পারবে না। একে দিনের বেলা তার ওপর সেনাপতিকে লক্ষ্য করো চারিদিকে নজর রেখে চলেছে? ফ্রান্সিস বলল।
–আবার তো বন্দির জীবন। শাঙ্কো বলল।
–হা ফ্রান্সিস মাথা ওঠা-নামা করল।
–আমরা আর পালাতে পারবো না। শাঙ্কো বলল।
দাঁড়াও। কোথায় আমাদের রাখা হয়। পাহারার ব্যবস্থা কী হয় এসব দেখে। ভেবেচিন্তে পালাবার উপায় বের করা হবে। এক্ষুণি পালাবার সময় বা উপায় নয়। ফ্রান্সিস বলল।
পদাতিক সৈন্যদের মধ্যে তিরিশ চল্লিশজন রইল। বাকিরা চলে গেল। ঐ তিরিশ চল্লিশজন সৈন্য ফ্রান্সিসদের পাহারা দিয়ে নিয়ে চলল।
ফ্রান্সিসরা যেতে যেতে দেখল জমিতে চাষিরা চাষ করছে। বাড়িঘর। কাঠের ওপর মাটি লেপা ছাত। বাড়িগুলো পাথরের। বাড়িগুলো থেকে লোকজন বেরিয়ে আসছে। বন্দি ফ্রান্সিসদের দেখছে। মেয়েরা মারিয়াকে হাঁ করে দেখছে। ওরা বুঝতে পেরেছে বন্দিরা বিদেশি।
এক-মানুষ উঁচু পাথরের দেয়ালঘেরা শহর। এটাই বোধহয় রাজধানী। রাস্তা দিয়ে চলেছে। দুপাশে দোকান টোকান। পথে খুব ভিড় নয়। এক ঘোড়ায় টানা গাড়ি চলেছে। হাঁটতে হাঁটতে ফ্রান্সিসরা একটা লম্বাটে বড়ো বাড়ির সামনে এলো। সেনাপতি হাত তুলে সবাকে থামতে ইঙ্গিত করল। এত বাড়ি। নিশ্চয়ই রাজবাড়ি।
সেনাপতি বাড়িটার পুবকোণায় গেল। সেখানে একটা ঘরের সামনে এলো। দেখা গেল তিন-চারজন পাহারাদার সৈন্য। খোলা তলোয়ার হাতে পাহারা দিচ্ছে। সেনাপতি কারারক্ষীদের ইশারা করল। একজন রক্ষী কোমরে গোঁজা একটা বড়ো চাবির রিং বের করল। লোহার দরজার সামনে গেল। দেখা গেল একটা বড়ো তালা ঝুলছে। পাহারাদার চাবি লাগিয়ে তালাটা খুলে ফেলল। ঢং ঢং শব্দে লোহার দরজাটা খুলল।
সেনাপতি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ফ্রান্সিসদের ঘরটায় ঢোকার জন্যে ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিসরা ঢুকতে লাগল। হ্যারি সেনাপতিকে বলল–আমাদের মধ্যে দুজন আহত বন্ধু আছে। তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন।
ব্যবস্থাটা তোমরা করলেই পারতে। সেনাপতি বলল।
–সে সময় পাইনি। আর একটা কথা। হ্যারি বলল।
–কী? সেনাপতি বলল।
সকাল থেকে আমরা কিছু খাইনি। আমাদের তাড়াতাড়ি খেতে দিন।
হ্যারি বলল।
–ঠিক আছে দেখছি। সেনাপতি বলল।
হ্যারি ঘরটায় ঢুকল। বোঝাই গেল কয়েদঘর। বাইরের চড়া আলো থেকে বেশ অন্ধকার অন্ধকার ঘরটায় প্রায় কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। একেবারে ওপরে দুপাশের দেয়ালের গায়ে জানালা। ওখানে দিয়ে যা একটু আলো আসছে। মেঝের পাতা গাছের ছাল দিয়ে তৈরি পাটির মতো। বসে আছে শুয়ে আছে বন্ধুরা। একপাশে ফ্রান্সিস দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে আছে। পাশে মারিয়া। তার পাশে শাঙ্কেরা।
হ্যারি এসে সেখানে বসল। মারিয়া ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল তোমাদের জীবনের অর্ধেকটাই কেটে গেল কয়েদঘরে থেকে থেকে। হ্যারি হাসল। বলল–আপনি ঠিক কথাই বলেছেন। ফ্রান্সিস বলল –হ্যারি দেখো তো ভেন ওর ওষুধপত্র এনেছে কিনা।
-কেন বলো তো। হ্যারি বলল।
দুই বন্ধু আহত। তাদের তো ওষুধ চাই। ফ্রান্সিস বলল।
–আমি সেনাপতিকে ওষুধের কথা বলেছি। হ্যারি বলল।
মনে হয় না ওরা দেবে। ওদের সৈন্যদের সঙ্গে লড়তে গিয়েই তো আমার বন্ধুরা আহত হয়েছে। ফ্রান্সিস বলল।
–কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে দেখা যাক। আমি খাবারও তাড়াতাড়ি দিতে বলেছি। হ্যারি বলল।
–ভালোই করেছে, সকাল থেকে কেউ কিছু খেতে পারেনি। ফ্রান্সিস বলল।
ঘন্টাখানেক কেটে গেল। ভাইকিংরা কেউ কথা বলছেনা। শুয়ে বসে আছে। অন্ধকার এখন সকলের চোখেই সয়ে এসেছে।
ফ্রান্সিস বলল–হ্যারি?
