ওদিকে অন্য জলদস্যুরা কেবিনঘরে ঢুকে ঢুকে ভাইকিংদের গায়ে আস্তে জোরে তলোয়ারের খোঁচা দিয়ে জাগাতে লাগল। ঘুম ভেঙে ভাইকিংরা দেখল–খোলা তলোয়ার হাতে জলদস্যুরা দাঁড়িয়ে। ওরই মধ্যে একজন ভাইকিং জলদস্যুদের নজর এড়িয়ে অস্ত্রঘরের সামনে এলো। দেখল–অস্ত্রঘরের সামনে পাহারা দিচ্ছে খোলা তলোয়ার হাতে দুজন জলদস্যু। ওরা হতাশা হল। খালি হাতে লড়াই করতে গেলে জীবন সংশয় হবে। ওরা জলদস্যুদের নজরে পড়ে গেল। বন্দি হল।
তখন ভোর হয়ে এসেছে। সূর্য ওঠেনি। ভাইকিংদের সবাইকে ডেক-এ নিয়ে এলো জলদস্যুরা। জলদস্যুরা ভাইকিংদের মধ্যে মারিয়াকে দেখে বেশ অবাকই হল। মারিয়াকে একপাশে দাঁড় করিয়ে রাখল।
সূর্য উঠল। রোদ ছড়াল। কালো আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেল।
ফ্রান্সিস হ্যারিও বন্দি। দুজনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল।হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস, আবার জলদস্যুদের পাল্লায় পড়লাম। পেড্রো আবার আমাদের বিপদে ফেলল। এখন এদের হাত থেকে কী করে উদ্ধর পাবো।
–হ্যারি, মন খারাপ করো না। উপায় একটা হবেই। আমাদের নিয়ে ওরা কী করবে সেটা আগে বুঝি। তারপর ফন্দি করে পালাতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিসদের জাহাজ থামানো হল। জলদস্যুদের জাহাজ থামল।
এক সর্দারগোছের জলদস্যু ফ্রান্সিসদের দিকে এগিয়ে এলো। বলল–তোমাদের মধ্যে সর্দার কে?
–আমি। ফ্রান্সিস বলল।
চলো–গ্যাব্রিয়েল-এর কাছে। জলদস্যুটি বলল।
–হ্যাঁ চলো–আমার এক বন্ধুও যাবে। ফ্রান্সিস বলল।
জলদস্যুটা একটু ভেবে বলল–বেশ আসুক।
ফ্রান্সিসরা ঢেউ-এর ধাক্কায় দোল খাওয়া দুটো জাহাজের মধ্যের ফাঁকটুকু সাবধানে পার হয়ে গ্যাব্রিয়েল-এর জাহাজে এলো।
সর্দার জলদস্যুটির নির্দেশে ফ্রান্সিসরা সিঁড়ি দিয়ে নেমে একটা কেবিনঘরের দরজার সামনে এলো। দরজা বন্ধ। সর্দারটি দরজায় টোকা দিল। ভেতর থেকে গম্ভীর গলা শোনা গেল–আয়। সর্দার দরজা খুলে ফ্রান্সিসদের ঢুকতে ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিসরা ঢুকল। দেখল বিছানায় বসে আছে একটা মোটা লোক। মুখে দাড়ি গোঁফ। বিছানাটায় পরার কাপড়চোপড় সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। বোধহয় লোকটার কোনো পোশাকই পছন্দ হয়নি। তাই ছুঁড়ে ফেলেছে। লোকটার খালি। বোঝা গেল এই লোকটাই দস্যুদলের নেতা–গ্যাব্রিয়েল।
গ্যাব্রিয়েল কিছুক্ষণ চোখ কুঁচকে ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে রইল। বুঝে নিতে চাইছে। ফ্রান্সিসরা ভয় পেয়েছে কিনা। তারপর হো হো করে হেসে উঠল। বলল– আমি ভেবেছিলাম তোমাদের জাহাজ লুঠ করবো। তা একে তোমরা ভিনদেশী লোক আবার দরিদ্র। ছেঁড়াখোঁড়া কীসব পোশাক পরে আছে। দেখলেই ভিখিরি বলে মনে হয়।
–এজন্যে আমরা বিন্দুমাত্র লজ্জিত নই। হ্যারি বলল।
গ্যাব্রিয়েল আবার হেসে উঠল। বলল–থাকতো এসব-এসব তোমাদের ব্যাপার। কিন্তু আমার যে একটা জাহাজ খুবই দরকার–তার কী করবো?
