ফ্রান্সিস বলল, আর একটা অনুরোধ আমাদের স্বাধীন চলাফেরায় কেউ যেন বাধা না দেয়।
–বেশ, তোমাকে রাজপাঞ্জা দেওয়া হবে। রাজা বললেন।
দলপতি হ্যারিদের নিয়ে চলে গেল। ফ্রান্সিস বারাকার সঙ্গে প্রাসাদের বাইরে এলো। চলল তার বাড়ির দিকে। পথে কিছুটা যেতেই ফ্রান্সিস দেখল পেছনে ঘোড়ায় চড়ে দলনেতা আসছে। দলনেতা ফ্রান্সিসদের সামনে এসে ঘোড়া থামাল। কোমর থেকে গোলমতো একটা পিতলের চাকতি বের করে বারাকার হাতে দিল। বলল, রাজা তোমাদের এই রাজপাঞ্জা দিয়েছেন। দলনেতা ঘোড়া ছুটিয়ে চলে গেল।
খাওয়াদাওয়ার পর ফ্রান্সিস বলল, বারাকা, আমি সময় নষ্ট করতে পারবো না। এখনই কারডোভা চলো। আজকে থেকেই কাজে নামবো।
-বেশ, চলো। বারাকা বলল।
–কারডোভা কি খুববেশি দূরে। ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–তা একটু দূরে বৈকি। তবে আমাদের আস্তাবল থেকে দুটো ঘোড়া নেব।
–তাহলে তো কোনো সমস্যাই নেই। ফ্রান্সিস বলল।
বারাকা চলে গেল। কিছুক্ষণ পরেই ফিরে এসে বলল, ঘোড়া তৈরি। চলো।
বারাকাদের বাড়ির বাইরে দু’জনে এলো। দেখল একজন সহিস দুটো ঘোড়া নিয়ে এসেছে।
দু’জনে ঘোড়ায় উঠল। বারাকা আর ফ্রান্সিস চলল কারডোভার দিকে।
বিকেল নাগাদ দু’জনে কারডোভা পৌঁছল। কারডোভা একসময় রাজধানী ছিল। কাজেই রাস্তার দু’পাশে অনেক বাড়িঘর। যথেষ্ট লোকবসতি এখানে। রাস্তায় বেশ ভিড়। ফ্রান্সিস বলল, বারাকা, আমারশহরটা দেখার কোনো প্রয়োজন নেই। তুমি খলিফা ইবন আমীরের তৈরি নতুন রাজপ্রাসাদে, তারপর পুরনো রাজপ্রাসাদে নিয়ে চলো।
বারাকা প্রথমে নতুন রাজপ্রাসাদে এলো। ঘোড়া থেকে নামল দু’জনে। একটা প্রান্তরের মধ্যে পাথরের প্রাচীর ঘেরা প্রাসাদটি। প্রাচীরটার অনেক জায়গাতেই ভাঙন ধরেছে।
দু’জনে প্রধান ফটকে এলো। প্রহরীরা ওদের আটকাল। বারাকা রাজপাঞ্জা দেখাল। প্রহরীরা সরে দাঁড়াল। ভেতরে ঢুকল দুজনে। কিছুটা পাথর-বাঁধানো চত্বর পেরিয়ে প্রাসাদ। ওটা পার হতে হতে বারাকা বলল, এখানে আলতোয়াইফ থাকেন। তার সঙ্গে ই দেখা করতে হবে।
প্রাসাদে প্রবেশের দরজার কাছে দ্বারীরা পাহারায় রয়েছে। তাদের রাজপাঞ্জা দেখিয়ে বারাকা বলল, আলতোয়াইফের সঙ্গে দেখা করবো। তাকে খবর দাও।
একজন দ্বাররক্ষী প্রাসাদে ঢুকে গেল। কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসে বলল, আসুন আপনারা। সদর দরজার পরেই একটা পাথরের ঘর। ঘরের মাঝখানে শ্বেতপাথরের গোল টেবিল। আবলুশ কাঠের গদি-আঁটা চেয়ার টেবিল ঘিরে। ফ্রান্সিসরা বসল।
একটু পরেই ঢোলাহাতা দামি কাপড়ের জোব্বা পরা আলতোয়াইফ ঢুকলেন। ফ্রান্সিসরা উঠে দাঁড়াল। নিজে বসে ফ্রান্সিসদের বসতে ইঙ্গিত করলেন। ফ্রান্সিসরা বসল।