হ্যারি বলল–বলো।
–ওরা ওষুধ দেবে না। ভেনকে ডাকো। হ্যারি উঠে দাঁড়াল। তাকিয়ে তাকিয়ে ভেনকে খুঁজল।দেখল ডান কোণায় ভেন বসে আছে। হ্যারি বন্ধুদের জন্যে ফিরে ভেন এর কাছে এলো। দেখল ভেন আসনসিঁড়ি হয়ে বসে আছে দুচোখ বন্ধ। হ্যারি ডাকল, ভেন। ভেন চোখ মেলে তাকাল। হ্যারি বলল–আমাদের দুই বন্ধু তো আহত। তুমি কি কিছু ওষুধ এনেছো? ভেন ফোকলা দাঁতে হেসে কোমরের ফেট্টি থেকে দুটো কাপড়ের থলে বের করল। হ্যারি হেসে বলল–সাবাস ভেন। ওদের ওষুধ দাও।
–এখানে আসতে বলো। এক পাত্র জল যেন নিয়ে আসে। ভেল বলল।
হ্যারি বন্ধুদের মধ্যে আহত বন্ধু দুজনকে খুঁজে বের করল। বলল –ভেন ওষুধ এনেছে। আমাদের জন্যে মাটির জালায় জল রাখা আছে আর একটা পাত্রও থাকতে পারে। ওটাতে জল ভরে নিয়ে যেও।
দুই বন্ধু উঠল। একজনের পায়ে তলোয়ারের ঘা লেগেছে অন্য জনের ঘা লেগেছে হাতে। দুজনে জলের পাত্র নিয়ে ভেন-এর কাছে চলল।
ভেন থলে থেকে কালো রঙের গুড়ো বের করল। সামান্য জল ঢেলে দুহাতের চেটোয় ঘষতে ঘষতে একটা বড়ির মতো করল। ঐভাবে আরো একটা বড়ি তৈরি করল। দুজনকে খেতে দিল। দুজনে খেল। এবার মে আর একটা থলে থেকে হলুদ রঙে র গুড়ো বের করল। দুজনের কাটা জায়গায় হলুদ রঙের গুঁড়ো আস্তে আস্তে ছড়িয়ে দিল। ক্ষত জ্বালা করে উঠল। তারপর এতক্ষণের যন্ত্রণা কমে আসতে লাগল। দুজনে নিজেদের জায়গায় ফিরে গেল।
তখনই ঢ্যাং ঢ্যাটাং শব্দে কয়েদঘরের দরজা খুলে গেল। দুজন পাহারাদার খোলা তলোয়ার হাতে ঢুকল। দরজার কাছে দুদিকে দুজন দাঁড়াল।
একজন লোক কাঠের বড়ো থালা নিয়ে ঢুকল। তাতে গোল কাটা রুটি আর একজন বড়ো ডেকচি নিয়ে ঢুকল। আর একজন একগাদা পাতা হাতে ঢুকল। সে দ্রুত হাতে পাতাগুলো সব বন্দিদের সামনে পেতে দিল। রুটি আর নানা সজির তরকারি। সঙ্গে অল্প ঝোল দেওয়া হল।
