হ্যারি বলল–ওরা আমাদের এই জাহাজ থেকে কোথাও নামিয়ে দিয়ে এই জাহাজ নিয়ে চলে যাবে।
–বলল কি? মারিয়া বিস্ময়ে বলে উঠল। সারি দিয়ে দাঁড়ানো ভাইকিংরা মারিয়ার দিকে তাকাল। কিন্তু ঠিক বুঝল নাজলদুস্যদের নেতা কী বলেছে।
এবার হ্যারি ওদের দেশীয় ভাষায় গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসব, জলদস্যুদের নেতা গ্যাব্রিয়েল আমাদের এখানে এই পোর্তুগাল দেশের একটা অংশে সমুদ্রতীরে কোথাও নামিয়ে দিয়ে আমাদের জাহাজ নিয়ে চলে যাবে।
ভাইকিংদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হল। ওরা বুঝল ওদের অস্ত্রহীন অসহায় অবস্থা। তবু দু একজন বলে উঠল–ফ্রান্সিস, তুমি বলো আমরা এক্ষুণি লড়াইয়ে নামবো। হ্যাঁ নিরস্ত্র অবস্থাতেই। জলদস্যুদের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে আমরা লড়াই চালাবো।
ফ্রান্সিস একটু চুপ করে থেকে বলল–ভাইসব, আমি সবদিক ভেবেছি। আমাদের জাহাজটা আমাদের কতটা প্রিয়, কতটা ভালোবাসার তোমরা জানো। কিন্তু আজ আমরা অসহায় দর্শকমাত্র। কিছু করার নেই। যে দুঃখজনক ঘটনাটা ঘটতে চলেছে সেটা মেনে নাও। এটা আমার অনুরোধ।
সবাই চুপ করে রইল। নিজেদের নিরুপায় অবস্থাটা সকলেই বুঝতে পারল।
দুপুরে রাঁধুনি বন্ধুরা রান্নাবান্না সারল। অবশ্য তিনজন জলদস্যু ওদের পাহারায় ছিল।
জাহাজের ডেক-এই ভাইকিংদের খেতে দেওয়া হল। হ্যারি কিছুই খেতে পারছিল না। একবার ফুঁপিয়ে উঠল। পাশে-বসা ফ্রান্সিস বাঁ হাতটা হ্যারির কাঁধে রাখল। বলল, হ্যারি এসব নিয়ে ভেবো না। পেট পুরে খাও। গায়ের জোর রাখো।
বিকেলের দিকে গ্যাব্রিয়েল ফ্রান্সিসদের জাহাজে এলো। সেই দরাজ হাসি হাসতে লাগল। হ্যারির মনে হল লোকটা বোধহয় হাসতে হাসতে নরহত্যা করতে পারে।
গ্যাব্রিয়েল গলা চড়িয়ে বলল–আজ রাতেই তোমাদের তীরে নামিয়ে দেওয়া হবে। মুক্তি! তাই না? গ্যাব্রিয়েল হেসে উঠল।
হ্যারি বলল–না–রাতের অন্ধকারে আমরা নামবো না। এটা আমাদের কাছে। অচেনা দেশ। কাল সকালে আমরা নামবো। গ্যাব্রিয়েল হেসে উঠল–বলছিলাম রাতে নামলে একটা রাত আগে মুক্তি পেতে। তাছাড়া এখানে দিন কয়েকের মধ্যেই রানি উরাকার সঙ্গে রাজা গঞ্জালেস-এর যুদ্ধশুরু হবে। এসময় দিনের বেলা আমাদের দেখলে রানি উরাকার সৈন্যরা আমাদের গুপ্তচর ভেবে বন্দি করতে পারে।
হ্যারি বলল–না–আমরা কাল সকলেই নামবো।
গ্যাব্রিয়েল হো হো করে হেসে উঠল। বলল–বেশ। তাই হবে। গ্যাব্রিয়েল গলা চড়িয়ে নিজের দলের যোদ্ধাদের বলল–খুব সাবধানে পাহারা দিবি। কেউ যেন পালাতে না পারে। কাউকে জলে ঝাঁপ দিয়ে পালাতে দিবি না। আর একটা কথা–দুটো জাহাজই থামিয়ে রাখ। কাল সকালে চালাবি। যেখানে থামতে বলবো সেখানে থামাবি।
