–মুক্তি পেলে কী করে? সেনাপতি জানতে চাইল।
–সে অনেক ব্যাপার। সংক্ষেপে বলি–রাজা গঞ্জালেস-এর পৈতৃক ধনভান্ডার লুকনো ছিল একটা গুহায়। গুহার পাহারাদার ছিল বীভৎস দেখতে এক নররাক্ষস। তাকে হত্যা করে আমরা সেই ধনভান্ডার উদ্ধার করে দিয়েছিলাম। তাই আমরা ছাড়া পেয়েছিলাম। ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক আছে। আমরা তোমাদের কয়েদখানায় রাখবো না! তবে দুরাত সৈন্যদের ঘরে থাকতে হবে। সেনাপতি বলল।
ফ্রান্সিস জিজ্ঞাসা করল–কালকে যে প্রতিযোগিতা হবে তাতে কী পুরস্কার দেওয়া হবে?
–সোনার তির-ধনুক। সেনাপতি বলল।
–আমরা কালকের প্রতিযোগিতায় যোগ দিতে পারবো? ফ্রান্সিস বলল।
–তা পারবে। কিন্তু প্রতিযোগিতার জায়গা থেকে তোমরা তো পালিয়েও যেতে পারো। সেনাপতি বলল।
–এটা একটা কথা হল? আমার স্ত্রী আমার বন্ধুদের ফেলে রেখে পালিয়ে যাবো?
–ঠিক আছে, ঠিক আছে।তির তো গোল চাকতিতেই লাগাতে পারবেনা। মাঝখানে লাগানো তো দূরস্থান। ইচ্ছে হয়েছে ইচ্ছে মেটাও। তোমাদের একজনকে ছেড়ে দেওয়া হবে। সেনাপতি বলল।
–বেশ। ফ্রান্সিস বলল।
সেনাপতি ঘোড়ায় চড়ে বসল। তলোয়ার ঘুরিয়ে ডানদিকে যাওয়ার জন্যে নির্দেশ দিল। সৈন্যরা ফ্রান্সিসদের চলবার ইঙ্গিত করল। সৈন্যরা ফ্রান্সিসদের প্রায় ঘিরে নিয়ে চলল। দূর থেকে পাথরের ছোটো দুর্গা দেখা গেল।
সবাই যখন দুর্গদ্বারে পৌঁছাল তখন সন্ধে হয়ে এসেছে। সকলেই দুর্গে ঢুকল। সেনাপতি তলোয়ার তুলে একটা ঘর দেখাল। বলল–ঐ ঘরে এদের বন্দি করে রাখো। সেনাপতি ঘোড়া ছুটিয়ে চলে গেল।
ঘরটায় ঢুকল ফ্রান্সিসরা। দেখল কয়েকজন লোক ঘরের ঘাসপাতা বাঁধা বিছানায় শুয়ে বসে আছে। বোঝা গেল তারা সৈন্য। ফ্রান্সিসদের সৈন্যবাসেই রাখা হল।
ফ্রান্সিসরা বিছানায় বসল। কেউ কেউ শুয়ে পড়ল।
এতক্ষণে ফ্রান্সিস মারিয়ার দিকে ভালো করে তাকাল। মাথার চুল উসকোখুসকো। মুখ শুকিয়ে গেছে। ফ্রান্সিস কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। মারিয়াকে একটু সান্ত্বনা দেওয়া যাক–এই ভেবে ফ্রান্সিস মারিয়ার কাছে গেল। বসল। বলল–মারিয়া তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে?
