–দেখি। বারাকা বলল। বারাকার বোন চলে গেল।
ফ্রান্সিস বলল, বারাকা, যা বুঝতে পারছি, তোমার বাবাকে আর আমার বন্ধুদের কাল সকালেই ফার্নান্দোর সামনে হাজির করানো হবে। ওদের কথা শোনার পরেই আমি রাজার সঙ্গে কথা বলতে চাই। সেটা কী করে হবে বুঝতে পারছি না।
বারাকা বলল, সে ব্যবস্থা করা যাবে। রাজদরবারের নাজির আমার খুবই পরিচিতি। একটা স্বর্ণমুদ্রা দিলেই সে রাজার সঙ্গে কথা বলার ব্যবস্থা করে দেবে।
–কিন্তু আমার কাছে তো স্বর্ণমুদ্রা নেই। ফ্রান্সিস বলল।
–সে আমি দেব’খন। বারাকা বলল।
–তাহলে এখুনি চলো। নাজিরকে কাল সকালে হয়তো পাবো না। ফ্রান্সিস বলল।
–চলো তাহলে। কিন্তু তার আগে কিছু খেয়ে নিই। সারাদিন তুমি না খেয়ে আছে। বলে বারাকা বোনকে ডেকে তাদের খাবার দিতে বলল।
খাওয়া শেষ করে ফ্রান্সিস বলল, আচ্ছা, বারাকা, তোমার একটা পোশাক দাও তো। দেখি আমার গায়ে ঠিক লাগে কিনা।
–বেশ তো। বারাকা আলমারি খুলে ফ্রান্সিকে ঢোলাহাতা পোশাক দিল। ফ্রান্সিস নিজের পোশাকের ওপরেই পরল সেটা। মোটামুটি লেগে গেল।
দু’জনে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। রাস্তার এখানে-ওখানে মশাল জ্বলছে। সেসবের আলো রাস্তায় যতটা পড়েছে তাই দেখে চলল দুজনে।
নাজিরের বাড়িতে এলো ওরা।নাজিরের মূর চাকর দরজা খুলে ফ্রান্সিসদের বাইরের ঘরে বসাল।
একটু পরেই নাজির এলো। নাজিরের সাদা দাড়ি-গোঁফ। মাথায় পাতলা কাপড়ের টুপিমতো। তিনি গদি-আঁটা চেয়ারে বসতেই ফ্রান্সিস বলল, আমি যাতে রাজা ফার্নান্দোর সঙ্গে কথা বলতে পারি, আপনি দয়া করে সেই ব্যবস্থাটা করে দেবেন? নাজির রাজি হলো। বারাকার স্বর্ণমুদ্রাও নিল। ফ্রান্সিসের পোশাক দেখে বুঝল ফ্রান্সিস এখানকারই লোক।
পরদিন সকালে দলপতি কয়েদখানায় এলো। হ্যারিদের বলল, তোমরা কয়েকজন এসো। বারাকার বাবাকেও আসতে বলল।
হ্যারি, মারিয়া আর বিস্কো চলল রাজপ্রাসাদের দিকে। বারাকার বাবাও চললেন। দু’পাশে দু’দল সৈন্যও চলল।
রাজদরবারে তখন অমাত্যরা বসেছেন। নাজির বিচারের ব্যাপারটা লিখবে বলে কাগজ কলম নিয়ে বসেছে। হ্যারিরা এসে দাঁড়াল।
একটু পরেই রাজা ফার্নান্দোদরবারে এলেন। নাজির প্রথমে বারাকার বাবাকে ডাকল। রাজা ফার্নান্দো বললেন, খলিফা ইবন আমীরের গোপন ধনভাণ্ডারের হদিস নিশ্চয়ই আপনাদের পরিবারের কোনো কিছুর মধ্যে আছে। আপনাদের সেভিল্লার বাড়ি তল্লাশি করতে হবে। আরো কিছু জায়গা দেখতে হবে। এখনও বন্দি থাকতে হবে।
এবার দলপতি হ্যারিদের নিয়ে এগিয়ে এলো। দলপতি মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে হ্যারিদের গুপ্তচরবৃত্তির সঙ্গে জড়িত বলে সন্দেহ প্রকাশ করল। হারির দিকে তাকিয়ে রাজা ফার্নান্দো বললেন, এই অভিযোগের উত্তরে তোমরা কী বলতে চাও বলল।
হ্যারি এগিলে এলো। মাথা একটু নুইয়ে সম্মান জানাল। বলল, মাননীয় রাজা, আমরা ক্যামেরিনাল বন্দর শহরে আমাদের জাহাজ থামিয়েছিলাম জল, খাদ্য সংগ্রহের জন্যে। শুনেছিলাম ঐ অঞ্চলের রাজা গার্সিয়া। এর বেশি আর কিছুই আমরা জানি না।
–ঠিক আছে, হুয়েনভা বন্দর শহরে লোক পাঠানোহবে। খোঁজ নেওয়া হবে আমার ভাই রাজা গার্সিয়া তোমাদের গুপ্তচরবৃত্তির জন্যে পাঠিয়েছিল কিনা। এখন কয়েদঘরে থাকতে হবে। রাজা বললেন।
এবার হ্যারি মৃদুস্বরে বলল, রাজকুমারী, আপনাকে রাজঅন্তঃপুরে রাখার কথা বলি?
