–ঐ বনে। ওরা দলপতির সৈন্যদের লড়াইয়ে হারিয়ে ঐ বনেই আত্মগোপন করে আছে। এটা আমি আগে ভাবিনি। এখন ভাবছি। ফ্রান্সিস বলল।
–তোমার কী মনে হয়? তোমার বন্ধুরা ঐ বনে লুকিয়ে আছে এই সংবাদটা কি সেনাপতি পেয়েছে? বারাকা বলল।
নিশ্চয়ই পেয়েছে আর এতক্ষণে সেই বনভূমিতে তল্লাশি শুরু করেছে। বন্ধুরা ধরা পড়বেই। আমি ধরে নিয়েছিলাম ওরা লড়াইয়ে জিতেই জাহাজে ফিরে আসবে। কিন্তু ওরা তা করে নি। ফ্রান্সিস বলল।
–এটা তো বোকামির কাজ হল। বারাকা বলল।
ফ্রান্সিস মৃদু হেসে বলল-বারাকা–আমরা পরস্পরকে ভাইয়ের মতো ভালোবাসি। আমাকে না নিয়ে ওরা জাহাজে ফিরবেই না।
–তোমাদের মধ্যে এত বন্ধুপ্রীতি? বারাকা বলল। ফ্রান্সিস হাসল।
দু’জনে রাস্তার এমন একটা জায়গায় এলো যেখান থেকে ঐ বনটা দেখা যায়। সেখানে এসে দু’জনে দেখল বনের মাথায় ধোঁয়ার কুণ্ডুলি। তার মানে বনে আগুন লাগানো হয়েছে। ফ্রান্সিস অস্ফুটস্বরে বলল–কি মর্মান্তিক। তারপর দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে বলল-বারাকা তাড়াতাড়ি এসো। বারাকা গতি বাড়াল। ও ভেবে আশ্চর্য হল–সেই কাল রাত থেকে ওরা হাঁটতে শুরু করেছে। এখনও হাঁটছে। অথচ ফ্রান্সিসের এখনও কোনো ক্লান্তি নেই কোনো কষ্ট নেই। সটান হেঁটে চলেছে। শুধু ওর জোরে জোরে শ্বাস পড়ছে।
দু’জনে দূর থেকে দেখল সেই জ্বলন্ত বনটা ঘিরে রাজা ফার্নান্দোর সৈন্যরা দাঁড়িয়ে আছে। কিছু অশ্বারোহী সৈন্যও রয়েছে। সেনানায়ক ঘোড়ায় চড়ে বনের আগুনের খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছে।
আশেপাশের গ্রাম থেকেও লোকজন আগুন দেখতে এসেছে। তারা গোল হয়ে সৈন্যদের কাছেই দাঁড়িয়ে আছে। ফ্রান্সিস আর বারাকা তাদের সঙ্গে মিশেদাঁড়িয়ে রইল।
আগুন উঁচুতে উঠল। কাঁচা গাছগাছালি লতাপাতা ঝোঁপ পুড়ছে। জোর চট চট শব্দ উঠেছে। শুকনো বন নয়। তাই আগুন খুব একটা তেজি আগুন নয়।
বিছুক্ষণ সময় গেল। ফ্রান্সিস এতক্ষণ একটা কথাও বলেনি। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল আগুনের দিকে।
হঠাৎ বারাকা লক্ষ্য করল–ফ্রান্সিসের দু’চোখ জলে ভিজে উঠেছে। ফ্রান্সিস জামার হাতা দিয়ে দু’চোখ মুছল। অঞরুদ্ধস্বরে বলল–যদি আমার একজন বন্ধুও পুড়ে মরে তবে আমি প্রতিজ্ঞা করছি প্রথমে সেনাপতিকে আর পরে রাজা ফার্নান্দোকে আমি হত্যা করবো। তাতে যদি আমার জীবন যায়–পরোয়া নেই।
আস্তে আস্তে আগুনের তেজ কমে আসতে লাগল। গাঢ় ধোঁয়া উঠতে লাগল আকাশের দিকে।
বেশ কিছুক্ষণ পরে আগুন নিভু নিভু হল। এখানে-ওখানে তখনও আগুন। ধোঁয়া উঠছে।
