–তুমি কী চাও বলো তো? কারারক্ষীটি বলল।
–তোমাদের নয়–সেনাপতিকে বলবো। সেনাপতিকে নিয়ে এসো। ফ্রান্সিস বলল।
–এখন ডাকাডাকি করলে সেনাপতি রেগে যাবেন। রক্ষীটি বলল।
–আমি কিছু শুনতে চাইনা। সেনাপতিকে এখানে নিয়ে এসো। কথাটা বলে ফ্রান্সিস আবার পিঠ এগিয়ে লোহার দরজার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আবার প্রচন্ড শব্দ উঠল।
কারারক্ষী দুজন নিজেদের মধ্যে কথা বলল। তারপর একজন রক্ষী বলল–ঠিক আছে। যদি সেনাপতি না আসতে চান আমাদের তখন কিছু করার নেই।
গিয়ে বলবে-বন্দি ভাইকিংদের সঙ্গে যে রাজকুমরী রয়েছেন তিনি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এক্ষুণি তার চিকিৎসার দরকার। সেনাপতি যেন আসে। ফ্রান্সিস বলল।
একজন রক্ষী চলে গেল। কিছুক্ষন পরে ফিরে এলো। সঙ্গে সেনাপতি লোহার দরজার ওপার থেকে ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে বলল কী ব্যাপার?
–আমাদের রাজকুমারী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আমাদের বৈদ্য তাঁর চিকিৎসা করবেন। কিন্ত বৈদ্য প্রয়োজনীয় ওষুধ জাহাজে রেখে এসেছেন। রাজকুমারী আর বৈদ্যকে আমাদের জাহাজে যেতে দিতে হবে। ওখানেই রাজকুমারীর চিকিৎসা হবে।
–আমরা এখানে বৈদ্যকে ডেকে পাঠাচ্ছি। সেনাপতি বলল।
–না–আমাদের বৈদ্যই চিকিৎসা করবেন। ফ্রান্সিস বলল।
–ও। তাহলে তোমরা তিনজন জাহাজে যেতে চাও। সেনাপতি বলল।
–হ্যাঁ। রাজকুমারীর চিকিৎসার জন্য। ফ্রান্সিস বলল।
যদি এই সুযোগে তুমি জাহাজ চালিয়ে পালিয়ে যাও। সেনাপতি বলল।
–আমাদের পাহারা দিক আপনার সৈন্যরা। রাজকুমারী সুস্থ হলেই আমরা এখানে চলে আসবো। ফ্রান্সিস বলল।
সেনাপতি কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে ভাবল। তারপর মুখ তুলে বলল– বেশ। আমি কিন্ত রাজার অনুমতি ছাড়াই তোমাদের যেতে দিচ্ছি। কালকে রাজসভায় এসে সব তোমাকে বলতে হবে। রোগীর অবস্থা বিবেচনা করে আমি সম্মতি দিয়েছি–একথাও বলতে হবে।
–বেশ বলবো। ফ্রান্সিস বলল।
সেনাপতি কারারক্ষীর একজনকে বলল-দরজা খুলে দাও। দরজা খোলা হল। সেনাপতি বলল–তোমরা বেরিয়ে এসো।
ফ্রান্সিস রাজকুমারীর কাছে গেল। ভেনকে বলল–আমরা আমাদের জাহাজে রাজকুমারীকে নিয়ে যাচ্ছি। তুমি আমাদের সঙ্গে যাবে। ভেন বলল–বেশ। তারপর উঠে দাঁড়াল।
ফ্রান্সিস মারিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ বুজে ফেলল। মারিয়াকে কি বাঁচানো যাবে? হ্যারি এতক্ষণ মশাল হাতে দাঁড়িয়ে ছিল। এবার ফ্রান্সিসের কাছে এসে বলল ফ্রান্সিসভেঙে পড়ে না। বিপদের সময় তুমিই তো সাহস দাও। আজ তোমাকে নিজেরই মন শক্ত করতে হবে। ভেবোনা ফ্রান্সিস-রাজকুমারী ঠিক সুস্থ হবেন। তোমরা যাও।
