুস্বরে বলল–আগে দরদস্তুর হোক।
আলফান কাঁচঢাকা আলোটা টাঙিয়ে রাখল। হ্যারি বলল
–দেখুন আপনার এই জাহাজটা অপছন্দের কোনো কারণ নেই। কিন্তু আমাদের আর্থিক ক্ষমতা বেশি নেই। আমরা বহুদিন দেশছাড়া। কাজেই জাহাজের উপযুক্ত মূল্য হিসেবে এই সোনার তির-ধনুক দিতে পারি। স্বর্ণমুদ্রা আমাদের কাছে বেশি নেই। কথাটা বলে হ্যারি কাপড়ে প্যাচানো সোনার তির-ধনুটা বের করে আলফানকে দিল।
আলফানতির ধনুকটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল।বলল কতটা আসল সোনা আছে এটাতে?
তা কী করে বলবো। তাহলে কোনও স্বর্ণকারাকে দেখাতে হয়। হ্যারি বলল।
আলফান বলল–আমি বলি কি এটা আমার কাছে থাক। আপনারা কালকে আসুন। আমি এর মধ্যে আমার জানাশুনো এক স্বর্ণকারকে দেখিয়ে নেব।
–না। আমার এটা হাতছাড়া করবো না। ফ্রান্সিস বলল।
–তাহলে আমাকে বিশ্বাস করছেন না। আলফান বলল।
-ফ্রান্সিস বলল-দেখুন আমি কাউকেই অবিশ্বাস করতে চাই না। কিন্তু বিশ্বাস করে ঠকেছি। তবু আমি মানুষের ওপর বিশ্বাস হারাই নি। একটু থেমে বলল–আপনি তিরধনুক রাখলেন। কালকে এসে যখন চাইব তখন তো আপনি তিরধনুকের কথা অস্বীকার করতে পারেন। আমরা বিদেশি। আমাদের কথা কে বিশ্বাস করবে? আপনি এই অঞ্চলের ধনী ব্যবসায়ী। আপনার ক্ষমতা প্রতিপত্তি অনেক বেশি। এই সোনার তিরধনুক আপনার কাছে কিছুই না। কিন্তু আমাদের বাঁচা-মরা নির্ভর করছে এই মূল্যের ওপর। হ্যারি বলল–একটা কথা বলছি। আলফান–আপনি তো এই অঞ্চলের মানুষ। ব্যবসায়ী। নিশ্চয়ই আপনার পরিচিত কোন স্বর্ণকার এখানে আছে।
–তা আছে। আলফান বলল।
–তাহলে–এখন তো রাত বেশি হয়নি। চলুন না তার দোকানে। হ্যারি বলল। আলফান একটু ভাবল। পরে বলল–যাবেন–চলুন।
সবাই সমুদ্রতীর থেকে রাস্তায় উঠে এলো। একটা বাজার এলাকায় এলো। দোকানে দোকানে কাঁচকা বাতি জ্বলছে। লোকজনের তেমন ভিড় নেই। সবাই চলল।
বেশ কিছুটা এসে আলফান একটা দোকানে ঢুকল। পেছনে ফ্রান্সিসরা। দোকানে বসার জায়গা কম। মারিয়া আর হ্যারিকে বসিয়ে ফ্রান্সিস শাঙ্কো দাঁড়িয়ে রইল।
দেখেই বোঝা যাচ্ছে স্বর্ণকারের দোকান। কাঠের অলমারিতে বেশকিছু গয়নাগাঁটি রাখা। কর্মচারীরা সোনার কাজ করছে প্রদীপ জ্বেলে।
মালিক একটা উঁচু জায়গায় বসেছিল।
আলফানকে দেখে দোকানের মালিক উঠে দাঁড়াল। হেসে বলল– আসুন আসুন। আপনি এলেন। খবর পাঠালে আমিই যেতাম। আলফান হ্যারির হাত থেকে সোনার তিরধনুকটা নিল। মালিকের হাতে দিয়ে বলল, দেখুন তো এটা আসল সোনার কিনা। মালিক হাত বাড়িয়ে নিল। হাত বাড়িয়ে একটা কালো পাথর বের করল। পাথরটা কষ্টিপাথর। প্রথমে তির পরে ধনুকটা কষ্টিপাথরে ঘষল। পাথরের গায়ে সোনালি দাগ দেখল। মাথা তুলে বলল–খাদ আছে তবে আসল সোনাই বেশি।
