ফ্রান্সিস বাক্সের কড়াটা ধরে টানতে টানতে অন্ধকারে নিয়ে চলল গুহার মুখের দিকে। গুহার মুখ দিয়ে ফ্রান্সিস শুয়ে শুয়ে বেরিয়ে এলো। বাক্স উঁচু করে ধরে নেমে এলো দেখা গেল একটা পেতলের বাক্স। বাক্সটা সারা গায়ে নীল সবুজ মিনে করা। তারই মধ্যে মধ্যে হীরের টুকরো বসানো ফ্রান্সিস বাক্সটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল কোনে
চাবির ফুটো নেই। তাহলে টানা আছে। ও একপিঠের ঢাকাটা ঠ্যালা দিল। টানা পরে খুলে গেল। মশালের আলোয় ঝিকিয়ে উঠল সোনার কত বিচিত্র গয়নাগাঁটি। সে সবের নীচে দেখল হীরে মণি-মাণিক্য। শাঙ্কো বিস্কোও দেখল। যাক্। রাজা গঞ্জালেসের পৈতৃক ধনরত্ন উদ্ধার করা গেছে। এবার মুক্তি।
ওরা একে একে গুহা থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে বেরিয়ে এলো। এবার ঝোপজঙ্গলের মধ্য দিয়ে চলল যেখানে এই খাদটা শুরু হয়েছে সেইদিকে। ওদের গায়ের পোশাক গুহার লালচে ধূলোর আস্তরণ ওরা ঝাড়ল ধুলো উড়ল। কিন্তু পোশাক পরিষ্কার হল না। খাদের শেষে এসে ওরা যখন উঠে এলো দেখল রাজা গঞ্জালেস মন্ত্রী ও সেনাপতি দাঁড়িয়ে আছেন। ফ্রান্সিস রাজা গঞ্জালেসের কাছে গেল। বাক্সটা রাজাকে দিল। রাজা গঞ্জালেসের মুখে হাসি আর ধরে না। তাড়াতাড়ি টানা খুলল। দেখল গয়না গাঁটি মণি রত্ন।
ফ্রান্সিস বলল–মাননীয় রাজা এবার তাহলে আমার বন্ধুদের মুক্তি দিন। আমরা জাহাজে ফিরে যাবো। রাজা সেনাপতিকে বললেন–ওদের ছেড়ে দাও। এবার রাজা ফ্রান্সিসকে বলল–নররাক্ষসকে কি হত্যা করতে পেরেছো।
–হ্যাঁ। নররাক্ষস ঐ গুহাতেই মরে পড়ে আছে। ফ্রান্সিস বলল।
সেনাপতির সঙ্গে ফ্রান্সিসরা কয়েদঘরের সামনে এলো। সেনাপতি একজন রক্ষীকে বলল–সবাইকে মুক্তি দাও। কারারক্ষী দরজা খুলে দিল। ভাইকিংরা বেরিয়ে এলো। ধ্বনি তুলল–ও-হো-হো।
ফ্রান্সিসের তখন চিন্তা মারিয়া সুস্থ আছে তো? তাই ও আর দেরি করতে চাইল না। শাঙ্কো তখন বন্ধুদের বলছে নররাক্ষসকে কী করে ওরা হত্যা করল তার ঘটনা।
এবার সবাই রওনা হল জাহাজঘাটার দিকে।
সন্ধ্যার সময় ওরা জাহাজঘটায় এলো। জাহাজে উঠল সবাই। তখন সবাই আনন্দে মাতোয়ারা।
ফ্রান্সিস দেখল মারিয়া জাহাজের ডেক-এ দাঁড়িয়ে আছে। কাছে এসে দেখল মারিয়া অনেকটা সুস্থ। ফ্রান্সিস বলল–সূর্যাস্ত তো দেখেছো?
-হ্যাঁ। মারিয়া হেসে বলল।
–এবার কেবিনে চলো। শুয়ে বিশ্রাম করবে। ফ্রান্সিস বলল।
–সারাদিন শুয়ে থাকতে ভালো লাগে নাকি। মারিয়া বলল।
–রাজা গঞ্জালেসের পৈতৃক ধনভান্ডার কী করে উদ্ধার করলাম সেই গল্প শুনবে এসো। ফ্রান্সিস বলল।
–বেশ চলো। মারিয়া বলল।
দুজনে কেবিনঘরে এলো। ফ্রান্সিস গায়ের পোশাকটা খুলে ফেলল। দেখল গায়েও লালচে ধুলো লেগেছে। বলল–দাঁড়াও–একটু গা ধুয়ে আসি।
ও বেরোতে যাবে তখনই ভেন ঢুকল। ফ্রান্সিস বলল–ভেন–মারিয়া এখন কেমন আছে?
