কিছুক্ষণ পরেদুই বন্ধু সুস্থ হল। বোঝা গেল শাঙ্কোর থুতুর সঙ্গে সাপের বিষ বেরিয়ে গেছে।
ঐ ঘাসের প্রান্তরে ভাইকিংরা বসে পড়ল।
কিছুক্ষণ বিশ্রাম করল। হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস–ঐ জলদস্যু গ্যাব্রিয়েল আমাদের রাতে ওখানে নামিয়ে দিতে চেয়েছিল। রাতে ঐ সাপের আস্তানা পার হতে গেলে আমরা কেউ হয়তো বাঁচতাম না। গ্যাব্রিয়েল কেন আমাদের লক্ষ্য করে চিরবিদায়’ কথাটা বলেছিল এখন সেটা বুঝতে পারছি।
বেলা বাড়তে লাগল। দুপুর হল। এবার সবাই বুঝতে পারল খিদে পেয়েছে। খাদ্য চাই। হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস কী করবে এখন? সকলেই তো তৃষ্ণার্ত ক্ষুধার্ত।
ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। বলল–এখানকার ছোটো বন্দরটা সেতুবল–সেখানে চলো। ঐদিকে লোকজনের বসতি আছে। একটা সরাইখানা হয়তো পাবো।
ভাইকিংরা সবাই উঠে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস পুবমুখো হাঁটতে লাগল। পেছনে ভাইকিং বন্ধুরা।
কিছুদুর যেতেই ভাইকিংরা একটা রাস্তা পেল। সেই রাস্তা ধরেই ওরা চলল। সেতুবল জাহাজঘাটায় যখন পৌঁছাল তখন দুপুর সবাই কম-বেশি ক্ষুধায় তৃষ্ণায় কাতর।
সেতুবলের বসতি এলাকায় এলো ওরা। ফ্রান্সিস বলল–সবাই না গিয়ে আমি শুধু যাচ্ছি। একটা সরাইখানা পাই কিনা দেখি।
ফ্রান্সিস বন্দরের দিকে চলল। রাস্তার দুদিকেই বাড়িঘর দোর। ফ্রান্সিস সব দেখতে দেখতে চলল। তখনই দেখল একটা সরাইখানার মতো দোকান। ছোটো দোকান। ফ্রান্সিস দোকানটার সামনে এসে দাঁড়াল। দোকানের মালিক এগিয়ে এলো। বলল–কিছু খাবেন? ফ্রান্সিস বলল–পঁচিশতিরিশজন লোকের জন্যে আপনি রুটি মাংস রান্না করতে পারবেন?
–তা পারবো। তবে একটু সময় লাগবে। দোকানি বলল।
লাগুক। আপনি সব জোগাড় টোগাড় করুন। আমি বন্ধুদের নিয়ে আসতে যাচ্ছি। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস বন্ধুদের কাছে এলো। বলল–চলো সব। একটা সরাইখানা মতো পাওয়া গেছে। আমি রান্নার জোগাড় করতে বলে এসেছি। তোমরা চলো।
সবাই ফ্রান্সিসের পেছনে পেছনে চলল। ঐ সরাইখানায় এলো। দোকানি এসে ফ্রান্সিসকে বলল–যদি কিছু অগ্রিম দেন তাহলে বড়ো ভালো হয়।
ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে ডাকল। সব শুনেশাঙ্কো ওর কোমরের ফেট্টি থেকে একটা স্বর্ণমুদ্রা বের করে দিল। দোকালি স্বর্ণমুদ্রা পেয়ে খুব খুশি।
ফ্রান্সিস বন্ধু রাঁধুনি দুজনকে বলল–তোমরাও একটু হাত লাগাও। ঐ রোগপটকা চেহারার দোকানি এতজনের রান্না একা পারবে না। রাঁধুনি বন্ধুরা দোকানিকে সাহায্য করতে গেল। রান্নার আয়োজন শুরু হল।
দোকানটা ছোটো। সকলের বসার জায়গা হল না। কিছু দোকানের ভেতরে বসল। কিছু পাশের মাঠমতো জায়গাটায় বসল।
সন্ধের মধ্যেই ফ্রান্সিসদের খাওয়াদাওয়া হয়ে গেল। সবাই দোকান থেকে বেরিয়ে এলো। ফ্রান্সিস দোকানির কাছে এলো। আর একটা স্বর্ণমুদ্রা দিল। দোকানি আরো খুশি হল। ফ্রান্সিস বলল–এখানে এখন কোন্ রাজা রাজত্ব করছেন?
