এবার পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান। রানির সোনার তির-ধনুক হাতে নিলেন। শাঙ্কো গিয়ে রানির সামনে দাঁড়াল। রানি শাঙ্কোকে সোনার তির-ধনুক দিলেন। শাঙ্কো মাথা পেতে নিল।তারপর মৃদুস্বরে বলল–মাননীয় রানি–আপনার কাছে আমার একটা আর্জি ছিল।
রানি মৃদুস্বরে বললেন–পরে তোমার কথা শুনবো। অন্য পুরস্কার দেওয়া চলল। ঐ অনুষ্ঠানটা শেষ হলে রানি সেনাপতিকে ডেকে পাঠালেন। সেনাপতি এসে বললেন– যে যুবকটি তির চালনায় প্রথম হয়েছে তাকে ডেকে আনুন। সেনাপতি এগিয়ে গেল। লোকজনের ভিড় তখন অনেক কমে গেছে। শাঙ্কো চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। সেনাপতি কাছে এসে বলল–তুমি এসো। রানি ডাকছেন।
শাঙ্কো আস্তে আস্তে রানির সামনে এসে দাঁড়াল। রানি বললেন–তুমি কী কথা বলতে চেয়েছিলে?
শাঙ্কো বলল–মাননীয়া রানি–আমরা জাতিতে ভাইকিং। জাহাজে চড়ে দেশে দেশে ঘুরে বেড়াই আর গুপ্তধন খুঁজে বের করি। আমরা কোনো বিশৃঙ্খলা ঘটাতে পারি এই আশঙ্কায় সেনাপতি মহাশয় আমাদের দুর্গে বন্দি করে রেখেছেন।
–কথাটা সত্যি? রানি সেনাপতির দিকে তাকিয়ে বললেন। সেনাপতি বলল–
-হ্যাঁ মাননীয়া রানি–তবে হাত পা বেঁধে রাখিনি। ওদের বলেছি আপনি রাজধানীতে ফিরে গেলেই ওদের মুক্তি দেব। সেনাপতি বলল।
মাননীয়া রানি–আমরা এখনই মুক্তি চাই। শাঙ্কো বলল।
রানি বললেন–তোমার মতো একজন দুর্ধর্ষ তিরন্দাজের অনুরোধ আমি কি রক্ষা না করে পারি। রানি সেনাপতির দিকে তাকালেন। বললেন–ভাইকিংদের মুক্তি দিন। ওরা যেমন খুশি চলাফেরা করুক।
সেনাপতি মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে চলে এলো। ঘোড়ায় চড়ল। দুর্গের দিকে। ঘোড়া ছোটোল।
দুর্গে এসে সেনাপতি ফ্রান্সিসদের ঘরে ঢুকল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল–মাননীয়া রানি তোমাদের মুক্তি দিয়েছেন। এখন তোমরা যেখানে খুশি যেতে পারো।
ফ্রান্সিস বলল–তিরন্দাজী প্রতিযোগিতায় কে প্রথম হল?
