ফ্রান্সিস দেখল কিছু দূরে একটা ওক গাছ। বলল–ভুলে কুড়ুলটা আনা হয়নি। তলোয়ারের কোপ দিয়ে ডালটা কাটাতে হবে। চলো।
ওক গাছটা থেকে একটা লম্বা ডাল বেছে নিল। তিনজনে গাছে বেয়ে বেয়ে উঠল। ডালটার কাছে এলো৷ তলোয়ারের ঘা মারতে লাগল ডালটার গোড়ায়। খুব মোটা ডাল নয়। তিনটি তলোয়ারের পরপর কয়েকটা কোপে কেটে গেল।নীচে ঝোপঝাড়ে পড়ল।
তিনজনে নেমে এলো। গুহার মুখের কাছে এলো। চমকি ঠুকেবিস্কো মশালটায় আগুন লাগাল। ফ্রান্সিস মশালটা হাতে নিয়ে বলল–চলো।
গুহার মুখে ফ্রান্সিস প্রায় শুয়ে পড়ল। তারপর গুহাটায় ঢুকে গেল। একটু যেতেই দেখল গুহাটা বেশ বড়ো। ফ্রান্সিস মশালের আলোয় চারপাশ দেখতে লাগল। এবড়ো খেবড়ো পাথরের গা। ফ্রান্সিস কাটা ডালটা টেনে নিল।
ততক্ষণে বিস্কো শাঙ্কো ঢুকে পড়েছে। এতক্ষণে দুর্গন্ধে তিনজনেরই গা গুলিয়ে উঠল।
হঠাৎ ওরা দেখল পাথুরে গায়ে একটা বড়ো ফাটলের মতো। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে নররাক্ষস। ফ্রান্সিস চিৎকার করে উঠল–সাবধান। গুহার পাথরে পাথরে কথাটা প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।নররাক্ষসকে প্রথম দেখেছিল ফ্রান্সিসই। এবার শাঙ্কো দেখল। ফ্রান্সিস আগেই তলোয়ার কোমরের ফেট্টি থেকে খুলে বের করেছে। শাঙ্কো আরবিস্কোও এবার তলোয়ার খুলল।
নররাক্ষস হো হো করে হেসে উঠল। গুহাটায় সেই হাসি প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
নররাক্ষস গুহার গায়ের একটা বড়ো ফাটল দিয়ে ছোটো গুহায় ঢুকে গেল। ফ্রান্সিস বলল–ঐ ছোটো গুহাটায় নররাক্ষস ঢুকে পড়ে বলেই কেউ ওকে সামনাসামনি লড়াইয়ে নামতে পারে না। ঐ গুহাটায় ঢুকতে গিয়েই বোধহয় এর আগে যারা নররাক্ষসকে হত্যা করতে এসেছিল তারা নিজেরাই মারা পড়েছে। ঐ গুহায় আমরা এখন ঢুকবো না।
ফ্রান্সিস গাছের লম্বা ডালটা টেনে নিল। ফ্রান্সিস বলল–হাত লাগাও। তিনজনে মিলে লম্বা ডালটা ছোটো গুহাটায় ঢোকাল। তারপর ডালটা ঘোরাতে লাগল। এই ডালটা তলোয়ার বা বর্শা নয়। অনেকদূর গেল ডালটা। ডালের খোঁচা দিয়ে উত্যক্ত করতে লাগল নররাক্ষসকে। নররাক্ষস তার লুকিয়ে আক্রমণ করতে পারল না। গুহা। থেকে কুঠারহাতে বেরিয়ে এলো। কুঠারটা বেশ বড়ো। অত্যন্ত ধারালো মুখটায় মশালের আলো পড়ে চক্ করছে।
নররাক্ষস কুঠার হাতে ফ্রান্সিদের সামনে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বিস্কো সরে যেতে গিয়েও পারল না। কুঠারের মুখটা বিস্কোর কঁধ ছুঁয়ে গেল। অনেকটা কেটে গেল। রক্ত পড়তে লাগল।
ফ্রান্সিস চিৎকার করে বলল–বিস্কো পেছনে সরে যাও। বিস্কো পেছনে সরে গেল। এবার ফ্রান্সিস তলোয়ার চালাতে লাগল। শাঙ্কোও তলোয়ার উঁচিয়ে আঘাত করার সুযোগ খুঁজতে লাগল।
