-না। একটা তামার মুদ্রাও আমরা নিই নি। হ্যারি বলল।
সর্দার গোছের লোকটা দাঁত বের করে হেসে সঙ্গীদের দিকে তাকাল। সঙ্গীরাও হাসল। লোকটা বলল–তোমরা কত কষ্টে গুপ্তধন উদ্ধার করো আর তার এককণাও নাও না–এটা বিশ্বাস হচ্ছে না।
–খুবই স্বাভাবিক। আমরা চোর ডাকাত জোচ্চোরদেরই বেশি দেখি। মানুষ যে অন্যরকমও হয়–মানুষ যে সৎও হয়, হৃদয়বানও হয়, সত্যবাদীও হয় এটা আমরা সহজে বিশ্বাস করতে পারি না। হ্যারি বলল।
যাকগে। তোমাদের বন্দি করা হল। সর্দার বলল।
–কেন? আমরা তো কোনো অপরাধ করিনি। হ্যারি বলল।
–সেসব বুঝি না। সর্দার বলল।
আমরা দেশে ফিরে যাচ্ছি। আমাদের বাধা দিও না। ফ্রান্সিস বলল।
–তোমরা কি আমাদের সঙ্গে লড়াই করবে? সর্দার বলল।
–না। লড়াই মৃত্যু রক্তপাত এসব আমরা চাই না। হ্যারি বলল।
কাপুরুষ। সর্দার বলল।
শাঙ্কো এগিয়ে এসে নিজেদের দেশের ভাষায় বলল–ফ্রান্সিস আমরা বিনাযুদ্ধে এভাবে বন্দি হবো না। আমরা লড়াই করবো। অন্য ভাইকিং বন্ধুরা চিৎকার করে উঠল– ও-হো-হো।
সৈন্য কজন একটু ঘাবড়াল।
ফ্রান্সিস বলল–ভাইসব। শান্ত হও। সময় সুযোগমতো লড়াই করবো। এখানে ধারেকাছে সেনানিবেস থাকা অসম্ভব নয়। একবার লড়াইয়ে নামলে এরা দু-একজন মারা য়াবে দু-একজন পালাবে। সেনানিবাসে এই সংবাদ পৌঁছেলে কত না সৈন্য ছুটে আসবে কে জানে। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল–দেখো-বাতাস পড়ে গেছে। শুধু দাঁড় বেয়ে আমরা বেশিদূর যেতে পারবো না। ধরা পড়ে যাবো। তখন লড়াই মানেই আমাদের মৃত্যু। কাজেই আগে সব শুনি। হ্যারি ওদের কাছে শোনো তো এখানকার রাজা কে? রানি উরাকা কে? কী জন্যে ওরা আমাদের রানি উরাকার গুপ্তচর বলে ভাবছে?
হ্যারি জিজ্ঞেস করল–তোমাদের রাজার নাম কী?
–মহামান্য গঞ্জালেস। সর্দার বলল।
–রানি উরাকা কোথাকার রানি? হ্যারি জানতে চাইল।
আমরা যেখানে আছি এটা রানি উরাকার দেশের সীমা। এখান থেকে কিছু দূরে গেল রানি উরাকার দুর্গ দেখতে পাবে। যান তো–এসব বলে কী হবে। তোমার সব জেনেই এখানে এসেছো। রানি উরাকা তোমাদের পাঠিয়েছে। মহামান্য গঞ্জালেসের সৈন্যসংখ্যা কত? তার সেনানিবাস কোথায়? এসব খবর সংগ্রহের জন্যেই তোমাদের পাঠানো হয়েছে। এখন ধরা পড়ে অন্যরকম কথা বলছো যেন কিছুই জানো না। সর্দার বলল।
–আমরা আগেও বলেছি এখনও বলছি–রানি উরাকার নামও আমরা কোনোদিন শুনিনি। তোমাদের কাছেই প্রথম শুনলাম। ফ্রান্সিস বলল।
–যাক গে–তোমাদের বন্দি করা হল। সর্দার বলল।
