ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল, ভাইসব, তোমরা মুক্ত। বাইরে এসো।
ভাইকিং বন্ধুরা ছুটে বাইরে এলো। প্রহরীরা ওদের হাতের বাঁধন কেটে দিতে লাগল। ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে উঠল, ও-হো-হো।
দেখা গেল রাজপ্রাসাদের দিক থেকে একজন পরিচারিকা মারিয়াকে নিয়ে আসছে। মারিয়ার আর তর সইছিল না। মারিয়া হাসতে হাসতে প্রান্তরটা ছুটে পার হয়ে ফ্রান্সিসদের কাছে এলো। তখনও হাঁপাচ্ছে, মারিয়াকে সুস্থ দেখে ফ্রান্সিস খুশি হলো।
মারিয়া আসতেই আবার ভাইকিংদের ধ্বনি উঠল–ও-হো-হো। ফ্রান্সিস বলল—এবার হুয়েনভা চলো—আমাদের জাহাজে।
ভাঙা আয়নার রহস্য
ফ্রান্সিসদের জাহাজ চলেছে। বাতাসের তেমন জোর নেই। পালগুলো প্রায় নেতিয়ে পড়ছে। মাঝে মাঝে দমকা হাওয়া ছুটে আসছে। তখনই পালগুলো ফুলে উঠেছে। পরক্ষণেই আগের মতো।
বেশি কিছুক্ষণের আগে পশ্চিম দিগন্তে গভীর কমলা রঙের সূর্য অস্ত গেছে। আকাশে লাল আলো ছিল ছড়িয়ে। এখন সব অন্ধকার। আকাশে ভাঙা চাঁদ। জ্যোৎস্না খুব উজ্জ্বল নয়।
তীরভূমির কাছ দিয়ে জাহাজ চলেছে। ভাইকিংরা ডেক-এর এখানে-ওখানে শুয়ে। বসে ছিলে। জাহাজের গতি বেশ কমে গেছে। হ্যারি ডেক-এ উঠে এলো। দেখল জাহাজের শ্লথগতি। ও সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামল। চলল ফ্রান্সিসের কেবিনঘরের দিকে। কেবিন ঘরের সামনে এসে হ্যারি দরজায় টোকা দিল। মারিয়া দরজা খুলে দাঁড়াল। বলল–কী ব্যাপার হ্যারি!
সমস্যায় পড়েছি। ফ্রান্সিস ডাকল–হ্যারি ভেতরে এসো। হ্যারি কেবিন ঘরে ঢুকল। বলল-বাতাস একেবারে পড়ে গেছে। সব পাল নেতিয়ে পড়েছে। জাহাজের গতি কমে গেছে। কী করবে বলো।
–আমি বিকেলে ডেক-এ গিয়েছিলাম। দেখেছি সব। হাওয়ার গতি না বেড়ে ওঠা পর্যন্ত এভাবেই যেতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
–থাক না। বন্ধুরা একটু হাত-পা ছড়িয়ে বসুক। গল্পটল্প করুক। গভীর রাতের দিকে দেখো বাতাসের গতি বাড়বে। অনেকবারই এমন হতে দেখেছি। ফ্রান্সিস বলল।
– দাঁড় টানলে জাহাজের গতি বাড়তো। হ্যারি বলল।
–তাহলে দেখা যাক। হ্যারি বলল। ও ডাক-এ উঠে এলো। মাস্তুলে ঠেসান দিয়ে বসল। অপেক্ষা করতে লাগল কখন বাতাসের বেগ বাড়ে।
মাস্তুলের মাথায় বসেছিল নজরদার পেড্রো। চাঁদের আলো খুব উজ্জ্বল নয়। তাই পেড্রোকে চোখ কুঁচকে চারদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে হচ্ছিল।
হঠাৎ দেখল তীরভূমি দিয়ে মশাল হাতে কারা ছুটে আসছে। পেড্রো চোখ কুঁচকে স্থির তাকিয়ে রইল কিন্তু চাঁদের অস্পষ্ট আলোয় ঠিক বুঝল না ওরা কারা।
পেড্রো গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসব তীরভূমি দিয়ে একদল লোক ছুটে আসছে আমাদের জাহাজের দিকে। ফ্রান্সিসকে খবর দাও।
হঠাৎ তখনই মেঘ সরে গেল। চাঁদের আলো অনেকটা স্পষ্ট হল। পেড্রো দেখল। যারা মশাল হাতে ছুটে আসছে তারা সংখ্যায় পাঁচজন। সবাই সশস্ত্র যোদ্ধ।
ততক্ষণে ফ্রান্সিসদের কাছে খবর পৌঁছে গেছে। ফ্রান্সিস ও মরিয়া জাহাজের ডেক এ উঠে এলো। রেলিং ধরে তাকিয়ে রইল। সত্যি পাঁচজন সশস্ত্র সৈন্য আসছে। হাত নেড়ে কী বলছে। ওদের কথা ক্ষীণভাবে শোনা গেল। হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস ওরা পোর্তুগীজ ভাষায় কথা বলছে। জাহাজ থামাতে বলছে। কী করবে?
