–আমার অভ্যেস আছে। তোমরা যাও।
বারাকারা খেতে চলে গেল।
ফ্রান্সিস সিন্দুকটার পাশে বসে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল। হঠাৎ লক্ষ্য করল একদিকের ডালার ধারে ওপর থেকে নীচে একটা লোহার পাত বসানো। ভালো করে দেখে বুঝল পাতটা পরে বসানো হয়েছে। সিন্দুকের অন্যদিকে এরকম পাত বসানো নেই। ফ্রান্সিস খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সেই লোহার পাতটা দেখতে লাগল। বুঝল ছেনি-হাতুড়ি হলে লোহার লম্বা পাতটা খুলে ফেলা যাবে।
বারাকা আর যুবকরা ফিরে এলো। ফ্রান্সিস যুবকদের বলা, ছেনি-হাতুড়ি আনতে পারবে কেউ?
একটি যুবক বলল, আমি আনতে পারবো।
ফ্রান্সিস বলল, তাড়াতাড়ি নিয়ে এসো। এতক্ষণে ফ্রান্সিস খাদের ওপরের দিকে তাকাল। দেখল খাদ ঘিরে অনেক লোক জড়ো হয়েছে। ওরা দেখছে ফ্রান্সিস কী করছে।
যুবকটি ছেনি-হাতুড়ি নিয়ে এলে ফ্রান্সিস লোহার পাতের খাঁজে ছেনি বসিয়ে হাতুড়ি চালাল। আশ্চর্য! একটা ঘা পড়তেই লোহার লম্বাটে পাতটা নড়ে গেল। এতক্ষণে ফ্রান্সিস হাসল। বারাকার দিকে তাকিয়ে বলল, বারাকা, আমার অনুমান সত্যি হতে চলেছে। লোহার লম্বা পাতটা উঠে এলেই সিন্দুকের রহস্যটা বোঝা যাবে।
ফ্রান্সিস আবার হাতুড়ি চালাল। লোহার লম্বা পাতটা আরো খুলল। পরপর দু’তিনটে হাতুড়ির ঘায়ে লোহার পাতটা উঠে এলো। দেখা গেল একটা রুপোর চাবি সিন্দুকের গায়ে আটকানো। তার নীচেই একটা চাবির ফুটো। ফ্রান্সিস চাবিটা খুলে নিল। তারপর, ফুটোয় চাবিটা ঢোকাল। ডান দিকে চাপ দিয়ে ঘোরাতেই কট করে একটা শব্দ হলো। সিন্দুকের ডালা খুলে গেল। ডালাটা আটকাবার আগেই চারটে স্বর্ণমুদ্রা পাথরের মেঝেয় পড়ল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে ডালাটা সজোরে চেপে বন্ধ করল। যাতে আর কিছু দামি জিনিস বেরিয়ে না আসে। চাবি ঘুরিয়ে ডালা বন্ধ করে সে চারটে সোনার চাকতি কোমরে গুঁজল। খাদের ওপরে তাকিয়ে দেখল অনেক লোক জমে গেছে। দু-তিনজন। লোক ফ্রান্সিসের কাছে এলো। একজন বলল, সিন্দুক থেকে সোনার চাকতি পড়ল দেখলাম। সঙ্গে সঙ্গে ওর সঙ্গীরাও বলে উঠল, হা, হ্যাঁ, আমরাও দেখেছি।
ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল, ভাই, ওগুলো স্বর্ণমুদ্রা। আমার কোমরের ফেট্টি থেকে কী করে খুলে পড়ে গেছে। তোমরা সেই স্বর্ণমুদ্রাই দেখেছো। ওরা ঠিক বিশ্বাস করল না। তবে এই সোনার চাকতি নিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে লাগল। চারপাশের কিছু লোক এগিয়ে এলো। জটলা চলল। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে ডাকল, বারাকা, কাছে এসো। বারাকা কাছে এলো। ফ্রান্সিস চাপা গলায় বলল, তুমি ঘোড়ায় চড়ে এক্ষুণি আলতোয়াইফের কাছে যাও। বলবে, আমরা আমীরের গুপ্তধন আবিষ্কার করেছি। উনি যত শীঘ্র সম্ভব একদল সৈন্য নিয়ে যেন এখানে আসেন। যাও–জলদি।
