রক্ষীটি চলে গেল।
ফ্রান্সিস পাটাতনের নীচের থেকে বেরিয়ে এলো। ও সবই শুনেছে। বলল–ভেন মারিয়া তোমার কী বলো? ধরা দেব?
-দেখো ফ্রান্সিস-মারিয়া বলল–একটা সুযোগ পাওয়া গেছে। কয়েক দিনের মধ্যেই যুদ্ধ শুরু হবে রানি উরাকা আর গঞ্জালেসের মধ্যে। রাজা গঞ্জালেস চাইবে ওর পৈতৃক ধনসম্পদ যাতে ওর কাছেই থাকে। সেইজন্যে পাহারাদার নররাক্ষসের হাত থেকে ঐ ধনসম্পদ উদ্ধার করতে চাইবে। কিন্তু বোঝা যাচ্ছে এই কাজটা কেউই পারবে না। তুমি সেই কাজটা করে দেবে বলো তাহলে রাজা গঞ্জালেস সহজেই রাজি হবে। কারণ যুদ্ধের ফলাফল কী হবে তা কেউ আগে থেকে বলতে পারে না। গঞ্জালেসের কারারক্ষী যা বলে গেল তাতে পরিষ্কার রাজা গঞ্জালেস যুদ্ধে হেরে যাবে। হেরে গেলে নিজের রাজত্ব যাবে পৈতৃক ধনভান্ডার হারাতে হবে। কজেই যুদ্ধের আগেই গঞ্জালেস পৈতৃক ধনভান্ডার উদ্ধার করে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দিতে চাইবে। মারিয়া বলল।
–ঠিকই বলছো। ফ্রান্সিস বলল।
–রাজা গঞ্জালেস এখন পৈতৃক ধনভান্ডার উদ্ধার করতে চাইবে। তুমি রাজা গঞ্জালেসকে গিয়ে বলো যে তুমি নররাক্ষসকে কজা থেকে ধনভান্ডার উদ্ধার করে দিতে পারবে। মারিয়া বলল।
–হু–এই কাজটা করা খুবই কঠিন। ফ্রান্সিস বলল।
–অবশ্যই এই কাজে রাজি হওয়ার ঝুঁকি আছে। না পারলে কিন্তু আমাদের বিপদ বাড়বে। মারিয়া বলল।
–হ্যাঁ ঠিকই বলেছো। তারপর ফ্রান্সিস বলল–আমি একটু ঘুমিয়ে নিই। নইলে শরীরে জোর পাবো না।
ফ্রান্সিস হ্যারির ঘরে চলে গেল। বিছানা পাতাই ছিল। ফ্রান্সিস শুয়ে পড়ল। বন্ধুদের কথা ভাবতে লাগল। কী করে সবাইকে মুক্ত করা যায়। মারিয়ার অসুখটা সেরে গেছে। দেখে ফ্রান্সিস অনেকটা নিশ্চিত হল। এসব ভাবতে ভাবতে ফ্রান্সিস ঘুমিয়ে পড়ল।
তখন বিকেল। ফ্রান্সিসের ঘুম ভেঙে গেল। ও মারিয়ার কাছে এলো। দেখল মারিয়া ঘুমোচ্ছে। ভেন মেঝেয় আসনসিঁড়ি হয়ে বসে আছে।
ফ্রান্সিস ডাকল–ভেন মারিয়াকে ওষুধ দিয়েছে।
–হু
–ওর শরীর কেমন দেখলে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–জ্বর একবারে ছেড়ে গেছে। রাজকুমারী এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। ভেন বলল।
–বাঁচালে। ফ্রান্সিস হেসে বলল। ফ্রান্সিসদের কথাবার্তায় মারিয়ার ঘুম ভেঙে গেল। ও আস্তে আস্তে উঠে বসল। বলল–ফ্রান্সিস–সূর্যাস্ত হয়ে গেছে?
