ভাইকিংরা সবাই বেশ ক্ষুধার্ত। গঙ্গপ করে সব নিয়ে খেয়ে নিল। অনেকেই দুবার চেয়ে নিয়ে খেল।
মারিয়ার শরীরটা ভালো লাগছিল না। বেশি খেতেও পারল না। ফ্রান্সিস সেটা লক্ষ্য করে বলল কী ব্যাপার? খাচ্ছো না?
–খিদে নেই। রাতে বেশি করে খাবো। মারিয়া বলল।
উঁহু। মনে হচ্ছে তোমার শরীর ভালো নেই। ফ্রান্সিস বলল।
–না না আমার শরীর ভালো আছে। মারিয়া বলল।
ফ্রান্সিস আর কিছু বলল না। খেতে লাগল। বন্দিদের খাওয়া শেষ হল। সবাই জল খেল। ফ্রান্সিস মারিয়ার জন্যে খাবার জল নিয়ে এলো। মারিয়া খেল। মারিয়া আস্তে আস্তে শুয়ে পড়ল।
সন্ধ্যাবেলা মারিয়া বুঝল জ্বর এসেছে। শরীরের গাঁটে গাঁটে ব্যথা। গা মোচড়াচ্ছে যেন।
রাতে মারিয়া কিছুই খেতে পারল না। ফ্রান্সিস তাড়াতাড়ি মারিয়ার কপালে হাত রাখল। বেশ গরম। বলল–তোমার তো জ্বর হয়েছে।
–ও কিছু না। কালকে সকালেই দেখবে জ্বর ছেড়ে গেছে। ফ্রান্সিস কিছু বলল না। মারিয়ার মাথা নিজের কোলে নিয়ে বসে রইল। মারিয়া ঝিম মেরে শুয়ে আছে। মাঝে মাঝে গুঙিয়ে উঠছে। মাথা ওপাশ-এপাশ করছে।
ফ্রান্সিস ডাকল হ্যারি। হ্যারি এগিয়ে এলো। বলল কী ব্যাপার?
–মারিয়ার জ্বর এসেছে। মনে হচ্ছে জ্বর বেড়েছে। তুমি ভেনকে ডাকো। একটু পরেই ভেন এলো। মারিয়ার কপালে হাত দিয়ে দেখল। চোখের নীচে দেখল। বলল– ফ্রান্সিস রাজকুমারীর বেশ জ্বর। মনে হয় রাতে বাড়তে পারে। যাতে জ্বর না বাড়ে তার জন্যে এই বড়িটা এখন আর ঘন্টা দুয়েক পরে আর একটা খাইয়ে দাও। ভেন ওখানেই বসে রইল। সেই আসনসিঁড়ি হয়ে। ফ্রান্সিস মারিয়াকে একটা বড়ি খাইয়ে দিল।
শেষ রাতের দিকে মারিয়া চোখ বড়ো বড়ো করে তাকাল। ফ্রান্সিস তখনও মারিয়ার মাথা কোলে রেখেছে। ফ্রান্সিস দেখল সেটা। বলল–মারিয়া মারিয়া। শরীর খারাপ লাগছে?মারিয়া এপাশ-ওপাশ কয়েকবার তাকাল। তারপর থেমে থেমে বলতে লাগল– ঘরটা এত অন্ধকার–ঐ তো সমুদ্র–আমি সমুদ্রে সাঁতার–সূর্য ডুবে যাচ্ছে টুপ করে বাতাস ভেজা ভেজা বৃষ্টি হয়েছে। ফ্রান্সিস মুখ নিচু করে ডাকল মারিয়া–মারিয়া কী বলছো এসব। হ্যারি দেয়ালের পাথরের খাঁজ থেকে মশাল তুলে এনে মারিয়ার কাছে দাঁড়াল। এবার মারিয়া মুখটা অনেকটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ফ্রান্সিস ভেনকে ডাকল। ভেন চোখ খুলে তাকাল। আবারমারিয়াকে ভালো করে দেখল। বলল– ফ্রান্সিস আর একটা ওষুধ দিচ্ছি। এতে জ্বর না কমলে কিছু করার নেই। সব ওষুধ তো আমি আনতে পারিনি।