–তাই ভাবছি। তবে এটা বোঝা গেল যে আমরা পোর্তুগালে এসেছি। ফ্রন্সিসদের ঘিরে ভাইকিংরা দাঁড়িয়ে ছিল। শাঙ্কো বলল
–ফ্রান্সিস মাত্র তো পাঁচজন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা ওদের হারিয়ে দিতে পারবো। ..
না শাঙ্কো–আমি লড়াই চাই না। ফ্রান্সিস বলল।
হ্যারি বলল–এক কাজ করো–ওদের জাহাজে উঠতে দাও। ওরা কী বলতে চায় শুনি। তারপর যা করার করবো।
–বেশ–ফ্লেজারকে বলো জাহাজ তীরভূমিতে নিতে। পাটাতনও পেতে দাও।
ফ্লেজার ফ্রান্সিসদের নির্দেশমতো জাহাজ তীরে ভেড়াল। পাটাতন ফেলা হল। সৈন্যরা পাটাতন দিয়ে জাহাজে উঠল। তার আগে বালিয়াড়িতে ওর মশাল পুঁতে রাখল।
পাঁচজন জাহাজে উঠতে ফ্রান্সিস এগিয়ে গেল। হ্যারিও সঙ্গে গেল। ওদের মধ্যে একজন সর্দার গোছের লোক ভাঙা ভাঙা পোর্তুগীজ ভাষায় বলল- তোমরা কারা? এখানে এসেছো কেন? তোমাদের দেখেই বুঝতে পারছি তোমরা বিদেশি। তোমাদের দেশ কেথায়?
একগাদা প্রশ্নের উত্তরে হ্যারি বলল–আমরা জাতিতে ভাইকিং। পশ্চিমে য়ুরোপের সমুদ্রতীরে আমাদের দেশ।
-তোমরা জলদস্যু হতে পারো। হ্যারি ক্রুদ্ধস্বরে বলল–কী দেখে আমাদের জলদস্যু বলে সন্দেহ করছো?
–তোমরা এতজন জোয়ান। একসঙ্গে জাহাজে চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। জাহাজ লুঠ করা তোমাদের পক্ষে খুবই সহজ কাজ। লোকটা বলল।
তখনই মারিয়া ফ্রান্সিসদের কাছে এসে দাঁড়াল।হ্যারি আঙ্গুল তুলে মারিয়াকে দেখিয়ে বলল–ইনি আমাদের দেশের রাজকুমারী। কোনো দেশের রাজকুমারী জলদস্যুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ায় শুনেছো কখনো?
–না–এরকম শুনিনি। লোকটা বলল।
তবে? হ্যারি বলল।
–তাহলে তোমরা রানি উরাকার গুপ্তচর।
–রানি উরাকার নাম আমরা জন্মেও শুনিনি। তাছাড়া তোমাদের রাজা-রানির কোনো ব্যাপারে আমরা নেই। আমরা দেশে দেশে দ্বীপে দ্বীপে ঘুরে বেড়াই। সবার সঙ্গে সহৃদয় সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করি। যদি কোথাও গুপ্তধনের সংবাদ পাই আমরা বুদ্ধিখাঁটিয়ে তা উদ্ধার করি। তারপর সেখানকার শাসককে দিয়ে দিই। ফ্রান্সিস বলল।
–তোমরা তাতে ভাগ বসাও। সর্দারটা বলল।