–আপনি তো যথেষ্ট ধনী। একটা জাহাজ কিনে নিন। ফ্রান্সিস বলল।
উঁহু–আমি জাহাজ কিনবো না। তোমাদের শক্তপোক্ত জাহাজটা আমি নেব। আবার গ্যাব্রিয়েল হেসে উঠল।
হাসতে হাসতে বলল–ঐ একটা জিনিসই তোমাদের কাছে আছে যা কেড়ে নিয়ে আমাদের লাভ হবে। ফ্রান্সিস ও হ্যারি মুখ চাওয়া চাওয়ি করল। হ্যারি বলল– আপানার কথাটা ঠিক বুঝলাম না।
গ্যাব্রিয়েল হেসে উঠল। বলল–এতো জলের মতো সোজা কথা। তোমাদের এখানে কোথাও নামিয়ে দেব। তারপর তোমাদের জাহাজটা আমরা নিয়ে চলে যাবো।এবার বুঝলে?
-বুঝলাম। কিন্তু তা অসম্ভব। আমরা জাহাজ দেব না। ফ্রান্সিস বলল।
গ্যাব্রিয়েল এবার আরও জোরে হেসে উঠল। বলল–তোমার কথা শুনে এত হাসি আসছে মানে–তাহলে তো তোসাদের খালি হাতে আমাদের সঙ্গে লড়তে হয়। লড়াই হলে তোমরা কেউ বেঁচে থাকবে? আঁ?
ফ্রান্সিস চিৎকার করে বলল–পরোয়া করি না কতজন বাঁচবো কতজন মরবো। আমরা আমাদের জাহাজ নিতে দেব না।
হ্যারি মৃদুস্বরে বলল–ফ্রান্সিস মাথা গরম করো না। তাতে আমাদের বিপদই বাড়বে। এবার গ্যাব্রিয়েল বলল–তাহলে তো উপায় নেই। তোমাদের সবাইকে খতম করে জাহাজ কেড়ে নিতে হবে।
হ্যারি বলল–তার দরকার নেই। আমরা এমনিতেই আপনাকে জাহাজ দিয়ে দেব।
–এই তো একটা বুদ্ধিমানের মতো কথা। গ্যাব্রিয়েল বলল।
ফ্রান্সিস হ্যারির দিকে তাকাল। বলল–এ কী বলছেন?
–আমি ঠিকই বলেছি। পরে এই নিয়ে কথা হবে। এখন নয়। হ্যারি বলল।
ফ্রান্সিস আর কোনো কথা বলল না। কত দুঃখকষ্ট কত আনন্দ উল্লাস জড়িয়ে আছে ওই জাহাজটার সঙ্গে। সেটা দিয়ে দেব? বিনা যুদ্ধে? কিন্তু এখন যা অবস্থা দাঁড়িয়েছে জাহাজটা দিয়ে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। ফ্রান্সিস মাথাটা আস্তে আঁকিয়ে বলল ঠিক আছে। আমরা কথা বলে নিই।
–বেশ তো–সব দিক ভেবেচিন্তে দেখবে আমার প্রস্তাবে রাজি না হয়ে তোমাদের উপায় নেই। গ্যাব্রিয়েল বলল।
হ্যারি গ্যাব্রিয়েলকে জিজ্ঞেস করল–এ জায়গাটা কি পোর্তুগালের মধ্যে।
–হ্যাঁ। এখানে সেতুবল নামে একটা ছোটো বন্দর আছে। ওরই কাছাকাছি তোমাদের নামিয়ে দেওয়া হবে। তারপর তোমাদের জাহাজ নিয়ে আমরা চলে যাবো। কথাটা বলে গ্যাব্রিয়েল হেসে উঠল।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি কোনও কথা বলল না। দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে নিজেদের জাহাজে ফিরে এলো। ডেক-এ এসে দাঁড়াল। মারিয়া এগিয়ে এলো। বলল–ফ্রান্সিস জলদস্যুদের নেতা কী বলল?
