ভেন বিছানা থেকে নেমে এলো। পুঁটুলি থেকে একটা গাছের শেকড় বের করল। শেকড়টা মারিয়ার নাকের কাছে কয়েকবার ধরল। চোখ মুখ কুঁচকে মারিয়া চোখ মেলে তাকাল। ভেন আস্তে বলল।
–এই খলটা থেকে ওষুধটা চেটে খেয়ে নিন। মারিয়ার মুখের কাছে খলটা এগিয়ে ধরল ভেন। মারিয়া আস্তে আস্তে চেটে চেটে ওষুধটা খেয়ে নিল। তারপর চোখ বুজল।
তখন বাইরে ভোর হয়েছে। নিস্তেজ রোদ ছড়িয়েছে সমুদ্রে ফ্রান্সিসদের জাহাজে। সামুদ্রিক পাখির তীক্ষ্ণ ডাক কানে এলো।
ভেন বলল–ফ্রান্সিস–এখন তো কিছু খেতে হয়।
–আমার ক্ষুধাও পাচ্ছে না তেষ্টাও পাচ্ছে না। ফ্রান্সিস বলল।
–না ফ্রান্সিস-এ সময় তোমাকে সুস্থ থাকতেই হবে। দাঁড়াও–আমি রুটি ভেজে আনছি তুমি রাজকুমারীর কাছে থাকো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ভেন রুটি আলুসেদ্ধ নিয়ে এলো। একটা থালা ফ্রান্সিসকে দিল। অন্যটা নিজে নিল। ফ্রান্সিস থালার দিকে তাকিয়ে বলল– ভেন–মারিয়া এখনও কিছু খায়নি। আমি খাবো না।
ফ্রান্সিস–পাগলামি কোরো না। এই অসুখে তো উপোষ থাকতেই হবে। ভেবো না। আজকের দিনটা দেখি। মনে হয় কালকে সকালের মধ্যেই জ্বরটা ছেড়ে যাবে। তখন রাজকুমারীকে সহজপাচ্য কিছু খেতে দেব। নাও–খাও।
ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে খেতে লাগল। ভেন খেতে খেতে বলল–দুপুরে আর রাতে দুটো ওষুধ পড়বে। রাজকুমারী জ্বরের কষ্ট কমবে। জলটল খেয়ে ভেন বলল –ফ্রান্সিস তোমাকে অনেক ধকল পোহাতে হয়েছে। এখন একটু ঘুমিয়ে নাও।
–অসম্ভব। ঘুম আসবে না। ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক আছে। চুপ করে চোখ বুজে শুয়ে থাকো। দেখবে ঘুম এসেছে। ভেন বলল।
–দেখি। তার আগে মারিয়াকে একবার দেখ। ফ্রান্সিস বলল।
ভেন মারিয়ার হাত দেখল। কপালে গলায় হাত দিয়ে দেখল। বলল–জ্বর অনেক কম। দেখবে রাতের দিকে জ্বর আরো কমে গেছে। রাতে অন্য দুটো ওষুধ খাওয়াতে হবে। তুমি ঘুমোও।
ফ্রান্সিস মারিয়ার পাশে শুয়ে পড়ল। চোখ বুজল। চোখ দুটো কেমন জ্বালাজ্বালা করছে। ভাবতে লাগল–মারিয়া সুস্থ হলে কয়েদঘর থেকে পালানোর ছক কষতে হবে। ও বুঝে উঠতে পারল না–রাজা গঞ্জালেস ওদের নিয়ে কী করতে চায়। এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মারিয়ার সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠা। তারপরে অন্য ভাবনা।
হঠাৎ ফ্রান্সিসের মনে পড়ল সেনাপতি নিজের দায়িত্বে ওদের ছেড়ে দিয়েছিল। এখন রাজাকে সেই কথা বলে সেনাপতিকে দায়মুক্ত করতে হবে।
ফ্রান্সিস উঠে বসল। ভেন বলল- কী হল?