ওদিকে শাঙ্কো বিস্কোরা দল বাঁধল। অস্ত্রঘর থেকে তলোয়ার সকলের অলক্ষ্যে এনে সিঁড়িঘরের পেছনে এসে দাঁড়াল। সৈন্যরা যখন ফ্রান্সিসদের বন্দি করতে এগিয়েএলো তখন শাঙ্কোরা সৈন্যদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। অতর্কিত এই আক্রমণে সৈন্যরা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরেই ওরা কোমরের অসিকোষ থেকে তলোয়ার বের করল। ততক্ষণে দুজন সৈন্য শাঙ্কোদের তলোয়ারের মার খেয়ে ডেক-এ পড়ে গেছে। শুরু হল তলোয়ারের লড়াই। রাজা গঞ্জালেসের সৈন্যরা এলো উষ্ণীষ পরা। ভাইকিংদের তো সেসব নেই। সামনাসামনিই লড়াই চলল। কিছুক্ষণ লড়াই করেই সৈন্যরা বুঝল শাঙ্কোরা তলোয়ার চালাতে কত দক্ষ।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি বাধা দেবার সময় পেল না। এখন দুজনেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লড়াই দেখতে লাগল। ফ্রান্সিস বলল হ্যারি–আমরা বিপদে পড়লাম। শাঙ্কোরা মাথা গরম করে আমাদের বিপদ ডেকে আনলো। দুজন ভাইকিং আহত হয়ে ডেক-এ পড়ে গেল।
ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসব লড়াই করো না। লড়াই বন্ধ করো। নইলে আমরা বিপদে পড়বো। এখনও কেউ মারা যায় নি। আর কিছুক্ষণ লড়াই চালালে। উভয়পক্ষের কেউ না কেউ মারা যাবে। তার আগে লড়াই থামাও।
ভাইকিংরা লড়াই থামাল। সবাই অস্ত্র ত্যাগ করল। সৈন্যরাও অস্ত্র নামাল। সবাই হাঁপাচ্ছে তখন। শাঙ্কোরা রাজা গঞ্জালেসের দুজন সৈন্যকে রেলিংয়ের ওপর দিয়ে জলে ছুঁড়ে ফেলল।
আহত সৈন্যদের নিয়ে রাজা গঞ্জালেসের সৈন্যরা জাহাজের পাটাতন দিয়ে তীরে নেমে এলো। জলে যে দুজন সৈন্যকে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছিল তারাও দলের সঙ্গে জুটল। সর্দার গোছের সৈন্যটি তলোয়ার উঁচিয়ে বলল– এর ফল তোমাদের ভুগতে হবে।
তীরের বালিয়াড়ি পার হয়ে ঘাসের প্রান্তর পেরিয়ে ওরা দক্ষিনমুখো চলল। তখনই সূর্য উঠল। রোদ ছড়াল সমুদ্রে ফ্রান্সিসদের জাহাজ তীরভূমির গাছ গাছালির মাথায় সবুজ প্রান্তরে। দেখা গেল দূরে সৈন্যরা যচ্ছে। শাঙ্কো বলল- ফ্রান্সিস তুমি বলাতেই আমরা অস্ত্র ত্যাগ করলাম। আর কিছুক্ষণ সময় পেলে ওদের হারিয়ে দিতে পারতাম।
তা পারতে। লড়াইয়ের সময় মাথা উত্তেজিত থাকে। দু-একজন সৈন্য নিশ্চয়ই মারা পড়ত। আমাদের অপরাধ বেশি হত। ওরা আমাদের বন্দি করতে এসেছিল। আমাদের ওরা আক্রমণ করেনি।
হ্যারি বলল–যা হবার হয়ে গেছে। এখন ফ্রান্সিস কী করবেন?
–এক্ষুণি নোঙর তোলো। জাহাজ ছাড়ো। দাঁড় টানো। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমদের এ তল্লাট ছেড়ে পালাতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
ভাইকিংরা কাজে নেমে পড়ল। জাহাজের গুটিয়ে রাখা পালগুলো খুলে দিল। পালগুলো অল্প ফুলে উঠল। কারণ বাতাস এসে গেছে। নোঙর তোলা হল। একজন দাঁড়ঘরে চলে গেল। দাঁড়টানা শুরু হল। জাহাজ চলল।