ফ্রান্সিস আর একবার মারিয়ার মুখের দিকে তাকাল। তারপর মারিয়াকে দুহাতে তুলে পেটের কাছে নিয়ে এলো। পাঁজাকোলা করে দরজার কাছে নিয়ে এলো। খোলা দরজা দিয়ে বাইরে এলো। পেছনে ভেন। তিনজন কারারক্ষী খোলা তলোয়ার হাতে ফ্রান্সিস আর ভেন-এর পাশে দাঁড়াল। দুজন ফ্রান্সিসের দুপাশে। একজন ভেন-এর পাশে।
সেনাপতি গলা চড়িয়ে বলল– কোনরকম চালাকি করতে দেখলে তিনটেকেই মেরে ফেলবি।
ভেন সেনাপতিকে বলল–একটা শস্যটানা গাড়ি পেলে ভালো হতো। সেনাপতি বলল–এত রাতে গাড়ি পাওয়া যাবে না। তাহলে কাল সকালে যাও।
কিছু ভেবো না ভেন। আমি মারিয়াকে ঠিক নিয়ে যেতে পারবো। চলো। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিসরা চলল। আজকে জ্যোত্মা কিছুটা উজ্জ্বল। দুপাশে গাছগাছালিতে হাওয়া বয়ে যাওয়ার শব্দ। ফ্রান্সিস আর ভেন চলল।
হঠাৎ মারিয়ার মুখ থেকে গোঙানির শব্দ বেরিয়ে এলো। ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর আস্তে আস্তে মারিয়াকে কাঁধে তুলে নিল। গোঙানি বন্ধ হল।
ওরা চলল। ফ্রান্সিসরা বিস্তীর্ণ প্রান্তরে এসে পড়ল। সমুদ্র কাছেই। মাঝে মাঝেই জোর হাওয়া ছুটে আসতে লাগল সমুদ্রের দিক থেকে। ঘর্মাক্ত ফ্রান্সিস একটু আরাম পেল। ফ্রান্সিসরা সমুদ্রতীরে পৌঁছল। বালিয়াড়িতে নামল। তারপর চলল জাহাজের দিকে ফেলা পাটাতনের ওপর দিয়ে সবাই জাহাজে উঠে এলো।ফ্রান্সিস রক্ষীদের বলল– তোমারা যেখানে খুশি দাঁড়িয়ে বসে পাহারা দিতে পারো। আমরা কেবিনঘরে আছি।
ফ্রান্সিস নিজের কেবিনঘরে ঢুকল। অন্ধকারে সাবধানে ঢুকতে হল। বিছানার কাছে এসে ফ্রান্সিস মারিয়াকে আস্তে আস্তে কাঁধ থেকে নামাল। তারপর বিছানায় শুইয়ে দিল আস্তে আস্তে। ভেন ততক্ষণে নিজের কেবিনে চলে গেছে।
অন্ধকারে ফ্রান্সিস মোটা মোমবাতিটা জ্বালল। মারিয়ার দিকে তাকিয়ে দেখতেই চমকে উঠল। দেখল মারিয়া স্থির দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ফ্রান্সিস ছুটে মারিয়ার কাছে এলো। বলল–মারিয়া–এখন কেমন আছো? মারিয়া কোনো কথা না বলে একই দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ফ্রান্সিস চিৎকার করে ডাকল–ভেন-তাড়াতাড়ি এসো। বিছানায় বসল। মারিয়ার মাথায় হাত বুলোতে লাগল।
ভেন ছুটে এলো। হাতে দুটো বোয়াম। কাপড়ের থলি থেকে বের করল মোটা নুড়ি। মেঝেয় বসল। ফ্রান্সিসকে বলল–কাঠের গ্লাসে জল দাও। তারপর মারিয়ার কাছে গেল। কপালে গলায় হাত রাখল। চোখে দেখল। মৃদুস্বরে বলল–ফ্রান্সিস জ্বর একটু কমেছে।
ভেন মেঝেয় এসে বসল। একটা বোয়াম থেকে কিছু কালো গুঁড়ো বের করল। খলে ঢালল। ফ্রান্সিস কাঠের গ্লাসে জল দিয়ে গেল। ভেন খলটায় কয়েক ফোঁটা জল ঢালল। তারপর নুড়ি দিয়ে ঘষতে লাগল। কিছুক্ষণ ঘষার পর খলটা মারিয়ার কাছে নিয়ে গেল। মৃদুস্বরে বলল-রাজকুমারী–এই খলের ওষুধটা চেটে খেয়ে নিন। মারিয়ার কোনো সাড়াশব্দ নেই।
