ফ্রান্সিস খাদের মধ্য দিয়ে গাছ ঝোঁপের আড়ালে আড়ালে বেশ দূরে চলে এলো। দেখল সামনেই সমুদ্র। ওদের জাহাজটা তীরের কাছেই ভাসছে। ফ্রান্সিস প্রথমেই জাহাজে উঠল না। একটা পাথরের আড়ালে বসল। প্রান্তরের দিকটা দেখতে লাগল।
একটু পরেই দেখল–প্রান্তর দিয়ে লাল ধুলো উড়িয়ে ঘোড়ায় চড়ে কে আসছে। একটুক্ষণ তাকিয়ে দেখতেই চিনল–সেনাপতি ঘোড়ায় চড়ে আসছে। তাহলে ফ্রান্সিস যে পালিয়েছে এই খবর সেনাপতি পেয়েছে।
সেনাপতি ঘোড়া থেকে নামল। কাঠের পাটাতনের ওপর দিয়ে গিয়ে জাহাজে উঠল।
ওদিকে দুজন কারারক্ষী প্রান্তর দিয়ে ছুটে আসছে দেখা গেল। ওরা জাহাজের পাটাতনের কাছে দাঁড়িয়ে ভীষণ হাঁপাতে লাগল।
কিছুক্ষণ পরে সেনাপতি জাহাজ থেকে নেমে এলো। রক্ষী দুজনকে বলল–ওদের সর্দার এখানে আসেনি। ওরা মাত্র দুজন জাহাজে রয়েছে। তোরা এখানে পাহারায় থাক। ওদের সর্দার এলেই পাকড়াবি।
সেনাপতি ঘোড়ায় উঠে ঘোড়া চালিয়ে চলে গেল।
পাতা পাটাতন দিয়ে দুই কারারক্ষী জাহাজে উঠল। ডেক-এ ঘুরে ঘুরে পাহারা দিতে লাগল।
ফ্রান্সিস পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো। কারারক্ষী দুজনের নজর এড়িয়ে সমুদ্রের ধারে এলো। তারপর কোনোরকম শব্দ না করে জলে নামল। এক ডুব সাঁতারে অনেক দূরে গিয়ে নিঃশব্দে ভেসে উঠল।মুখ হাঁ করে শ্বাস নিয়ে আবার ডুব দিল। উঠল জাহাজের গা ঘেঁষে। মুক্তোর সমুদ্র থেকে মুক্তো তোলার সময় ফ্রান্সিস ওদের দেশের মুক্তো শিকারীদের কাছ থেকে বেশিক্ষণ জলে ডুবে থাকার নিয়মটা শিখে নিয়েছিল। সেটা কাজে লাগল।
জাহাজে হালের খাঁজে খাঁজে পা রেখে রেখে ও জাহাজে উঠে এলো। সিঁড়িঘরেবর আড়াল থেকে দেখল কারারক্ষী দুজন জাহাজের সামনের দিকে পাহারা দিচ্ছে।
ফ্রান্সিস সিঁড়ি ঘরের আড়ালে আড়ালে সিঁড়িঘরের মুখের কাছে এলো। তারপর অপেক্ষা করতে লাগল। দুই কারারক্ষী মাস্তুলের আড়ালে পড়ে গেল। ফ্রান্সিস সেই সুযোগে সিঁড়িঘরে ঢুকে সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নীচে নেমে এলো।
নিজেদের কেবিনঘরে ঢুকল। দেখল– ভেন চোখ বুজে আসনপিঁড়ি হয়ে মেঝেয় বসে আছে। বিছানায় মারিয়া শুয়ে আছে। ফ্রান্সিস আস্তে ভেন-এর কাছে গেল। ফিসফিস্ করে বলল ভেন, রাজকুমারী কেমন আছেন? ভেন চমকে উঠে বলল- কে? কে? ফ্রান্সিস ভেন-এর মুখ চেপে ধরল। বলল–ভেন কোনো শব্দ করবেনা। আমি ফ্রান্সিস। ভেন বলল–ও–তাই বলো। রাজকুমারী এখন অনেকটা সুস্থ। বোধহয় ঘুমুচ্ছেন।