ওদিকে ফ্রান্সিস তলোয়ার চালিয়ে কুঠারের সঙ্গে লড়তে লাগল। অত্যন্ত শক্তিধর নররাক্ষস অনায়াসে ঐ ভারি কুঠারটা ঘোরাতে লাগল।ফ্রান্সিস বুঝতে পারল বেশিক্ষণ লড়াই চালাতে পারবে না।
ফ্রান্সিস হঠাৎ লাফ দিয়ে নররাক্ষসের সামনে গিয়ে পড়ল। আর সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু করে বসে পড়ল। নররাক্ষস কুঠার চালাল। কিন্তু কুঠার ঘুরে গেল ফ্রান্সিসের মাথার ওপর দিয়ে। এই সুযোগটাই পেতে চাইছিল ফ্রান্সিস। ও সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে তলোয়ারের কোপ বসাল নররাক্ষসের ডান কাঁধে। তলোয়ারটা গেঁথে গেল যেন। রক্ত ছুটল। নররাক্ষস কুঠার চালানো থামল। ফ্রান্সিসদের মনে পড়ল নররাক্ষসের দুটো আঙ্গুলও কেটে দিয়েছিল। ও বুঝতে পারছিল নররাক্ষস কুঠারটা খুব শক্ত করে ধরতে পারছে না। শরীরে জোরটাও কমে এসেছে।
নররাক্ষসের গা রক্তাক্ত হয়ে গেল। ওদিকে শাঙ্কো তখন সুযোগ খুঁজছে। পেয়েও গেল সুযোগ। নররাক্ষস তখন কুঠার মাথার ওপর তুলে ধরেছে। শাঙ্কো বিদ্যুৎগতিতে দুপা এগিয়ে তলোয়ারের কোপ বসাল নারাক্ষসের পায়ে। পা কেটে রক্ত বেরিয়ে এলো।নররাক্ষস হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।ফ্রান্সির সঙ্গে সঙ্গে নররাক্ষসের মাথায় সজোরে তলোয়ারের কোপ বসাল। মাত্রা কেটে গেল। রক্ত বেরোলো। রক্তধারা নররাক্ষসের চোখে মুখে নেমে এলো।
নররাক্ষস চিৎকার করে উঠল। ঐ প্রচন্ড চিৎকারে গুহাটা যেন কেঁপে উঠল। এক মুহূর্ত বিস্কো ভাবল। তারপর ছুটে এসে নররাক্ষসের বুকে তলোয়ার প্রচন্ড জোরে ঢুকিয়ে দিল। তলোয়ারটা আর বের করল না। তলোয়ারটা বুকে বিঁধে রইল। নররাক্ষস গুহার মেঝেয় পড়ে গেল। এপাশ-ওপাশ গড়াতে লাগল। মুখ হাঁ করে শ্বাস নিতে লাগল।
ফ্রন্সিস ও শাঙ্কো দাঁড়িয়ে পড়ল। দুজনেই ভীষণ হাঁপাতে লাগল।
নররাক্ষস গোঙাতে লাগল।নররাক্ষস মাথাটা এপাশ-ওপাশ করতে লাগল। তারপর স্থির হয়ে গেল। নররাক্ষস মারা গেল।
ফ্রান্সিস একটা পাথরের চাঙের ওপর বসল। বিস্কো পাশে বসল। ফ্রান্সিস বিস্কোর কাটা জায়গাটা দেখল।তখনও রক্ত পড়ছে। ফ্রান্সিস কোমরের কাপড়ের ফেট্টিটা খুলল। লম্বা করে এক ফালি ছিঁড়ল। বিস্কোর আঘাতের জায়গটা ভালো করে বেঁধে দিল। ব্যথাটা কমল বিস্কোর।
শাঙ্কো তখন নররাক্ষসের গুহাটা দেখছিল। ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে বলল–এই গুহাটায় একজন ঢুকতে পারবে?
ফ্রান্সিস বলল–ঐ গুহতেই রয়েছে রাজা গঞ্জালেসের পৈতৃক ধনভান্ডার। ওসব বের করে আনতে হবে। কিন্তু মশাল নিয়ে ঢোকা যাবে না।
ফ্রান্সিস তলোয়ারটা বিস্কোর হাতে দিল। ছোটো গুহার কাছে গেল। মাথা ঢুকিয়ে শুয়ে পড়ল। তারপর আস্তে আস্তে ভেতরে ঢুকতে লাগল। কিন্তু অন্ধকারে কিছুই দেখতে পাচ্ছেনা। অন্ধকারে আরো ঢুকল। অন্ধকারে হাতে কী যেন ঠেকল। আরো ঢুকে জিনিসটা হাত দিয়ে দেখে বুঝল একটা বাক্স। লম্বাটে।
