রাজা গঞ্জালেস জাহাজটা ঘুরে ঘুরে দেখলেন। খুব খুশি হলেন।
রাজা সেনাপতিকে বললেন–জাহাজে দুটো কামান রাখা হয়েছে। আমাদের এখন গোলন্দাজ বাহিনী গড়ে তুলতে হবে। গোলা বারুদ কিনতে হবে। সেনাপতি বলল–
হা মহারাজ এটা করতে হবে আর করতে হবে খুব তাড়াতাড়ি। কারণ রানি উরাকা যেকোনো সময় আপনার রাজ্য আক্রমণ করতে পারে। কথাটা শুনে রাজা মাথা ওঠানামা করলেন। বোঝা গেল–এই আশঙ্কার কথা তিনি বোঝেন।
জাহাজটার মাস্তল পাল দাঁড়টানা ঘর সবই দেখলেন রাজা। তারপর নেমে এলেন। প্রজাদের ভিড় থেকে ধ্বনি উঠল–রাজা রানি দীর্ঘজীবী হোন। রানি হাত তুলে হাসলেন।
রাজা রানি গাড়িতে গিয়ে উঠলেন। গাড়ি চলল রাজপ্রাসাদের দিকে।
ভাইকিংরা জাহাজের ডেক-এ দাঁড়িয়ে এসব দেখল।
এবার হ্যারি ফ্রান্সিসের কাছে এলো। বলল
–এখন আমরা কী করবো?
–ফ্লেজারকে বলো দেশের দিকে জাহাজ চালাতে। ফ্রান্সিস বলল। হ্যারি বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল–ভাইসব–ফ্রান্সিস বলেছে এখন জাহাজ দেশের দিকে যাবে। ভাইকিংরা চিৎকার করে উঠল–ও-হো-হো।হ্যারি বলল–পাল খুলে দাও। বাতাস পড়ে গেছে। দাঁড় টানতে যাও। নোঙর তোল।
ঘর ঘর শব্দে নোঙর তোলা হল। কয়েকজন ভাইকিং মাস্তুল বেয়ে কিছুটা উঠে পালের কাঠের ওপর দাঁড়াল। গোটানো পাল খুলে দড়ি দিয়ে বাঁধল। পালগুলো ফুলে উঠল। তবে হাওয়ার খুব জোর নেই।
সাত আটজন ভাইকিং তখন দাঁড়ঘরে গিয়ে দাঁড় টানতে লাগল। সমুদ্রের জলে শব্দ উঠল –ছপ ছপ ছপ্।
জাহাজ মোটামুটি জোরে সমুদ্রের ঢেউ ভেঙে চলল।
বিকেল নাগাদ জোর বাতাস ছুটল। জাহাজ দ্রুত ছুটল। ভাইকিংরা খুব খুশি। আর দাঁড় টানতে হচ্ছেনা। নিজেদের দেশে ফিরে যাচ্ছে। সকলের মনেই প্রশ্ন–স্বদেশ আর কতদুর?
জাহাজ তীরের কাছ দিয়েই চলেছে। তীরের গাছপালা অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সূর্যাস্ত দেখতে মারিয়া তখন ডেক-এ উঠে এসেছে। তাকিয়ে রয়েছে পশ্চিম আকাশের দিকে। হ্যারি এগিয়ে এলো। বলল–রাজকুমারী ফ্রান্সিসকে রাজি করান যাতে ও স্বদেশের দিকেই জাহাজ চালায়।
–আমি তো কতবার বলেছি–আর নয়। এবার স্বদেশে ফেরো। কিন্তু ও কোনো কথা শুনলে তো।
আস্তে আস্তে সূর্য পশ্চিম দিগন্তের জলের ঢেউয়ের মধ্যে যেন ডুবে গেল। পশ্চিম দিগন্তে লালচে আভা ছড়িয়ে রইল। তারপর সব অন্ধকার হয়ে গেল। আকাশে চাঁদের আলো উজ্জ্বল হল। তারা দেখা গেল। মারিয়া নিজের কেবিনে চলে গেল।
রাতে খাওয়াদাওয়ার পর হ্যারি ফ্রান্সিসের কেবিনঘরে এলো। দেখল–ফ্রান্সিস বিছানায় আধশোয়া। মারিয়া বিছানায় বসে ছেঁড়া কাপড় জামা সেলাই ফোঁড়াই করছে। হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস, এখন কী করবে?