–সম্পূর্ণ সুস্থ। তবে শরীরের দুর্বলতাটা কাটতে একটু সময় লাগবে। ভেন বলল।
দুর্বলতা কাটাবার ওষুধ দিয়েছো তো? ফ্রান্সিস বলল।
–দিয়েছি। রাজকুমারী খান না। ভেন বলল।
–কেন? ফ্রান্সিস মারিয়ার দিকে তাকাল। মারিয়া বিছানায় হাতের তোলা দিয়ে চাপড় মেরে বলে উঠল–হাঁ ভগবান। সে যে কী তেতো তা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না।
–ঠিক আছে ঐ ওষুধ আমিও খাবো। তাহলে তো তোমার খেতে আপত্তি নেই? ফ্রান্সিস বলল।
–কিন্তু তুমি মানে মারিয়া কথটা শেষ করতে পারল না।
–হ্যাঁ। খাবো। ফ্রান্সিস বলল।
–বেশ। আমিও খাবো। মারিয়া বলল।
ভেন দুজনের কথা শুনছিল আর মৃদু মৃদু হাসছিল।
পরদিন ভোরে লোকজনের কথাবার্তায় ফ্রান্সিসের ঘুম ভেঙে গেল। উঠে দেখল– মারিয়া বসে আছে।
–কী ব্যপার বলো তো?
–রাজা গঞ্জালেসের নতুন জাহাজ এসে এখানে নোঙর করেছে। দামিলা থেকে লোক আসছে তো আসছেই। শুনে এলোম–রাজা গঞ্জালেস আর রানি নাকি জাহাজ দেখতে আসবেন।
ফ্রান্সিস হাত মুখ ধুয়ে ডেক-এ উঠে এলো। দেখল একটা ঝকঝকে নতুন জাহাজ ওদের জাহাজের কাছেই দাঁড়িয়ে আছে। জাহাজটায় কামান আছে। ও এবার নিজেদের জাহাজটার দিকে তাকাল। কী বিশ্রী। জাহাজের রং বিবর্ণ। খোলটার কত জায়গায় যে রং চটে গেছে। পালগুলোয় কালো কালো ছোটো তালি মারা। ফ্রান্সিস পরেক্ষণেই ভাবলো–হোক হতচ্ছাড়া চেহারা। কত সুখদুঃখের স্মৃতি এই জাহাজের সঙ্গে জড়িত। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে গিয়ে মাস্তুলটা জড়িয়ে ধরল।
সকালের খাবার খাচ্ছে তখনই শোনা গেল লোকজনের উচ্চকণ্ঠে বলা কথা রাজা রাণি আসছেন–রাজারাণি আসছেন।
ভাইকিংরা ডেক-এ উঠে এলো। ফ্রান্সিস মারিয়াও এলো। হ্যারি এগিয়ে এলো। বলল–ফ্রান্সিস–যুদ্ধঅবধারিত। কয়েকদিন পরেও হতে পারে আবার আজকালের মধ্যেও শুরু হতে পারে। তার আগেই আমরা জাহাজ চালিয়ে চলে যাবো। ফ্রান্সিস বলল।
দুই ঘোড়ায় টানা রাজার গাড়ি এসে দাঁড়াল। রাজা গঞ্জালেস ও রানি গাড়ি থেকে নামলেন। রাজা হাসিমুখে তাকিয়ে রইলেন নতুন জাহাজটার দিকে। রানিও জাহাজটা দেখে মুগ্ধ। মন্ত্রী ও সেনাপতি রাজার কাছে এলেন। মাননীয় রাজা–সেনাপতি বলল জাহাজটায় উঠে ভালো করে দেখুন।
কাঠের পাটাতন ফেলাই ছিল। রাজা বেশ সাবধানে পাটাতন পার হয়ে জাহাজে উঠলেন। রানি আর মন্ত্রী ঐ পাটাতনে পা ফেলে যেতে পারবে না এটা বোঝাই গেল। দুজনে তীরে রইলেন।