ফ্রান্সিস বলল–আমি জলে ভেজা পোশাক পাচ্ছি। ফ্রান্সিসের গলারশব্দ মারিয়ার কানে গেল। মারিয়া চোখ মেলে তাকাল। ফ্রান্সিসের আর পোশাক ছাড়া হল না। ও মারিয়ার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বলল–মারিয়া–এখন কেমন আছো? মারিয়া শুকনো মুখে হেসে বলল অনেকটা ভালো। ভেন তো এখন আমাকে পাতলা সুজির ঝোল খেতে দেবে বলছে। ফ্রান্সিস হাসল–তবে তো বেশ ভালো আছো তুমি। মারিয়ার দুর্বল কণ্ঠস্বর শুনেই ফ্রান্সিস বুঝল মারিয়া এখনও দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
ফ্রান্সিস একটা শুকনো জামা বের করে ভেজা জামাটা ছাড়ল। তখনই মারিয়া দেখল ফ্রান্সিসের সারা শরীরে কাটাছড়ার দাগ। দু তিনটে বড়ো ক্ষত থেকে তখনও চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত পড়ছে। মারিয়া দুর্বল স্বরে বলে উঠল–তোমার সারা শরীরে এত কাটাছড়া কেন? ফ্রান্সিস হেসে ওর গাছের মাথায় ঝাঁপ দিয়ে পালাবার ঘটনাটা বলল। তারপর ভেনকে বলল–ভেন তোমার ওষুধপত্র আছে?
–আমি নিয়ে আসছি।
একটু পরেই ভেন ফিরে এলো। হাতে একটা বোয়াম। কাঠের কুঁজো থেকে জল নিয়ে হাতে অল্প একটু ঢালল। বোয়াম থেকে নীল রঙের গুঁড়ো নিল। জলে মেশাল। একটা আটা আটা জিনিস তৈরি হল। ভেন ফ্রান্সিসের কাটাছড়া জায়গায় আস্তে আস্তে লাগিয়ে দিল। ওষুধ লাগাতেই ফ্রান্সিস লাফিয়ে উঠল। বলল–
–ভেন ভীষণ জ্বালা করছে।
একটু পরেই আর জ্বালা যন্ত্রণা থাকবে না। সত্যিই তাই। অল্পক্ষণের মধ্যেই জায়গাগুলো ঠান্ডা লাগল।
ফ্রান্সিস শুকনো পোশাক পরল। বলল–ভেন–সেনাপতি এসেছিল। কী বলল সে?
কী আর বলবে? এসে দেখে বুড়ো আর একটি মেয়ে। বলল–তোমাদের দলনেতা এখানে এসেছিল? আমি বললাম–এখানে কেউ আসেনি। বিশ্বাস করল না তবে আর কিছু বলল না। চলে গেল।
–হুঁ–আমার খোঁজ ঠিক চালিয়ে যাবে। ফ্রান্সিস বলল।
মারিয়া দুর্বল কণ্ঠে বলল এখন কী করবে?
–আমি বাইরেই থাকব। তুমি সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত কিছু ভাবতে পারছি না। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস এসে বিছানায় বসল। মারিয়ার মাথায় কপালে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। মারিয়া চোখ বুজে শুয়ে রইল।
ভেন উঠে দাঁড়াল। বলল–বেলা হয়েছে। এখন খেয়ে নাও।
ভেন একটু পরে বাটি নিয়ে ঢুকল। মারিয়ার কাছে এসে বললনাও চুমুক দিয়ে খেয়ে নাও। মারিয়াকে ফ্রান্সিস ধরে ধরে বসিয়ে দিল। মারিয়া আস্তে আস্তে চুমুক দিয়ে খেয়ে নিল। ভেন কাঠের গ্লাসে জল ভরে এগিয়ে ধরল। মারিয়া জল খেল। হেসে বলল–ভেন–তুমি এত ভালো তৈরি করেছো। ভেন ফোকলা দাঁতে হাসল। বলল –জাহাজে কী বা থাকে যে ভালো রাঁধবো। সেই তো এক মাংসের ঝোল।
মারিয়া শুয়ে পড়ল। এবার ভেন আর ফ্রান্সিস চলল খাবার ঘরে বসে খেতে খেতে খেতে ফ্রান্সিস বলল–ভেন-মারিয়ার জ্বর তো সম্পূর্ণ সারেনি।