–জাহাজ দেশের দিকে চলুক। ফ্রান্সিস বলল। মারিয়া বলল–তুমি তো আবার! কোনও গুপ্তধনের খোঁজ পাবে। ব্যস ছুটলে সেই গুপ্তধন উদ্ধার করতে।
ফ্রান্সিস হেসে বলল–ঐসব কাজের জন্যেই তো দেশ ছেড়ে বিদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছি। হ্যারি আর কোন কথা বলল না। নিজের কেবিনঘরে চলে এলো।
রাত গভীর তখন। কালো আকাশে ভাঙা চাঁদ। জ্যোৎস্না উজ্জ্বল নয়। অজস্র তারা। জ্বলজ্বল করছে। সমুদ্র আকাশ বেশ অন্ধকার।
মাস্তুলের মাথায় নীচের বসবার জায়গাটিতে নজরদার পেড্রো বসেছিল। চারদিকে নজর রাখছিল। তীরভূমি নজরে পড়ে কিনা। জলদস্যুদের জাহাজ আসছে কিনা। কিছুক্ষণ থেকেই পেড্রো দেখছিল প্রায় অন্ধকার সমুদ্রে ওদের জাহাজের কাছ দিয়ে একই গতিতে চলেছে ছায়ার মতো একটা জাহাজ। পেড্রো এবার ঝুঁকে পড়ে সেই জাহাজটা দেখল ভালো করে। জাহাজটার মাথায় একটা পতাকা উড়ছে। কিন্তু কোন্ দেশের পতাকা তা বোঝা গেল না। তবে এটা বুঝল যে ওটা জলদস্যুদের জাহাজ নয়। তাহলেই হল।
প্রথমে পেড্রোর একটু তন্দ্রামতো এলো। তারপর ঘুম। পেড্রো ঘুমিয়ে পড়ল।
আসলে ঐ জাহাজটা ছিল জলদস্যুদের জাহাজ। প্রায় অন্ধকার সমুদ্রে জলদস্যুরা নৌকা জলে নামাতে লাগল। নৌকায় চড়ে দলে দলে জলদস্যুরা ফ্রান্সিসদের জাহাজে এসে উঠতে লাগল নিঃশব্দে। পেড্রো তখন গভীর ঘুমে। জলদস্যুরা হালের কাছে জমায়েত হতে লাগল।
নিজেদের জাহাজ থেকে পাখি ডাকার সঙ্কেত ভেসে এলো। ওরা এবার খোলা তলোয়ার হাতে ডেক-এর ওপর উঠে আসতে লাগল। ডেক-এর ওপর নিঃশব্দে চলাফেরা করতে লাগল।
একজন জলদস্যু মাস্তুল বেয়ে ঘুমন্ত পেড্রোর কাছে এলো। পেড্রোর গলায় তলোয়ারের ডগা ঠেকিয়ে খোঁচা দিল। পেড্রো ধড়মড় করে উঠে দাঁড়াতে গেল। তখনই দেখল ওর গলায় তলোয়ারের ডগা ঠেকিয়ে রয়েছে এক জলদস্যু। ইয়া গোঁফ ইয়া জুলপি। জলদস্যুটি আস্তে বলল–নেমে এসো। কোনো শব্দ নয়। পেড্রো আর কী করে। জলদস্যুদের হাত থেকে বাঁচতেই ওর নজরদারি। সেই ওর সামনেই খোলা তলোয়ার সাক্ষাৎ এক জলদস্যু। পেড্রো মাস্তুল বেয়ে নামতে লাগল। পেছনে খোলা তলোয়ারের হাতে জলদস্যুটিও নামতে লাগল।
ওদিকে অন্য জলদস্যুরা সিঁড়ি দিয়ে নেমে কেবিনঘরের সামনে এলো। কয়েকজন ফ্রান্সিসদের অস্ত্রঘরের সামনে এলো। দেখল তলোয়ার হাতে একজন ভাইকিং অস্ত্রঘর পাহারা দিচ্ছে।
পাহারাদার ভাইকিংটি কিছু বোঝার আগেই আক্রান্ত হল। ডান হাতে তলোয়ারের কোপ পড়ল। হাদ থেকে তলোয়ার ছিটকে গেল। পাহারদারটি জলদস্যুদের হাতে বন্দি হল। দুজন জলদস্যু অস্ত্রঘরের পাহারায় দাঁড়িয়ে গেল।
