মাস্তলের মাথায় বসা নজরদার পেড্রো গলা চড়িয়ে বলল–ফ্রান্সিস, ঘোড়ায় চড়ে কারা আসছে, ধুলো উড়িয়ে খুব দ্রুত আসছে।
–দক্ষিন দিক থেকে তাই না? ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ। পেড্রো বলল।
–এখন কী করবে ফ্রান্সিস? হ্যারি বলল।
–ধরা দেব। উপায় নেই। ফ্রান্সিস বলল।
— একবারে লড়াই না করে? হ্যারি বলল।
–এখন তো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। দেখো–কত সৈন্য আসছে। ঘোড়ায় চড়ে আসছে মাত্র কয়েকজন। পেছনে তাকিয়ে দেখো। পদাতিক সৈন্য কত! ফ্রান্সিস বলল।
–আবার বন্দিজীবন। হ্যারি বলল।
–বন্দিদশা মেনে নেব। সময় সুযোগমতো পালাবো। এছাড়া কোনো উপায় নেই। ফ্রান্সিস বলল।
অল্পক্ষণের মধ্যেই অশ্বারোহীরা কাছে এসে পড়ল। তাদের গলায় বর্মে উষ্ণীষে রোদ পড়েছে। চক্ করছে।
অশ্বারোহীরা তীরের কাছে নামল। একজন দীর্ঘদেহী যোদ্ধা ঘোড়া থেকে নেমে এগিয়ে এলো বালিয়াড়িতে। গলা চড়িয়ে বলল–জাহাজ থামাও।
–আমরা জাহাজ থামিয়েছি। নোঙর ফেলেছি। হ্যারি গলা চড়িয়ে বলল।
–পাটাতন ফেলো। শাঙ্কোরা পাটাতন পেতে দিল। দীর্ঘদেহী পাটাতনের ওপর দিয়ে হেঁটে জাহাজে উঠল। চারদিকে তাকিয়ে ভাইকিংদের দেখল। তারপর বলল –তোমরা বলছো তোমরা ভাইকিং। দেশ ঘুরতে বেরিয়েছে। কিন্ত আমাদের বিশ্বাস হচ্ছে না।
–কী করলে তবে বুঝবেন যে আমাদের বিশ্বাস করা চলে? হ্যারি বলল।
–সেসব পরে হবে। আমি এই দেশের সেনাপতি। মহামান্য রাজা গঞ্জালেস আসছেন। তিনি কী বলেন শোনো।
তখন দেখা গেল দাড়ি গোঁফওয়ালা একজন মোটা লোক ঘোড়া থেকে নামলেন। তীরের দিকে এগিয়ে এলেন। বালিয়াড়িতে নামলেন। কোনো কথা না বলে পাতা পাটাতন দিয়ে হেঁটে জাহাজে উঠে এলেন। তার পরনে কালো জোব্বামতো পোশাক। তাতে রুপোলি সুতোর সূক্ষ্ম কারুকাজ। মাথায় ঢেউ-খেলানো সোনার রাজমুকুষ্ট।সকালের আলোয় ঝিকিয়ে উঠছে। কোমরে চামড়ার মোটা ফেট্রি। তাতে হাতির দাঁতের বাঁটওয়ালা তলোয়ার ঝুলছে। গঞ্জালেস জাহাজে উঠে তাকিয়ে তাকিয়ে জাহাজটা দেখলেন। ভাইকিংদের দেখলেন। একবার জোরে কাশলেন। তারপর বেশ ভারী গলায় বললেন- তোমরা আমার সৈন্যদের আহত করছে। আমার একজন সৈন্যও যদি মারা যেত তোমাদের সবকটাকে তাহলে কেটে সমুদ্রে ভাসিয়ে দিতাম। তোমরা নিজেদের ভাইকিং বলে পরিচয় দিয়েছে। পোশাক নয় তোমাদের চেহারা দেখে বুঝতে পারছি তোমরা বিদেশি। তোমরা ভাইকিং। কিন্তু গঞ্জালেস থামলেন। তারপর বলতে লাগলেন–এখন এখানে যুদ্ধের তোড়জোড় চলছে। রানি উরাকা আমাদের দেশ আক্রমণের জন্যে তৈরি হচ্ছে। আমরাও তৈরি হচ্ছি। যুদ্ধ হবেই। এই সময় তোমরা এখানে এসেছো কেন?