তখনই ফ্রান্সিসের চোখে পড়ল টিলাটা। টিলাটার গায়ে আগুনের কালচে দাগ। ফ্রান্সিস তখন পায়চারি করতে লাগল। আগুন আরও নিভে যাওয়ার জন্যে অপেক্ষা করতে হবে। এখনও ঐ ছাইচাপা আগুন পার হয়ে দেখতে যাওয়া যাবে না।
তখনই ফ্রান্সিস দেখল হ্যারি টিলাটার সামনে এসে দাঁড়াল। পেছনেশাঙ্কো মারিয়াকে ধরে ধরে একটা পাথরের চাঙ-এর ওপর বসাল। হ্যারি দু’হাত ওপরে তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গী করল।
ফ্রান্সিস জীবিত মারিয়া হ্যারিদের দেখে চিৎকার করে উঠল–ও-হো-হো। সেই ধ্বনি অবশ্য হ্যারিরা শুনতে পেল না।
ফ্রান্সিস বারাকাকে বলল–চলো–মাঠটায় বসি।
দু’জনে এসে মাঠটায় বসলো।
তখন সন্ধে হয়েছে। চারদিকে সৈন্যরা মশাল জ্বালল।
হ্যারিরা পোড়া বনের ছাইয়ের ওপর দিয়ে সাবধানে এলো। আত্মসমর্পণ করল।
সেনাপতির নির্দেশে হ্যারিদের দু’পাশে ঘিরে নিয়ে সবাই চলল সেভিল্লার দিকে।
অন্ধকারে পেছনে পেছনে ফ্রান্সিস আর বারাকাও চলল।
সেভিল্লা নগর পৌঁছল সবাই।
হ্যারিদের কয়েদঘরে বন্দি করে রাখা হল।
ফ্রান্সিসরা অন্ধকারে মাঠে বসে রইল।
রাত বাড়ল।
হ্যারিদের যখন খেতে দেওয়া হল তখন ফ্রান্সিস বলল-বারাকা এবার তোমাদের বাড়িতে নিয়ে চলো।
চলো। বারাকা বলল। দু’জনে রাস্তায় এলো। চলল পুবমুখো।
দু’জনে যখন বারাকার বাড়িতে পৌঁছল, অন্ধকারের মধ্যেও দেখে ফ্রান্সিস বুঝল বাড়িটা বেশ বড়ো। কাঠ আর পাথরে তৈরি। কাঠের দরজাটার সামনে এসে বারাকা দাঁড়াল। তারপর দরজায় আঙুল ঠকে শব্দ করল। একটু পরেই দরজা খুলে গেল। বড়ো জ্বলন্ত মোমবাতি হাতে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটির মুখেচোখে স্পষ্ট দুশ্চিন্তার ছাপ। বারাকাকে দেখে ও বলে উঠল, দাদা, বাবা ছাড়া পেল না?
না। বারাকা দরজা পার হয়ে বলল, ফ্রান্সিস, এসো।
ফ্রান্সিসকে নিয়ে বারাকা ভেতরের ঘরে এলো। দেখল এক শুভ্রশয্যায় একজন ভদ্রমহিলা বসে আছে। বারাকা বলল, মা, বাবাকে এই সেভিল্লায় আনা হয়েছে।
–তাহলে এই বাড়িটাও তল্লাশি করা হবে। মা বললেন।
–হ্যাঁ। এসব তল্লাশি খোঁজখবরের পর হয়তো রাজা ফার্নান্দো বাবাকে মুক্তি দেবেন। বারাকা বলল।
–হ্যাঁ, এখন শুধু অপেক্ষা করে থাকা। মা বললেন।
ফ্রান্সিসকে দেখিয়ে বারাকা বলল, মা, এর নাম ফ্রান্সিস। আমার বন্ধু। মা একটু শুকনো হাসি হেসে ফ্রান্সিসের দিকে তাকালেন।ফ্রান্সিস মাথা ঝাঁকিয়ে হাসল। মা বললে, আমার যা মনের অবস্থা, মানে, তোমার সঙ্গে কথা বল মানে–
ঠিক আছে, ফ্রান্সিস বলে উঠল, পরে কথা হবে।
দু’জনে বারাকার ঘরে এলো। বারাকা একটা আবলুশ কাঠের গদিওয়ালা চেয়ার দেখিয়ে বলল, বসো। তখনই বারাকার বোন মোমবাতি হাতে ঘরে ঢুকল। একটা ছ’ কোণা টেবিলের ওপর রুপোর বাতিদানে মোমবাতিটা রেখে বলল, দাদা, বাবার মুক্তির ব্যবস্থা কী করবি?
