দ্রুতপায়ে পাতা পাটতনে নেমে জোরে হেঁটে বালিয়াড়িতে নেমে এলো। উঁচু পাড়ে উঠে চলল কয়েদঘরের দিকে।
তখন রাত হয়ে গেছে। কয়েদঘরের লোহার দরজার দুপাশে টানা পাথরের বারান্দায় মশাল জ্বলছে। ফ্রান্সিস কয়েদঘরের পেছনে এলো। কী করে হ্যারিদের জানাবে যে সে মুক্ত আর মারিয়াও অনেকটা সুস্থ।
জায়গাটা একটা মাঠের মতো। তারপরেই টানা খাদ। চাঁদের আলো খুব উজ্জ্বল নয়। সেই আলোতেই দেখা যাচ্ছে খাদটা আর ওপাশের টিলাটা। ঐ টিলাতেই একটা গুহায় নাকি থাকে একা নররাক্ষস। ধনভান্ডার পাহারা দেয়। ওখানে যাবে বলেই ফ্রান্সিস তলোয়ার নিয়ে এসেছে। সেই নররাক্ষস কেমন শক্তিশালী সেটা একটু দেখতে হয়। আর হ্যাঁ এই রাতেই।
খোলা জায়গাটায় ফ্রান্সিস পায়চারি করতে লাগল। কীভাবে বন্দি বন্ধুদের কাছে। খবর পৌঁছানো যায়।
চাঁদের আলোয় দেখলে মাঠমতো জায়গাটায় নুড়ির ছোটো ছোটো নুড়ি পাথর ছড়ানো। একটা উপায় মনে এলো। ও নিচু হয়ে কয়েকটা নুড়ি তুলে নিল। তারপর কয়েদঘরের উঁচু জানালার ফোকরটা দেখল। নিশানা করে একটা নুড়ি ছুঁড়ল। নুড়িটা এক বন্ধুর পিঠে লাগল। ও জানালার ফোকরের দিকে তাকাল। কিন্তু ওখান থেকে নুড়ি খসে আসবে কী করে। ও কিছু বলল না। এবার আর একটা নুড়ি এক বন্ধুর মাথায় লাগল। বন্ধুটি চেঁচিয়ে উঠল-নুড়ি ছুঁড়ছে কে? আগের বন্ধুটিও বলল আমরাও পিঠে পড়েছে একটা। বন্ধুদের মধ্যে কথাটা শুরু হল।
ফ্রান্সিস আর একটা নুড়ি ছুঁড়ল। এবার লাগল হ্যারির কাঁধে। হ্যারি চিৎকার করে বলল–ভাইসব–ফ্রান্সিস ছুঁড়ছে এই নুড়িগুলো। ফ্রান্সিস মুক্ত। সবাই ধবনি তুলল– ও-হো-হো। ফ্রান্সিস হাসল–যাক বন্ধুরা বুঝতে পেরেছে যে ও মুক্ত।
হ্যারিশাঙ্কোকে বলল–ঐ জানালার দিকে মুখ বার করে বলল-রাজকুমারী কেমন আছেন? শাঙ্কো মুখের কাছে দুহাতের চেটো গোল করে ওদের দেশীয় ভাষায় বলল রাজকুমারী কেমন আছেন? ফ্রান্সিস বাইরে থেকে গলা চড়িয়ে বলল–ভালো। ভাইকিং বন্ধুরা নিশ্চিন্ত হল।
ফ্রান্সিসের উচ্চস্বরে বলা কথাটা শুনে কয়েদঘরের সামনে থেকে একজন কারারক্ষী ছুটে এলো।ফ্রান্সিস ততক্ষণে খাদের ধারে একটা গাছের গোড়া ধরে খাদে ঝুলে পড়েছে। কারারক্ষীটি এসে এদিক-ওদিক বার কয়েক তাকাল কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না। ওর মনে হল ভুল শুনেছে। ও চলে গেল।
ফ্রান্সিস গাছের গোড়া ধরে উঠে এলো। দেখল খাদ যেখানে শুরু হয়েছে সেখানে জংলা গাছপালা। ও ঐদিকেই চলল। জংলা গাছপালার কাছে এলো। গাছপালার মধ্যে দিয়ে খাদের ঢালটার কাছে এলো। ও ঢাল বেয়ে নামতে লাগল। ডানপাশে একটু দূরেই টিলাটা উঠে গেছে। টানা খাদের মধ্যে ছোটো ছোটো গাছ জংলা ঝোপ।
