সন্ধের আগেই সবাই ফিরে চলল। ফ্রান্সিস হ্যারিকে ঘোড়ায় চড়িয়ে দিল। নিজে আর সব বন্দির সঙ্গে হেঁটে চলল।
দলপতি সব বন্দিকে নিয়ে চলল ওখানকার কয়েদঘরটার দিকে।ফ্রান্সিস আর বারাকা সরাইখানায় ফিরে এলো।
পরদিন আবার পাথর সরানোর কাজ চলল। দুপুরে খাবার খেতে বন্দিরা কাজ থামাল। তারপর আবার শুরু হলো কাজ–পাথর ঠোকাঠুকির শব্দ।
বিকেলের আগেই পাথরের স্তূপ সরানো শেষ হলো। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল, এবার সবাই বিশ্রাম করো। বন্দিরা যে যেখানে পারল বসে পড়ল। বিশ্রাম করতে লাগল।
ফ্রান্সিস ঘুরে ঘুরে জায়গাটা দেখতে লাগল। প্রথমে দেখল বড়ো ঘরটা। বোঝা গেল এটা ছিল রাজদরবার। অন্য ঘরগুলোও দেখল। কোনোটা মন্ত্রণাকক্ষ, কোনোটা অস্ত্রশস্ত্র রাখার ঘর, অন্তঃপুরের ঘর কোনগুলো তাও বুঝে নিল। দু’কোণায় দুটো ঘরের কোনটা মহাফেজখানা কোনটা রাজকোষাগার সেটা বুঝতে পারল না।
আলো কমে এসেছে। ফ্রান্সিস উঠে এলো। এখন ভালো করে দেখা যাবে না।
বন্দিদের নিয়ে সবাই চলল। ফ্রান্সিস হ্যারিকে ঘোড়ায় উঠিয়ে নিজে হেঁটে চলল পাশে পাশে। হ্যারি মৃদুস্বরে ওদের দেশের ভাষায় বলল, ফ্রান্সিস, তুমি যা খুঁজছে তার কিছু হদিস পেয়েছো?
ফ্রান্সিসও গলা নামিয়ে বলল, বলতে পারো সাফল্যের দোরগোড়ায়।
এখানকার কয়েদঘরটা এত ছোটো যে আমরা ভালো করে ঘুমুতে পারছি না।
আজকের রাতটা কোনোরকমে কষ্ট করে থাকো। কালকে সব ঠিক হয়ে যাবে। ফ্রান্সিস বলল। সেইদিন রাতেই হ্যারিদের সেভিল্লা নিয়ে যাওয়া হল। কয়েদঘরে রাখা হল।
পরের দিন সকালেই ফ্রান্সিস আর বারাকা ঘোড়া ছুটিয়ে ভাঙা প্রাসাদে এলো।
ফ্রান্সিস পাথরে ভর রেখে নীচে নেমে এলো। দুকোণার ঘর দুটোর মেঝে দেখতে লাগল। ফ্রান্সিস ভাবতে লাগল কোণা ঘরটা ছিল রাজকোষাগার। হিসেব করতে গিয়ে দেখল পুবকোণার ঘরটাই প্রধান প্রবেশপথ থেকে সবচেয়ে বেশি দূরে। তাহলে এটাই ছিল রাজকোষাগার।
ফ্রান্সিস ভাঙা ঘরের পাথরের মেঝেয় পায়চারি করতে লাগল। ভাবতে লাগল এই ঘরের একশো বছর আগেই বন আবি আমীর তার অর্থসম্পদ রাখতেন। কিন্তু মৃত্যুর পূর্বে তিনি সেসব কোথায় রেখে যান তা কাউকে জানিয়ে যেতে পারেননি। নাকি ইচ্ছে করে জানাননি।
ফ্রান্সিস পায়চারি করছে। হঠাৎ মনে হলো একটা পাথরের পাটা কেমন নড়ে উঠল। ফ্রান্সিস এবার আস্তে হাঁটতে লাগল। নড়ে-ওঠা পাটার ওপর দাঁড়াল। পায়ের চাপ এদিক-ওদিক করল। বুঝল পাটাটা নড়ছে। হিসেব করে দেখল–ঠিক মেঝের মাঝখানের পাটাটা নড়ছে। পাশের পাটাটায় পায়ের চাপ দিল। ওটাও নড়ছে। তবে পাশেরটার চেয়ে কম। ফ্রান্সিস বারাকাকে ডেকে বলল, দ্যাখো তো এই দুটো পাটা নড়ছে কিনা। বারাকা এসে দাঁড়াল ঐ দুটো পাটার ওপর। পা চাপল। তারপর বলল, সত্যি দুটো নড়ছে। একটা বেশি, অন্যটা কম।