রাজা নয়–রানি। রাজা আলফনসোর মেয়ে উরাকা এখন রানি। দোকানি বলল।
–জাহাজঘাটা কোনদিকে? হ্যারি জানতে চাইল। দোকানি দক্ষিণদিক দেখিয়ে বলল–ঐদিকে।
ফ্রান্সিসরা দিক ঠিক করে হাঁটতে লাগল। রাস্তার লোকজন ফ্রান্সিসদের দেখে বেশ অবাক হল। ছেঁড়াখোঁড়া ময়লা বিদেশি পোশাক-পরা লোকগুলো কোথা থেকে এলো? ময়লা ছেঁড়া পোশাক-পরা মারিয়াকে দেখেই লোকজন আশ্চর্য হল বেশি।
ফ্রান্সিসরা চলল জাহাজঘাটার দিকে। জাহাজঘাটার কাছাকাছি পৌঁছাতেই হঠাৎ একদল সৈন্য ফ্রান্সিসদের ঘিরে ফেলল। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–কেউ বাধা দিও না। ভাই কিংরা দাঁড়িয়ে পড়ল। তখনই ঘোড়ায় চড়ে একজন বলিষ্ঠ চেহারার মানুষ এলো। সৈন্যরা মাথা নুইয়ে সম্মান জানাল। বোঝা গেল–অশ্বরোহী সেনাপতি।
রাস্তার লোকজনের মধ্যে তখন হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে গেছে। সেনাপতি ডান হাত তুলে গলা চড়িয়ে বলল–আপনারা দূরে চলে যান। কোনো ভয় নেই। লোকজনের ভয় এস একটু কমল। আস্তে আস্তে লোকজন চলে যেতে লাগল। কৌতূহলী কিছু লোক থেকে গেল। কী ব্যাপার দেখে যাবে।
বড়ো গোঁফওয়ালা সেনাপতি ঘোড়া থেকে নেমে ফ্রান্সিসদের কাছে এলো। বলল তোমাদের দলনেতা কে?
–আমি। কথাটা বলে ফ্রান্সিস এগিয়ে এলো।
–তোমরা কোন্ দেশের লোক? সেনাপতি জিজ্ঞেস করল।
–আমরা জাতিতে ভাইকিং। এখানে বেড়াতে এসেছি। হ্যারি বলল।
–ও। আমরা শুনেছি ভাইকিংরা খুব দুঃসাহসী জাতি। জাহাজ চালাতে ওস্তাদ। সেনাপতি বলল। ফ্রান্সিসরা চুপ করে রইল। কোনো কথা বলল না। সেনাপতি বলল কাল এখানে রানি উরাকা আসবেন। কাল এখানে তির ছোঁড়ার প্রতিযোগিতা হবে।
তোমরা বিদেশি। তোমাদের বিশ্বাস কী? কালকের প্রতিযোগিতা চলাকালীন তোমরা কী গন্ডগোল পাকাবে–কে জানে। তাই তোমাদের বন্দি করা হল। তোমাদের আজ ও কালকের দুই রাত বন্দি হয়ে থাকতে হবে। রানি উরাকা চলে গেলে তোমাদের মুক্তি দেওয়া হবে।
–কিন্তু আমরা তো কোনো অপরাধ করিনি। হ্যারি বলল।
না-তা করোনি। কিন্তু রানির নিরাপত্তার জন্যেই এই ব্যবস্থা। সেনাপতি বলল।
–দেখুন আমরা কিছুদিন আগে রাজা গঞ্জালেস-এর রাজত্বের রাজধানী দামিল গিয়েছিলাম। জানতে গিয়েছিলাম আমরা কোথায় এসেছি। রাজা গঞ্জালেসের সৈন্যরা আমাদের বন্দি করল। ওরা বলল–তোমরা রানি উরাকার গুপ্তচর। আমরা বিদেশি। গুপ্তচরবৃত্তি করে আমাদের কী লাভ। তাদের সেনাপতিকে সেই কথা বোঝাবার চেষ্টা করেছি। কী রাজা গঞ্জালেস কী সেনাপতি কেউই আমাদের কথা বিশ্বাস করল না। কয়েকদিন কয়েদঘরে কাটাতে হল।