গ্যাব্রিয়েল চলে গেল নিজেদের জাহাজে।
পরদিন সকালে ফ্রান্সিসরা সকালের খাবার খেল। ওদিকে কয়েকজন জলদস্যু ফ্রান্সিসদের জাহাজটা ওদের জাহাজের পেছনে কাছি দিয়ে বাঁধল। জলদস্যুরাই দাঁড় বেয়ে জাহাজ দুটো আস্তে আস্তে চালিয়ে নিয়ে চলল তীরভূমির দিকে।
তীরভূমির কাছাকাছি এসে ফ্রান্সিসদের জাহাজটা থামানো হল। কাঠের পাটাতন ফেলা হল। ফ্রান্সিসরা নামাবার জন্য তৈরি হল। ওরা নামছে তখন গ্যাব্রিয়েল নিজেদের জাহাজের ডেক-এ এসে দাঁড়াল। হাসতে হাসতে হাত নাড়তে থাকল। বলে উঠল– বন্ধুগণ–চিরবিদায়।
হ্যারি একটু চমকাল। গ্যাব্রিয়েল চিরবিদায় কথাটা বলল কেন? পরক্ষণেই ভাবল গ্যাব্রিয়েল একটা নরঘাতক জলদস্যু। ওর বিদ্যেবুদ্ধি মতোই কথাটা বলেছে।
মারিয়া অনেকক্ষণ থেকেই রুমালে মুখ ঢেকে কাঁদছিল। পাটাতন দিয়ে নামার সময় জৈারে কেঁদে উঠল। ফ্রান্সিস পেছনেই ছিল। কোনো কথা বলল না। ফ্রান্সিসের নিজের চোখও ভিজে উঠেছে তখন।
ভাইকিংরা সবাই তীরে নামতে লাগল। সবাই নামলে জলদস্যুরা কাঠের পাটাতন তুলে নিল। দুটো জাহাজই তীর থেকে দূরে ভেসে যেতে লাগল।
তীর থেকে উঠে ফ্রান্সিসরা দেখল চারদিকে কোনো জনবসতি নেই। কিছু জংলা গাছের এলাকা ছাড়িয়ে ওরা এলো। দেখল–ছাইরঙা মাটি। ওখানে আসতেই এক ভাইকিং বন্ধু পায়ের পাতায় হাত দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল–ফ্রান্সিস–সাপ।
এতক্ষণ সবাই দেখল সেই সাপের আড্ড। কত বিচিত্র বর্ণের ছোটো বড়ো সাপ এই এবড়ো খেবড়ো ছাইরঙা মাটির ওপর ঘুরে বেড়াচ্ছে। সকালের রোদ লেগে সাপগুলোর গায়ের আঁশ চক্ করছে। কিছু সাপ গর্তেও ঢুকে আছে। তখনই আবার আর এক ভাইকিং বন্ধু চিৎকার করে উঠল। ফ্রান্সিস চিৎকার করে বলল–এখানে আর এক মুহূর্তও নয়। দুই বন্ধুকে কাঁধে নিয়ে ছুটে এলাকাটা পার হয়ে যাও।
ভাইকিংরা দুই বন্ধুকে কাঁধে তুলে নিয়ে এক ছুটে এলাকাটা পার হয়ে গেল। সবাই ততক্ষণে ছুটে ঐ সাপের আড্ড পার হয়ে ঘাসে-ঢাকা প্রান্তরে এসে দাঁড়াল। সবাই হাঁপাচ্ছে তখন।
সাপে কাটা দুই বন্ধুকে কাঁধ থেকে নামিয়ে প্রান্তরের ঘাসে বসিয়ে দেওয়া হল। শাঙ্কো এগিয়ে এলো। কোমর থেকে ছোরাটা বের করল। ঘাসের ওপর বসল। এক বন্ধুর সাপে কাটা পা-টা ধরল। তারপর কামড়ানোর জায়গাটা ছোরা দিয়ে একটু চিরে ধরল। তারপর ঐ জায়গাটায় মুখ দিয়ে চুষতে লাগল। চুষল আর থু থু করে রক্ত ফেলে দিল। বারতিনেক এরকম করে অন্য বন্ধুর কাছে গেল। একইভাবে কাটা জায়গাটা চিরে চুষতে লাগল। থুতু রক্ত ফেলতে লাগল। তারপর চোষা বন্ধ করল। শাঙ্কো ঘাসের ওপর শুয়ে পড়ল। হাঁপাতে লাগল।