ফ্রান্সিস বলল, বারাকা, এই দুটো পাটাই কুড়ুল চালিয়ে তুলতে হবে। তুমি ক’টা কুড়ুল পাও নিয়ে এসো। কয়েকজন শক্তসমর্থ লোকও নিয়ে এসো। বলবে এখানে একটা কাজ করতে হবে। বদলে মজুরি পাবে।
বারাকা খাদ থেকে উঠে চলে গেল।
বারাকা ফিরে এলো। সঙ্গে কুড়ুল হাতে পাঁচটি যুবককেও নিয়ে এসেছে। ফ্রান্সিস ঐ যুবকদের পাথরের পাটাটা তুলতে বলল। দু-তিনজন মিলে পাটা দুটো নাড়িয়ে নাড়িয়ে তোলবার চেষ্টা করল। পারল না। ফ্রান্সিস বলল, কুড়ুলের ঘা মেরে পাটা দুটো ভাঙো। তারপর টুকরোগুলো সরিয়ে ফেল। পাঁচজনে পরপর কুড়ুলের ঘা মারল। পাথরের পাটা ভেঙে কয়েক টুকরো হয়ে গেল। ওরা টুকরোগুলো সরালো। ফ্রান্সিস হাঁটু গেড়ে বসে দেখল লোহার পাত মতো। যুবকদের বলল, অন্য পাটাটাও ভাঙো। যুবকদের আরো দুটো পাটা কুড়ুল মেরে ভাঙাল। ভাঙা পাথরগুলো তুলে সারিয়ে রাখল। এবার ফ্রান্সিস লোহার জিনিসটা পুরো দেখতে পেল। বুঝল এটা একটা লোহার সিন্দুক।যুবকদের দিকে তাকিয়ে বলল, তোমরা সিন্দুকটা তুলে আনো। ওরা আরো কয়েকটা পাটা ভেঙে গর্তটা বড়ো করল। তারপর সবাই হাত লাগিয়ে সিন্দুকটা আস্তে আস্তে তুলে এনে মেঝেয় রাখল।
ফ্রান্সিস ঝুঁকে পড়ে সিন্দুকটা দেখতে লাগল। সিন্দুকটা সাধারণ সিন্দুকের মতোই। রঙটা কালো। সিন্দুকটার সামনে-পেছনে দেখতে একই রকম। দু’পাশেই দুটো হাতল আছে। ফ্রান্সিস বুঝল সাধারণ সিন্দুকের মতো দেখতে হলেও এই সিন্দুকটা নির্দেশমতো তৈরি হয়েছে। সিন্দুকটার সামনে বা পেছনে কোথাও চাবির ফুটো নেই। ফ্রান্সিস বেশ আশ্চর্য হলো। বুঝল এই সিন্দুকে মূল্যবান কিছু নিশ্চয়ই আছে। তাই এই ব্যবস্থা।
ফ্রান্সিস যুবকদের দু’ভাগে ভাগ করল। নিজে আর বারাকাও হাত লাগাল। দু’দলে ভাগ হয়ে ফ্রান্সিসরা দুদিকের হাতল ধরে প্রচণ্ড জোরে টানল। সিন্দুকের ডালা খুলল না। এরকম কয়েকবারই টানা হলো। কিন্তু সিন্দুকের ডালা খুলল না।
ফ্রান্সিস মেজেয় বসে পড়ল। সিন্দুকটার দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল বিশেষভাবে তৈরি সিন্দুকটা যাতে খোলা না যায় তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কাজেই কীভাবে সিন্দুকটা খুলবে সেটা আগে বুঝতে হবে।
তখন বেশ বেলা হয়েছে। বারাকা বলল, ফ্রান্সিস, এবার খেতে চললো।
ফ্রান্সিস চিন্তিতস্বরে বলল, আমি খাবো না তুমি আর ঐ যুবকরা খেয়ে এসো।
–তুমিও এসো। উপবাসে থাকলে তোমার কষ্ট হবে। বারাকা বলল।