ভেন অন্য একটা ছোটো থলে কোমরের ফেট্টি থেকে বের করল। একটা বড়ি বের করল। বড়িটা হাতে নিয়ে মারিয়ার মুখের ওপর ঝুঁকে বলল-রাজকুমারী, এই বড়িটা হাতে নিয়ে মারিয়ার মুখের ওপর ঝুঁকে বলল-রাজমারী,এই বড়িটা চুষে খেয়ে নিন। জ্বর কমবে। মারিয়া গোঙাতে লাগল। ফ্রান্সিস বলল –বড়িটা আমাকে দাও। বড়িটা নিয়ে মারিয়াকে বলল–মারিয়া মুখ খোলো–ওষুধ মুখে নাও। মারিয়া চোখ বুজে গোঙাতে লাগল। মুখ হাঁ করল না।
ভেন বড়িটা নিল। তারপর মারিয়ার মুখের দাঁতের পাটি ডান হাতের আঙ্গুলের চাপে খুলে বড়িটা ফেলে দিল। মারিয়া হঠাৎ চোখ খুলে তাকাল। বড়ো বড়ো চোখ করে চারদিকে তাকিয়ে নিল। তারপর ভাঙা গলায় বলল তোমরা কারা? এ্যা? কারা সব? কী চাও তোমরা? কে আমাকে ডাকছে? কেকে-কে? নিস্তেজ হয়ে মারিয়া দু-চোখ বন্ধ করে পড়ে রইল। মারিয়ার রোগাৰ্ত ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে ফ্রান্সিস ফুঁপিয়ে উঠল। হ্যারি, শুনল সেটা। নিচু হয়ে ফ্রান্সিসের পিঠে হাত রেখে মৃদুস্বরে বলল–ফ্রান্সিস অস্থির হয়ে পড়ো না।
ফ্রান্সিস ভেনকে মৃদুস্বরে বলল–ভেন আমাদের জাহাজে গেলে তুমি মারিয়াকে ওষুধ দিয়ে সুস্থ করে তুলতে পারবে?
–আমার মনে হয় পারবো। ভেন বলল।
ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। ছুটে গেল লোহার দরজার কাছে। চিৎকার করে ডাকল– পাহারাদার–পাহারাদার কাছে এসো। তখন দুজন পাহারাদার পাহারা দিচ্ছিল। ফ্রান্সিসের ডাক শুনলেও না শোনার ভান করে ঘুরে ঘুরে পাহারা দিতে লাগল। ফ্রান্সিস দুহাতে লোহার দরজা ঝাঁকাতে আঁকাতে চিৎকার করে বলল–এদিকে এসো। দরজায় জোর শব্দ উঠল–ঝন্ ঝন।
একজন পাহারাদার এগিয়ে এলো। বলল–কী ব্যাপার?
আমাদের রাজকুমারী ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তোমাদের সেনাপতিকে ডাকো। ফ্রান্সিস বলল।
–সেনাপতি তোমার চাকর নাকি যে ডাকলেই আসবে। পাহারাদারটি বলল।
ফ্রান্সিস আবার লোহার দরজায় প্রচন্ড ঝাঁকুনি দিয়ে উচ্চকণ্ঠে বলে উঠল– সেনাপতিকে ডাকো। রক্ষী দুজন তলোয়ার নির্বিকভাবে তলোয়ার উঁচিয়ে পাহারা দিয়ে গেল। লোহার দরজার শব্দে ফ্রান্সিসের চিৎকারে ভাইকিংদের ঘুম ভেঙে গেল। সকলে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। ততক্ষণে ওরা জেনে গেছে মারিয়া গুরতর অসুস্থ। তখন ফ্রান্সিস একটু দুরে সরে এসে ছুটে গিয়ে লোহার দরজার ওপর পিঠ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। দরজায় প্রচন্ড শব্দ উঠল। ভাইকিং বন্ধুরা ধ্বনি দিল–ও-হো-হো। রক্ষীরা বেশ ঘাবড়ে গেল। লোকটা লোহার দরজা ভেঙে ফেলবে নাকি। একজন রক্ষী এলো। বলল–কী চাও তুমি?
সেনাপতিকে ডাকো। আমি কথা বলব। ফ্রান্সিস বলল।
–এত রাতে? ঘুমিয়ে পড়েছে। রক্ষী বলল।
–কোনো কথা শুনতে চাই না। ঘুম ভাঙিয়ে সেনাপতিকে নিয়ে এসো ফ্রান্সিস বলল।