ফ্রান্সিস সিন্দুকটার পাশে মেঝের বসে পড়ল। চাবিটা সিন্দুকের নীচে ঠেলে দিল। যে ভয়টা ফ্রান্সিস করছিল, এখন ঘটনা সেদিকেই মোড় নিল। সিন্দুকটা থেকে সোনার চাকতি বেরিয়েছে–খবরটা দর্শকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল। চার পাঁচজনের একটি দল খাদে নেমে ফ্রান্সিসের কাছে এলো। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। একজন বলল, আমরা দেখছি তুমি চাবি দিয়ে সিন্দুকটা খুলেছিলে।
ফ্রান্সিস হেসে বলল, ভুল দেখেছিলে, চাবিটা লাগেইনি।
অন্যজন বলল, আমরা দেখেছি সিন্দুক থেকে সোনার চাকতি গড়িয়ে পড়েছে।
ফ্রান্সিস আবার হেসে বলল, ভুল দেখেছো। আমার কোমরের ফেট্টি থেকে কয়েকটি স্বর্ণমুদ্রা পড়ে গিয়েছিল।
আর একজন বলল, তুমি চাবি দিয়ে সিন্দুক খুলেছিলে?
না, সেই চাবিতে সিন্দুক খোলেনি। ফ্রান্সিস বলল।
আর একজন চড়া গলায় বলল, ঠিক আছে, তুমি চাবিটা দাও, আমরা দেখবো সেই চাবিতে সিন্দুক খোলে কিনা।
ফ্রান্সিস এরকম কিছু আগেই আন্দাজ করেছিল। হেসে বলল, সেই চাবি তো আমার কাছে নেই। এখানকার আলতোয়াফের কাছে লোক মারফৎ পাঠিয়ে দিয়েছি।
চড়া মেজাজের লোকটি বলল, না। তুমি মিথ্যে কথা বলছে। চাবিটা তোমার কাছেই আছে।
ফ্রান্সিস দু’হাত তুলে হেসে বলল, ঠিক আছে, আমাকে তল্লাশি করো। চড়া মেজাজের লোকটি এগিয়ে এলো। ফ্রান্সিসের পোশাক, কোমর সব দেখল। চাবি পাওয়া গেল না। ফ্রান্সিস আগেই ভেবেছিল জড়ো হওয়া লোকগুলো যদি চাবি পেয়ে সিন্দুক খোলে, সব ধনভাণ্ডার অল্পক্ষণের মধ্যেই লুঠ হয়ে যাবে। নিরস্ত্র ফ্রান্সিস কিছুই করতে পারবে না।
ফ্রান্সিস বারবার রাস্তার দিকে তাকাতে লাগল। কিন্তু আলতোয়াইফ আসছেন না। এবার দলে দলে লোকজন খাদে নেমে আসতে লাগল। সিন্দুকটার গায়ে হাত দিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল। ফ্রান্সিস কাউকে বাধা দিল না। বাধা দিলে ওদের মনে সন্দেহ জাগতে পারে, নিশ্চয়ই সিন্দুকের দামি কিছু আছে।
ফ্রান্সিস তাকিয়ে রইল রাস্তার দিকে। হঠাৎ দেখল ধুলো উড়ছে। অশ্বারোহী সৈন্যদল আসছে। সামনে আলতোয়াইফ আর বারাকা।
সবাই খাদের কাছে এসে থামল। আলতোয়াইফ খাদে নেমে ফ্রান্সিসের কাছে এলেন। সিন্দুকটা দেখিয়ে বললেন, এটাতে কি গুপ্তধন আছে?
ফ্রান্সিস বলল, ঠিক বলতে পারবো না। সিন্দুকটা আপনার প্রাসাদে গিয়ে খুলতে হবে। তখন দেখা যাবে এই সিন্দুকেই গুপ্তধন রাখা হয়েছিল কিনা।
–আমার মনে হয় এই সিন্দুকের মধ্যে কিছু পুরনো দলিল-দস্তাবেজ আছে। আলতোয়াইফ বললেন।