ঝোপ জঙ্গল ঠেলে ফ্রান্সিস চলল। চাঁদের আলোয় টিলার এবড়ো-খেবড়ো গা দেখতে দেখতে চলল।কয়েকটা ফাটল দেখল। দুটো বড়ো গুহার মুখ দেখল।কিন্তু রক্ষী বলেছিল ছোটো গুহার মধ্যে নররাক্ষস থাকে। হঠাৎ একটা ছোটো গুহা দেখল। হামাগুড়ি দিয়ে ঢোকা যায় এমন।
ফ্রান্সিস কোমর থেকেতলোয়ার খুলল। তলোয়ার খুলে গুহাটার দিকে যাচ্ছে তখনই পেছনে শুকনো পাতা ভাঙার শব্দ কানে এলো। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে তলোয়ার উঁচিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। দেখল একটা মানুষের মতো কিছু ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত। চাঁদের আলোয় এক ঝলক দেখল–বড়ো বড়ো ধূসর রঙের চুল মাথায়। দাড়ি গোঁফে মুখ ঢাকা পড়ে গেছে। সারা শরীরে বড়ো বড়ো কালো লোম। চোখ দুটো বড়ো বড়ো। তাতে হিংস্রতা। বড়ো বড়ো দাঁত। বোধহয় হাসছে। ফ্রান্সিসের চিন্তায় খেলে গেল নররাক্ষস! ফ্রান্সিস কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই নররাক্ষসের গলা লক্ষ্য করে তলোয়ার চালাল। কিন্তু নররাক্ষস দ্রুত ঘুরে যাওয়ায় তলোয়ারের ঘা লাগল না। নররাক্ষস মুখে শব্দ করল–ওঁ।নররাক্ষস সঙ্গে সঙ্গে তলোয়ারের ফলাটা দুহাতে চেপে ধরল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে হ্যাঁচকা টান মারল। তলোয়ার খুলে এলো। নিম্মই নররাক্ষসের আঙ্গুল কাটা পড়েছে। নররাক্ষস হাত দুটো চোখের সামনে আনল। ফ্রান্সিস দেখল দুটো আঙুল কাটা পড়েছে। নররাক্ষস গোঙাতে গোঙাতে ঝোপ জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ছুটল। ফ্রান্সিস তলোয়ারটা মাটিতে বসিয়ে হাঁপাতে লাগল। সতর্ক দৃষ্টিতে চারদিকে তাকাতে লাগল। . যদি নররাক্ষস ফিরে আসে। বেশ কিছুক্ষণ কাটল। নররাক্ষস আর ফিরে এলো না।
ফ্রান্সিস বুঝল সামনের ছোটো গুহাটিতেই নররাক্ষস থাকে। আহত নররাক্ষসটা বোধহয় গুহায় ঢোকেনি। অন্যদিকে চলে গেছে।
ফ্রান্সিস আর দাঁড়াল না। একটা গাছের গুঁড়ি কান্ড বেয়ে গাছের মাথায় উঠল। ওথন থেকে ডাল ধরে ঝুঁকে খাদের ওপাশের মাটিতে নেমে এলো। তলোয়ার কোমরে গুঁজল। চলল সমুদ্রতীরের দিকে।
সমুদ্রতীরে এসে চিন্তা হল জাহাজে ওঠা নিয়ে। আবার জলে নেমে ভিজে জাহাজে উঠতে ইচ্ছে হল না। একটা কাজ তো ওকেই করতেই হবে–সেটা হল রাজা গঞ্জালেসের সঙ্গে দেখা করে নররাক্ষসকে মেরে ধনসম্পদ উদ্ধার করবার কথা বলতে হবে। বিনিময়ে বন্ধুদের মুক্তি।
কাজেই এই দুই কারারক্ষীকে এখন তাড়াতে হবে।
ফ্রান্সিস সোজা বালিয়াড়ি পার হয়ে পাতা পাটাতনের কাছে এলো। দুই কারারক্ষী ফ্রান্সিসকে দেখেই চিনল। দুজন লাফিয়ে উঠল। কোমর থেকে তলোয়ার খুলল। ভাইকিংদের দলনেতাকে পাওয়া গেছে। একে বন্দি করতে পারলে সেনাপতি ওদের পিঠ চাপড়াবে।
