-বলো কি সাহায্য চাও।
–এখানে কী বন্দিশালা আছে? ফ্রান্সিস বলল
–হ্যাঁ, একটা ছোটো কয়েদঘর আছে। সেখানে এখন কয়েকজন বন্দি আছে।
আজ রাতেই আপনি সেভিল্লায় দূত পাঠান। রাজা ফার্নান্দোকে অনুরোধ করুন কাল সকালে যেন সেভিল্লার বন্দিশালা থেকে জনা পঞ্চাশেক বন্দি এখানে পাঠিয়ে দেন।
–কেন বলো তো?
–এখানে পুরনো প্রাসাদের ধ্বংসস্তূপ সরাতে হবে। ধ্বংসস্তূপ সরাতে পারলে মেঝেগুলো দেখে মোটামুটি আন্দাজ করা যাবে কোথায় কোথায় ঘর ছিল। এটা জানা খুবই দরকার।
–বেশ, লোক পাঠাচ্ছি। আলতোয়াইফ বললেন।
ঘোড়া চালিয়ে দু’জনে বারাকার জানাশুনো সরাইখানায় এলো। রাতে খেয়েদেয়ে দু’জনে শুয়ে পড়ল। ফ্রান্সিসের মাথায় অনেক চিন্তা। ও ইচ্ছে করেই সেভিল্লা থেকে বন্দি বন্ধুদের এখানে আনার ব্যবস্থা করল। এখন চিন্তা গুপ্ত ধনসম্পদ ঐ ভাঙা প্রাসাদে এ যাওয়া যাবে কিনা।
পরের দিন একটু বেলাতেই ফ্রান্সিসের ঘুম ভাঙল। দেখল বারাকার ঘুম তখনও ভাঙেনি। ফ্রান্সিস ধাক্কা দিয়ে ওকে তুলল। সরাইখানায় সকালের খাবার খেয়েও ওরা ঘোড়ায় উঠল। চল নতুন রাজপ্রাসাদের দিকে।
ফ্রান্সিস দূর থেকেই দেখল প্রাসাদের সামনের প্রান্তরে কিছু লোক বসে-দাঁড়িয়ে আছে। আর একটু এগিয়ে এসে পোশাক দেখেই ফ্রান্সিস বুঝল হ্যারিদের আনা হয়েছে। ফ্রান্সিস বারাকাকে বলল, এই বন্দিদের মধ্যে তোমার বাবা আছেন?
না। বারাকা বলল।
ফ্রান্সিস বুঝল হঠাৎহ্যারিদের সামনে হাজির হলে ওরা চমকে উঠবে। হৈ হৈকরবে। সেটা এই মুহূর্তে বিপদ ডেকে আনতে পারে। ও তাই বারাকাকে বলল, বারাকা, তুমি ঐ বন্দিদের সমানে যাও। বলবে, এদেশীয় একজন লোক নাম ফ্রান্সিস; তোমাদের কিছু কাজের কথা বলবে। তোমরা চুপ করে শুনবে।
বারাকা হ্যারিদের সামনে এসে ফ্রান্সিসদের শেখানো কথাগুলো বলল।ফ্রান্সিস ঘোড়ায় চড়ে হ্যরিদের সামনে আসার সময় বেশ জোরে ওদের দেশীয় ভাষায় বলল, মনে রাখবে তোমরা কেউ আমাকে চেনো না।
হ্যারি গলা চড়িয়ে বলল, সবাই চুপ। কোনো কথা নয়।
ফ্রান্সিস এবার বলতে লাগল, এখান থেকে কিছুদূরে কারোভা। ওখানে একটা পুরনো রাজপ্রাসাদ আছে। এখন পাথরের স্তূপ। সেই পাথরের স্তূপ সরিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। এই তোমাদের কাজ। সকালের খাবার খেয়ে আমরা করডোভা যাবো।
সকালের খাবারের ব্যবস্থা দেখছিল দলপতি। ফ্রান্সিস বারাকাকে বলল, যে কটা বেলচা জোগাড় করতে পারো, নিয়ে এসো। সকালের খাবার খেয়ে সবাই তৈরি হলো।