–আমরা ইচ্ছে করে এখানে আসিনি। আমরা আমাদের দেশে ফিরেযাচ্ছি।হ্যারি।বলল।
–কিন্তু আমাদের বিশ্বাস হচ্ছে না। রানি উরাকা গুপ্ত সংবাদ সংগ্রহের জন্যে তোমাদের এখানে পাঠিয়েছে। রাজা বললেন।
–কিন্ত আমরা একবারও জাহাজ থেকে নামিনি। তাহলে কী করে আমরা গুপ্ত সংবাদ সংগ্রহ করবো। হ্যারি বলল।
–সেসব বুঝি না। তোমদের বন্দি করা হল। রাজা গঞ্জালেস বললেন।
–এটা অন্যায়। আপনারা কোনো প্রমাণ ছাড়াই আমাদের গুপ্তচর ভেবেছেন। সন্দেহের বশে আমাদের বন্দি করেছেন। আমরা এখানে এসে রানি উরাকা এবং আপনার নাম প্রথম জানলাম। হ্যারি থামল। এবার ফান্সিস ভাঙা ভাঙা পোর্তুগীজ ভাষায় বলল রানি উরাকার হয়ে আমরা কেন গুপ্তচরবৃওি করতে যাবো? তাতে আমাদের কী লাভ?
হয়তো সোনার চাকতি দেবে। রাজা হেসে কাশলেন। তারপর বললেন–হয়তো এমনি কোনো বন্দোবস্ত হয়েছে। তোমাদের যা হাল দেখছি। সোনার লোভ তোমরা সামলাতে পারোনি।
–আপনি আমাদের সঠিক পরিচয় জানেন না। অনেক মূল্যবান গুপ্তধন আমরা উদ্ধার করেছি। সেই গুপ্তধনের যিনি মালিক তাঁকেই আমরা গুপ্তধনের ভান্ডার দিয়ে দিয়েছি। এক টুকরো সোনা বা হীরে আমরা নিইনি। হ্যারি বলল।
–তোমরা বলছো কিন্ত আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। রাজা বললেন। তখনই মারিয়া মাস্তলের পেছন থেকে সামনে এলো। রাজা গঞ্জালেস মারিয়াকে দেখে বেশ অবাক হলেন। বললেন এ কে?
–ইনি আমাদের দেশের রাজকুমারী। ফ্রান্সিস বলল।
–রাজকুমারী এইভাবে বিদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে? তোমাদের সঙ্গে? এর স্বামী কোথায়? রাজা জিজ্ঞেস করলেন।
আমিই রাজকুমারীর স্বামী। রাজকুমারী মারিয়াও আমাদের মতো অ্যাডভেঞ্চর অভিযান ভালোবাসেন। তাই আমাদের সঙ্গে এসেছেন।
অবাক কান্ড। চোখ বড়ো বড়ো করে রাজা গঞ্জালেস বললেন।
হ্যারি হেসে বলল–হ্যাঁ কিছু কিছু অবাক কান্ড তো সংসারে ঘটে।
যাক গে। রাজা গঞ্জালেস সেনাপতিকে ইসারায় ডাকলেন। সেনাপতি কাছে এগিয়ে এলো। রাজা বললেন– সবাইকে বন্দি করে নিয়ে চলো। রানি উরাকার সঙ্গে যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এরা বন্দি থাকবে।
–একটা অনুরোধ ছিল। হ্যারি বলল। রাজা হ্যারির মুখের দিকে তাকালেন। বললেন কী কথা?
আমাদের রাজকুমারীকে আপনার অন্দরমহলে রাখুন। আমাদের তো আপনার বন্দি নিবাসে রাখা হবে। রাজকুমারী অত কষ্ট সহ্য করতে পারবেন না। হ্যারি বলল।
–দেখি ভেবে। রাজা গঞ্জালেস জাহাজ থেকে নামলেন। চললেন নিজের ঘোড়াটার দিকে। ঘোড়াটায় উঠলেন। ঘোড়া ছোটালেন ঘাসে ঢাকা প্রান্তরের ওপর দিয়ে।
সেনাপতি এগিয়ে এলো। বলল- তোমাদের হাত বাঁধা হবে না। সেই সুবিধে নিয়ে কেউ পালাবার চেষ্টা করতে গেলে তাকে মরতে হবে। এবার চলো। ফ্রান্সিসরা জাহাজ থেকে নামতে লাগল। শাঙ্কো বলল–ফ্রান্সিস –আমি পালাবো।