–না। কিছুক্ষণ দেরি আছে। ফ্রান্সিস বলল।
–ভেন ফ্রান্সিস তো যেতে পারবে না। তুমি আমাকে ডেক-এ নিয়ে চলো। সূর্যাস্ত দেখবো। মারিয়া বলল।
ভেন উঠে দাঁড়াল–চলুন। তবে খুব সাবধানে হাঁটতে হবে। আমি বুড়ো মানুষ। আপনাকে শক্ত করে ধরে থাকতে পারবো না।
–ঠিক আছে। আমি শরীরে কিছু জোর পাচ্ছি। চলো। মারিয়া বলল।
মারিয়া উঠে বসল। তারপর বিছানা থেকে আস্তে আস্তে নেমে এলো।ফ্রান্সিস বলল– মারিয়া তোমার কষ্ট হবে। যেও না।
-না-না একনাগাড়ে বিছানায় শুয়ে থাকতে কারো ইচ্ছে করে? আমার জন্যে ভেবো না। মারিয়া বলল।
ভেন মারিয়ার হাত ধরল। দুজন আস্তে আস্তে দরজার দিকে চলল। ফ্রান্সিস বিছানায় বসে রইল।
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে মারিয়া দু একবার সিঁড়ির ধাপ ভুল করল। ভেন কাঁধ ধরে মারিয়াকে ঠিক রাখল।
দুজনে যখন ডেক-এ উঠে এলো তখন সূর্য অস্ত যায়নি। দুজনে ডেক-এ উঠে রেলিঙের দিকে এগোতে লাগল। রক্ষীরা জাহাজের সামনের দিকে পাহারা দিচ্ছিল। ওরা মারিয়া আর ভেনকে দেখল। কিছু বলল না।
পশ্চিম আকাশটা তখন গোলাপি। সূর্যের রঙ গাঢ় গোলাপি। আস্তে আস্তে গোল সূর্য নীচে নামতে লাগল। পশ্চিম আকাশে তখন গোলাপি রঙের প্লাবন। জলের ঢেউগুলোও গোলাপি রঙীন।
আস্তে আস্তে সূর্য টুপ করে যেন সমুদ্রের জলে ডুবে গেল। পশ্চিম আকাশে অনেকক্ষণ লেগে রইল গোলাপি রং। তারপর আস্তে আস্তে আকাশ কালো হয়ে গেল। রুপোলি চঁদ দেখা গেল।
মারিয়া আর ভেন আস্তে আস্তে নীচে কেবিনঘরে নেমে এলো। মারিয়া তখন একটু হাঁপাচ্ছে। ফ্রান্সিস বলল–শুয়ে পড়ো। মারিয়া বিছানায় বসল। তারপর শুয়ে পড়ল। বোঝা গেল শরীরের দুর্বলতাটা আছে এখনও।
ফ্রান্সিস পোশাক পরে তৈরি হল। বলল–ভেন-একটা উপায় বের করো তো। এভাবে জলে নেমে ডুবসাঁতার দিয়ে যেতে হবে–এ তো পারা যায় না। ভেন বলল দাঁড়াও। আগে খেয়ে নাও। দুজনে খাবার ঘরে এলো। বিকেলের খাওয়া সেরে নিল।
দুজনে মারিয়ার কাছে এলো। মারিয়া অভিমানের সুরে বলল–ভেন আমার খিদে পেয়েছে।
–ঠিক আছে। আপনার খাবার তৈরি করছি। ভেন বলল। তারপর ফ্রান্সিসকে বলল তুমি কাঠের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকো। আমি একটা মতলব ঠাউরেছি।
ভেন চলে গেল। একটু পরে সিঁড়িতে ভারি জুতোর শব্দ উঠল।কারারক্ষীরা আসছে। ফ্রান্সিস কাঠের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রইল।
ভেন রক্ষীদের খাবার ঘরে নিয়ে গেল। তারপর নিজেদের ভাষায় গলা চড়িয়ে বলল–পলায়ন। ফ্রান্সিস আর মারিয়ার পরস্পরের দিকে তাকিয়ে হাসল। বোঝাই যাচ্ছে ভেন রক্ষী দুজনকে নেমন্তন্ন করে খাওয়াচ্ছে। খাবার ঘর থেকে ভেন-এর জোর গলার শব্দ ভেসে আসছে–কী কান্ড! মাত্র এইটুকু খেলেন। খান–খান তৃপ্তি করে খান। আমার রান্নার হাত খুব খারাপ না।
ফ্রান্সিস এবার হেসে ফেলল। মারিয়াও হাসছে। ফ্রান্সিস আর মারিয়া দেরি করল না। পাটাতনের নীচে থেকে তলোয়ারটা বের করে কোমরে ঝোলাল। কেবিন ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। সিঁড়িতে কোনোরকম শব্দ না করে আস্তে আস্তে উঠতে লাগল। ডেক-এ উঠে এলো।