মারিয়া মাথা নেড়ে বলল, না, আমি তোমাদের সঙ্গে থাকবো।
হ্যারি বলল, দোহাই, আমার ব্যবস্থাটা মেনে নিন। আপনি অসুস্থ হয়ে পড়লে আমাদের বিপদের শেষ থাকবে না। অনুরোধ করছি, যা বলছি শুনুন।
রাজা ফার্নান্দো বললেন, তোমাদের আর কিছু বলার আছে?
হ্যারি মারিয়াকে দেখিয়ে বলল, ইনি আমাদের দেশের রাজকুমারী। কয়েদঘরের কষ্টকর জীবন ইনি সহ্য করতে পারবেন না। বিনীত প্রার্থনা, রাজকুমারীকে অন্তঃপুরে রাখা হোক।
রাজা ফার্নান্দো দলপতির দিকে তাকালেন। বললেন, এই রাজকুমারীকে অন্তঃপুরে নিয়ে যাও। পরিচারিকাদের বলো এঁর থাকার ব্যবস্থা করে দিতে।
দলনেতা মারিয়ার কাছে এসে বলল, আমার সঙ্গে আসুন।
ঠিক তখনই নাজির ফ্রান্সিসকে নাম ধরে ডাকল। মারিয়া চমকে পেছন ফিরে তাকাল। হ্যারি, বিস্কোও তাকাল এদেশের পোশাক পরা ফ্রান্সিসের দিকে। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে তাদের দেশীয় ভাষায় বলল, আমাকে চেনো না, সবাই স্বাভাবিক থাকো। ভয় নেই।
রাজা ফার্নান্দো ফ্রান্সিসকে বললেন, বলো, তোমার কী বলার আছে।
ফ্রান্সিস একটু মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে বলল, মহামান্য রাজা, আমি শুনেছি যে– একশো বছর আগে খলিফা ইবন আবি আমীর এই অঞ্চলে রাজত্ব করতেন। এক যুদ্ধে যাবার সময় বা তারও আগে তাঁর বিপুল ধনসম্পত্তি তিনি যে কোথায় লুকিয়ে রাখেন তা কাউকে বলে জাননি। তার গুপ্ত ধনভাণ্ডার নিশ্চয়ই তারপর কোনো কোনো রাজা খুঁজেছিলেন। কিন্তু কেউই তার হদিস পাননি।
–হ্যা, তুমি ঠিকই শুনেছো। রাজা বললেন।
–এখন মাননীয় রাজা আমাকে যদি কিছুদিন সময় দেন তাহলে সবরকম খোঁজখবর করে আমি ঐ গুপ্ত ধনভাণ্ডার উদ্ধারের চেষ্টা করব। ফ্রান্সিস বলল।
তুমি কি জানো আমিও খোঁজখবর চালাচ্ছি? রাজা বললেন।
জানি মান্যবর রাজা। শুধু আমাকে একবার সুযোগ দিন, এই অনুরোধ।
–বেশ। রাজা ফার্নান্দো বললেন।