–আমার এখন শুয়ে থাকার উপায় নেই। আমাকে রাজা গঞ্জালেসের কাছে যেতে হবে। আমরা মারিয়াকে নিয়ে বিপদগ্রস্ত। তাই সেনাপতি আমাদের কারারক্ষীদের পাহারায়, জাহাজে আসতে দিয়েছিল। সেনাপতির কোনো দোষ নেই।
বিছানা থেকে নেমে ফ্রান্সিস মারিয়ার কপালে হাত দিল। জ্বরটা কমই মনে হচ্ছে। বলল–আমি যাচ্ছি ভেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসবো। মারিয়াকে কিছু খেতে দেওয়া যায় কিনা দেখো।
ফ্রান্সিস সিঁড়ি দিয়ে ডেক-এ উঠে এলো। দু-জন কারারক্ষী ছুটে এলো। ফ্রান্সিস বলল–পালাচ্ছি না। তোমাদের রাজার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি।
ফ্রান্সিস তীর পর্যন্ত পাতা কাঠের পাটাতন ওপর হেঁটে নামল। পেছনে দুজন। কারারক্ষীও এলো। ওদের তলোয়ার এখন কোষবদ্ধ।
অনেকটা পথ হেঁটে হেঁটে ওরা রাজধানী দামিলায় এসে পৌঁছল। ফ্রান্সিস প্রথমে কয়েদঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল। বন্দি ভাইকিংরা ফ্রান্সিসকে দেখে দরজার কাছে ভিড় জমালো।
–ভাইসব–রাজকুমারী এখন ভালো আছেন। আমি এখন রাজসভায় যাচ্ছি। রাজা গঞ্জালেসকে কয়েকটা কথা বলার আছে। আমি তোমাদের কাছে আবার আসছি। রাজার সঙ্গে কী কথা জানিয়ে যাবো। তারপর জাহাজে ফিরে যাবো।
হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস, রাজকুমারী কেমন আছেন?
–কিছুটা ভালো। তাই তো ভেনকে রেখে আমি এলাম।
ফ্রান্সিস এবার ফিরে দাঁড়িয়ে একজন কারারক্ষীকে বলল–আমাকে রাজা গঞ্জালেসের দরবারে নিয়ে চল।
তিনজনে চলল।কিছুটা যেতেই একটা বিরাট বাড়ি দেখা গেল।কারারক্ষী বলল– ওটাই রাজপ্রাসাদ। উওরদিকের দরজাটা দিয়ে রাজসভায় যেতে হবে।
তিনজনে ঐ দরজা দিয়ে ঢুকল। লম্বাটে বেশ বড়ো পাথর পর। গাশে গোটা কয়েক জানালার মতো। একেবারে শেষের দিকে পাথরের সিংহাসন। সিংহাসনে পাথর কুঁদে ফুল লতা পাতার নকশা। সিংহাসনে একটা লাল গদীমতো পাতা। রাজা গঞ্জালেস বসে আছেন। পরনে সার্টিনের জোব্বামতো। তাতে সোনারুপোর সুতোর কারুকাজ করা। মাথায় আজ অন্যরকম মুকুট। সোনার মুকুটে নানা দামি পাথরের মধ্যে মিনে করা। দুপাশে কয়েকজন বৃদ্ধ বসে আছেন। বোঝা গেল ওঁরা মন্ত্রী ও অমাত্যবর্গ।তাদের পরনেও দামি কাপড়ের জোব্বমতো। তারা পাথরের ছোটো ছোটো আসনে বসে আছেন।
সামনে দাঁড়িয়ে আছে বিচারপ্রার্থীরা।
একটা বিচার চলছিল। রাজা গঞ্জালেস সব শুনে কাছেই বসা অমাত্যের সঙ্গে কী পরামর্শ করলেন। তারপর রায় দিলেন। বাদী বিবাদীরা চলে গেল।
ফ্রান্সিস একটু এগিয়ে সেনাপতির কাছে এলো। মৃদুস্বরে বলল-মহামান্য রাজাকে আমি দু একটা কথা বলতে চাই।
–ঠিক আছে। সেনাপতি বলল।
তখন কোনো বিচার চলছিল না। সেনাপতি নিজের আসন থেকে উঠে রাজাকে মাথা নিচু করে সম্মান জানিয়ে বলল–মাননীয় রাজা–এই ভাইকিং যুবকটিকে কিছু বলতে চায়। কথাটা বলে সেনাপতি ফ্রান্সিসকে দেখাল।