সকলের সামনে চলল ঘোড়ায় চড়ে দলপতি। বন্দিদের দু’পাশে প্রায় জনা দশেক অশ্বারহী সৈন্য। হঠাৎ ফ্রান্সিস হ্যারির সামনে এসে ঘোড়া থামাল। নিজে দ্রুত নেমে এসে হ্যারিকে তুলে দিল ঘোড়ার পিঠে। ফ্রান্সিস চুপ করে থাকতে বলেছে তাই হ্যারিও কোনো কথা বলল না। আস্তে আস্তে ঘোড়া চালল। ফ্রান্সিস সবার পেছনে হাঁটতে লাগল।
একটু বেলায় সবাই ভাঙা প্রাসাদের সামনে এলো। ফ্রান্সিস দলপতিকে বলল,সকলের হাতের বাঁধন খুলে দিন। নইলে পাথর সরাবে কী করে! দলপতি একজন সৈন্যকে বলল সব বন্দির হাতের বাঁধন খুলে দিতে।
ফ্রান্সিস চারদিকে নজর বোলাতে বোলাতে দেখল ভাঙা স্তূপের পরে বেশ বড়ো একটা গর্ত মতো। বোঝা গেল এখানে একটা জলাশয় ছিল। এখন শুকনো। ঐ জায়গাটা দেখিয়ে ফ্রান্সিস চিৎকার করে বলল, পাথরের আস্ত বা ভাঙা পাটাগুলো এই গর্তটায় ফেল। সবাই কাজ শুরু করো। ততক্ষণে বারাকা পাঁচটা বেলচা নিয়ে এসেছে।
সব বন্দিরা কাজে নামল। পাঁচজনকে বেলচা দেওয়া হলো। ওরা ভাঙা পাথরের টুকরো একটা জায়গায় জড়ো করতে লাগল। বাকিরা হাত লাগাল পাথরের পাটা সরাতে। ফ্রান্সিস আর বারাকাও কাজে নামল। চলল পাথর ঠোকাঠুকিরশব্দ। এলাকার কৌতূহলী লোকজন এসে ঘিরে দাঁড়াল। চারদিকে অশ্বারোহী সৈন্যরা নজর রাখতে লাগল যাতে কোনো বন্দি পালাতে না পারে।
সূর্য মাথার ওপরে। চড়া রোদের মধ্যে বন্দিরা কাজ করতে লাগল। এবার ফ্রান্সিস দলপতির কাছে এসে বলল, এদের দুপুরের খাবার তো দিতে হয়।
দলপতি বলল, আমি সব ব্যবস্থা করে এসেছি। একটু পরেই খাবার নিয়ে এখানকার কয়েদঘরের প্রহরীরা আসবে।
যাক! নিশ্চিত হলাম। ফ্রান্সিস বলল।
দলপতি এবার একটু হেসে বলল, রাজা ফার্নান্দো হুকুম দিয়েছেন গুপ্তধন উদ্ধারের ব্যাপারে তোমাকে যেন সবসময় সাহায্য করা হয়।
ভালো, তবে এতে দায়িত্বটা বেড়ে গেল। ফ্রান্সিস বলল।
একটু পরেই কয়েকজন প্রহরী খাবার নিয়ে এলো। ফ্রান্সিসের নির্দেশে বন্দিরা সবাই পাশের প্রান্তরে খেতে বসে গেল। ফ্রান্সিস, বারাকা, দলনেতা, সৈন্যরাও খেতে বসল। লম্বাটে পাতায় গোল করে কাটা রুটি, আনাজের ঝোল, পাখির মাংস খেতে দেওয়া হলো।
খাওয়াদাওয়ার পর শুরু হলো পাথর সরানো কাজ।
বিকেল হলো। ফ্রান্সিস সব ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল। ভাঙা দেয়ালের অংশ, পাথরের চৌকোলো মেঝে দেখে বুঝল ঘরগুলো কোথায় ছিল। ফ্রান্সিসের উদ্দেশ্য ছিল– রাজকোষাগার খুঁজে বের করা। দেখল অর্ধেকেরও বেশি জায়গা থেকে পাথর সরানো হয়েছে। কালকের মধ্যেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। তখন ঘরগুলোর মধ্যে দেখে আন্দাজ করা যাবে কোথায় কোথায় ঘর ছিল।
ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল, আজকের মতো এখানেই কাজ শেষ। সবাই বসে জিরিয়ে নাও।