বারাকা বলল, ফ্রান্সিস, তোমার যা বলার বলল।
ফ্রান্সিস বলল, মাননীয় মহাশয়, খলিফা ইবন আবি আমীর মৃত্যুর পূর্বে তাঁর বিপুল ধনভাণ্ডারের কোনো হদিস কাউকে দিয়ে যাননি। আমরা সেই গোপন ধনভাণ্ডার খুঁজে বের করতে চেষ্টা করছি। এই প্রাসাদেইখলিফা মৃত্যুর পূর্বে ছিলেন। কাজেই এই প্রাসাদের কোথাও খলিফা কোনো চিহ্ন বা নকশা রেখে গেছেন কিনা সেটাই আমরা খুঁজে দেখতে এসেছি। এজন্যে আপনার সাহায্য চাই।
–অন্দরমহল বাদে আপনারা সারা প্রাসাদই খুঁজে দেখতে পারেন। তবে শুনেছি খলিফার ধনসম্পদ অনেকেই খুঁজেছে। কেউ হদিস করতে পারেনি। আলতোয়াইফ বললেন। তারপর উঠে দাঁড়ালেন। অন্দরের দিকে চলে গেলেন।
ফ্রান্সিস আর বারাকা এবার প্রাসাদের ঘরগুলো দেখতে লাগল। কোনো ঘরে অস্ত্রশস্ত্র রাখা, কোনো ঘরে বেশ কয়েকটা লোহার সিন্দুক রাখা। প্রায় একশো বছর আগে তৈরি প্রাসাদের বেশ কয়েকটা ঘর এখন ভাঙা পাথরের স্তূপ। সেখানে ফ্রান্সিস পাথরের স্কুপের পাথর তুলে সরাতে লাগল। বারাকাও হাত লাগাল। পাথরের স্তূপ সরিয়ে ওরা দেখল গোপন জায়গা বলে কিছু নেই।
আর একবার সব দেখেশুনে দু’জন বাইরের ঘরে এসে বসল। ফ্রান্সিস বলল, বুঝেছো বারাকা, এই প্রাসাদে গোপনীয় জায়গা বলতে কিছু পাওয়া গেল না। লোহার সিন্দুক যে ক’টা আছে সবই খোলা হয়েছে। কাঠের আলমারিগুলোও দেখা হয়েছে। এবার পুরনো প্রাসাদে চলো।
ঘোড়ায় চড়ে দু’জনে পুরনো প্রাসাদে এলো। এখন নামেই প্রাসাদ। কয়েকটা পাথরের ঘাম শুধু দাঁড়িয়ে আছে। আর সব জায়গাতেই পাথরের স্তূপ।
ঘোড়া থেকে নেমে এলো দু’জন। ফ্রান্সিস পাথরের পাটা ছড়ানো জায়গায় এদিক ওদিক লাফিয়ে লাফিয়ে গিয়ে দেখতে লাগল। বোঝা গেল ধ্বংসের হাত থেকে কোনো ঘর বাঁচেনি। স্তূপের আকারে পাথরের পাটা ছড়িয়ে থাকায় বোঝাও যাচ্ছে না কোথায় কোথায় ঘর ছিল। সেসব ঘর দেখতে গেলে আগে সব পাথরের পাটার স্কুপ সরাতে হবে। তার জন্য লোক চাই অন্তত পঞ্চাশজন। তবেই পাথরের স্তূপ সরানো সম্ভব।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হয়েছে তখন। অন্ধকারে কিছুই দেখা যাবে না। দু’জনে ঘোড়ায় উঠল। ফ্রান্সিস বলল, বারাকা, এবার রাতের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করো।
বারাকা জানাল, আমার জানাশুনো একটা সরাইখানা আছে বাজার এলাকায়। সেখানে চলো।
ফ্রান্সিস বলল, তার আগে আলতোয়াইফের সঙ্গে দেখা করে আসি চলো।
ওরা নতুন প্রাসাদে এলো। ভেতরে দ্বাররক্ষীদের একজনকে দিয়ে খবর পাঠিয়ে ফ্রান্সিসরা বাইরের ঘরে বসল। একটু পরে আলতোয়াইফ এলেন।ফ্রান্সিস বলল, মাননীয় মহাশয়, আপনার কাছে একটু সাহায্য চাই।