মারিয়া হাসল। মাথা নাড়ল–না।
–তুমি যদি চাও তাহলে এখান থেকে বেরিয়ে তোমাকে আর হ্যারিকে আমাদের দেশের দিকে যাচ্ছে এমন কোনো জাহাজে তুলে দিতে পারি। আমাদের এত কষ্টের জীবন তুমি সহ্য করতে পারবে না। ফ্রান্সিস বলল।
–না–আমি তোমাদের সঙ্গেই থাকবো। এক সঙ্গে দেশে ফিরবো। আমার জন্যে ভেবো না। তুমি যেখানে যেভাবে থাকবে আমিও সেখানে সেইভাবেই থাকবো। মারিয়া বলল। ফ্রান্সিস আর কিছু বলল না। বড়ো ক্লান্তি সারা শরীরে। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে চোখের ওপর হাত ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল। উঠল–একবারে যখন খেতে দেওয়া হল।
পরের দিন ভোর থেকেই সাজো সাজো রব। এলাকার মানুষদের মধ্যে খুশির জোয়ার। রানি উরাকা আসছেন। সৈন্যরা যুদ্ধের সাজ পরল। রাস্তার দুপাশে সারি দিয়ে দাঁড়াল। সেনাপতি জবরজং পোশাকটা পরে ঘোড়ায় চড়ে সব দেখাশুনা করতে লাগল। এখন রানি উরাকার জন্যে প্রতীক্ষা।
কিছুক্ষণ পরে রানি উরাকা সাদা ধবধবে একটা ঘোড়ায় চড়ে এলেন। পেছনে পেছনে এলো রাজবাড়ির গাড়ি। তাতে কয়েকজন অমাত্য বসে আছেন।
রানির মাথায় হীরে বসানো সোনার মুকুট। গলায় বড়ো বড়ো মুক্তোর মালা। রোদ লেগে বিকিয়ে উঠছে। রানির সোনা-রুপোর সুতোয় কাজ করা পোশাক। জনতার ভিড়ের মধ্যে ধ্বনি উঠল-রানি উরাকার জয় হোক। রানি খুশি হয়ে হেসে হাত নাড়লেন।
প্রান্তরের একপাশে সামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। সামিয়ানার নীচে রানির বসবার আসন। আরো কয়েকটা আসন রাখা হয়েছে। অমাত্যরা সেখানে এসে বসলেন। রানি একটু পরে নিজের আসনে বসলেন। একটু বেলা হতেই দুর্গের পাশের প্রান্তরে লোক জড়ো হতে লাগল। এক প্রান্তে একটা কাঠের খুঁটিতে বাঁধা হল একটা গোল শক্ত কাগজের বৃত্ত। একটু পরপর বৃত্তগুলো ছোটো হতে হতে কেন্দ্রে এসে শেষ হয়েছে। তির ঐ গোলগুলির কেন্দ্রবিন্দুতে লাগাতে হবে।
ওদিকে সেনাপতি কথা রাখল। শাঙ্কোকে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে অনুমতি দেওয়া হল। শাঙ্কো তির-ধনুক চাইল। পেলও।তখনই শাঙ্কোর চোখে প্রায় জল এলো। নিজেদের জাহাজে গুছিয়ে রাখা তিরধনুকের কথা মনে পড়ল।
প্রতিযোগিতা শুরু হল। একে একে পনেরোজন প্রতিযোগী তির ছুঁড়ল। কোন তিরই কেন্দ্রবিন্দুতে লাগল না। এবার এলো ঐ দেশের সেরা তিরন্দাজ। তার ছোঁড়া তির কেন্দ্রবিন্দুর কাছে লাগল। এবার শাঙ্কোর পালা। শাঙ্কো তির-ধনুক নিল। নিশানা ঠিক করে তির ছুঁড়ল।শাঙ্কোরতিরও কেন্দ্রবিন্দুতে লাগল না। সেরা তিরন্দাজের তিরের কাছে লাগল।
আর এক দফা তির ছোঁড়ার কথা সেনাপতি বলল। পনেরোজন তিরন্দাজী তির ছুঁড়ল। কোনোটাই কেন্দ্রবিন্দুতে লাগল না। এবার সের তিরন্দাজী এগিয়ে এলো। শাঙ্কোর। দিকে একবার তাকাল। তারপর ধনুকের ছিলায় তির বসাল। নিশানা দেখে তির ছুঁড়ল। তিরটি কেন্দ্রবিন্দুতে গিয়ে বিধল। সমস্ত প্রান্তর ভরে উঠল দর্শকদের আনন্দধ্বনিতে।
এবার শাঙ্কো এগিয়ে এলো। ধনুক ধরে ছিলায় তির পরাল। হাওয়াটা আন্দাজ করল। তারপর আস্তে আস্তে ছিলাটা টেনে নিয়ে তির ছুঁড়ল। তিরটা আগের সেরা তিরন্দাজীর কেন্দ্রবিন্দুতে গেঁথে যাওয়াতিরটা দুফালি করে কেন্দ্রবিন্দুতে ঢুকে পড়ল। প্রথমে দর্শকরা বুঝল না। শাঙ্কো এগিয়ে গিয়ে প্রথমে ওরতিরটা খুলল। তারপর দোফালা হওয়া সেরা তিরন্দাজীর তিরটি তুলল। এবার সবাই বুঝল যে শাঙ্কোর তির সেরা তিরন্দাজীর তির ফালা করে কেন্দ্রে ঢুকে পড়েছে। দর্শক জনতা আন্দধ্বনি করল।