–তোমাদের যে বন্ধুটি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল। ভাইকিংরা চিৎকার করে উঠল—ও হো হো।
সেনাপতি মৃদু হাসল। তারপর ঘরের বাইরে এসে ঘোড়ায় উঠল।
শাঙ্কো এলো। সবাই শাঙ্কোকে ঘিরে দাঁড়াল। আনন্দে ওরা হৈ হল্লা শুরু করল। শাঙ্কো সোনার তির-ধুনকটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে দেখতে লাগল–এটা মনে হচ্ছে খাঁটি সোনার। এটা পাবে বলেই আমি শাঙ্কোকে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পাঠিয়েছিলাম। এই তির-ধনুক বিক্রি করে জাহাজ কিনবো। তারপর ঐ জাহাজে চড়ে দেশে ফেরা।
ফ্রান্সিসরা যখন সেতুবল বন্দরে এলো তখন সন্ধে হয়ে গেছে। বন্দর এলাকায় একটা বড় সরাইখানা পেল। ফ্রান্সিস সরাইখানাটায় ঢুকল। মালিক একটা কাঠের আসনে বসেছিল। মালিক মাঝবয়সী। ঢোলাহাতা জোব্বামতো পরে আছে। ফ্রান্সিস মালিকের কাছে গেল। বলল–আমরা ভাইকিং। দেশে দেশে ঘুরে বেড়ানো আমাদের ত্ব নেশা। আপনার সরাইখানায় আমরা আজ রাতে খাবো থাকবো।
–বেশ। মালিক বলল।
–ক’টা স্বর্ণমুদ্রা দিতে হবে? ফ্রান্সিস বলল।
–দুটো স্বর্ণমুদ্রা দেবেন। মালিক বলল।
ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে ডাকল। বলল–দুটো স্বর্ণমুদ্রা মালিককে দাও।শাঙ্কো কোমরের ফেট্টি থেকে দুটো স্বর্ণমুদ্রা বের করে মালিককে দিল। তারপর সবাইকে সরাইখানায় আসতে বলল। কয়েকজন ভাইকিং বন্ধু এসে কাঠের তক্তাপাতা বিছানায় বসল। কিছু ভাইকিং সরাইখানার ধারে একটু মাঠমতো জায়গায় গিয়ে বসল।
ফ্রান্সিস সরাইখানার মালিকের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে লাগল।তখনই মালিক বলল বোঝাই যাচ্ছে আপনারা বিদেশি। আপনারা এখানে এলেন কী করে?
–জাহাজে চড়ে। ফ্রান্সিস বলল।
জাহাজটা কি বন্দরে রেখে এসেছেন? মালিক বলল।
-না–আমাদের জাহাজ চুরি হয়ে গেছে। একদল জলদস্যু এই কান্ড করেছে। ফ্রান্সিস বলল।
জলদস্যুদের নেতার নাম জানেন? মালিক বলল।
–হ্যাঁ–গ্যাব্রিয়েল। ফ্রান্সিস বলল।
–উরি বাবা–গ্যাব্রিয়েল তো সাংঘাতিক জলদস্যু। ও হাসতে হাসতে মানুষ খুন করতে পারে। আপনাদের খুব ভাগ্যি যে আপনারা প্রাণে বেঁচে আছেন। মালিক বলল।
হু। আমরা ওদের খুঁজে বের করবো। আমাদের জাহাজ উদ্ধার করবো। তাই একটা জাহাজ কিনবো স্থির করেছি। ফ্রান্সিস বলল।
–আপনারা তো আলফানের জাহাজ কিনতে পারেন। মালিক বলল।
আলফান কে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–আলফান একজন মূর ব্যবসায়ী। ওর বাড়ি এখানেই। ব্যবসা চালাতে জাহাজ নিয়ে এদেশ-ওদেশ ঘুরে বেড়ায়। ইদানিং আলফানের খুব অর্থকষ্ট যাচ্ছে। তাই জাহাজ বিক্রি করছে।
তাহলে তো আলফানের সঙ্গে কথা বলতে হয়। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস সরাইখানার বাইরে এলো।
এখন অন্ধকার হয়ে গেছে। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে ডাকল–হ্যারি এদিকে এসো। হ্যারি এগিয়ে এলো। বলল
–কী ব্যাপার?
–শোনো–সোনার ধনুক-তিরটা তোমার কাছেই আছে তো?
হা। হ্যারি বলল।
–চলো জাহাজঘাটায় যাবো। ফ্রান্সিস বলল। –
-কেন বলল তো? হ্যারি বলল।
–সরাইখানার মালিক বলল–আলফান নামে একমুর ব্যবসায়ীতার একটি জাহাজ বু বিক্রি করবে। দেখা যাক জাহাজটা কেমন। কত দাম বলে। ফ্রান্সিস বলল।
–চলো। হ্যারি বলল।
জাহাজঘাটায় পৌঁছে দেখল বেশ কয়েকটা জাহাজ নোঙর করে আছে। জ্যোত্সা খুব উজ্জ্বল। সমুদ্রতীরের ঢাল বেয়ে নামল দুজনে।
পাতা পাটাতন দিয়ে প্রথম জাহাজটায় উঠল ওরা। একজন নাবিক রেলিঙ ধরে দাঁড়িয়েছিল। ফ্রান্সিস বলল–আরফানের জাহাজ কোষ্টা? নাবিকটি আঙ্গুল দিয়ে দেখালো শেষ জাহাজটা।
