–উপায় নেই। বন্ধুরা কোথায় আছে কেমন আছে এটা না জানা পর্যন্ত আমার স্বস্তি নেই। ফ্রান্সিস বলল।
–তুমি বন্ধুদের জন্যে খুব ভাবো তাই না? বারাকা বলল।
বন্ধুরাও আমার জন্যে ভাবে। ফ্রান্সিস বলল। বারাকা উঠে দাঁড়াল। বলল– চলো তাহলে।
দু’জন সদর রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগল। বেশ রাত হয়েছে। রাস্তাঘাট নির্জন।
একসময় ফ্রান্সিস বলল-বারাকা–তোমার নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে। তুমি এখানে খেয়ে নিতে পারো।
না। বারাকা মাথা নেড়ে বলল–তুমি তোমার বন্ধুরা যখন খাবে আমিও তখন খাবো।
নগর ছাড়িয়ে দু’জনে চলল সেই বনভূমির দিকে।
প্রায় ঘণ্টা দেড়েক হাঁটার পর দু’জন সেই বনভূমির কাছে এলো।
অন্ধকারে যতটা দেখল তাতে বুঝল বন্ধুরা এখানে নেই। তবে ওরা গেল কোথায়?
হঠাৎই গোঙানি শুনল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়ল। গোঙানির শব্দটা যেদিক থেকে আসছিল ফ্রান্সিস অন্ধকারে সেইদিকে চলল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফ্রান্সিস দেখল অন্ধকারে কে ঘাসের ওপর শুয়ে আছে। ফ্রান্সিস কাছে গেল। এবার অন্ধকারে দেখে ও বুঝল লোকটি রাজা ফার্নান্দোর সৈন্য।
ফ্রান্সিস মাটিতে বসল। সৈন্যটিকে জিজ্ঞেস করল–কী ব্যাপার ভাই? তুমি আহত হয়েছ। এখানে কি লড়াই হয়েছে? সৈন্যটি জিজ্ঞেস করল–তুমি কে?
–আমি ভাইকিং। আমার বন্ধুদেরই তোমরা বন্দি করে নিয়ে যাচ্ছিলে। তারা কোথায়? তাদের কী হয়েছে? তোমরা কি আমার নিরস্ত্র বন্ধুদের মেরে ফেলেছো? সৈন্যটি মাথা নেড়ে বলল-না। তোমার বন্ধুরাই দলপতিকে হত্যা করে আমাদের আহত করে গেছে। শুধু একজন সৈন্যই পালিয়ে যেতে পেরেছিল।
–আমার বন্ধুরা কোথায়?
সৈন্যটি বলল–তা জানি না। অন্ধকারে কিছুই চোখে পড়েনি।
–ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। বলল–তাহলে তোমাদের মধ্যে যে সৈন্যটি পালাতে পেরেছিল সে নিশ্চয়ই সেনাপতিকে এই সংবাদ দেবে। সেনাপতিও সৈন্য নিয়ে আমাদের বন্ধুদের খুঁজতে আসবে।
–আর এসে কী হবে? সবাই পালিয়ে গেছে। সৈন্যটি বলল।
—-কোনদিকে পালালো?
কাঁধে তলোয়ারের ঘা লেগেছে। এই অবস্থায় আমি আমার কথাই ভাবছি কতক্ষণে ওষুধ পড়বে–আমি অসহ্য যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবো। আর কারো কথা ভাবি নি। সৈন্যটি বলল।
ফ্রান্সিস বলল-বারাকা–বন্ধুরা নিশ্চয়ই হুয়েনভা বন্দরে আমাদের জাহাজে চলে গেছে। আমার ফেরার জন্যে ওরা নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছে। চলো আমাদের হুয়েনভা বন্দরে যেতে হবে।
–বেশ–চলো। আবার সেই হেঁটে। আমি তো তবু কিছু খেয়েছি পেটপুরে, জলও খেয়েছি। তুমি তো নির্জলা উপোসী। পারবে হেঁটে যেতে। বারাকা বলল।
নিশ্চয়ই পারবো। পারতেই হবে। ফ্রান্সিস বলল।
–তুমি বন্ধুদের খুব ভালোবাসো–তাই না? বারাকা বলল।
–হ্যাঁ–প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি। ওরাও আমাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে। ফ্রান্সিস বলল।
এবার দু’জনে চলল হুয়েভা বন্দরের দিকে। যখন ওরা হুয়েভা বন্দরে পৌঁছল তখন ভোর হল। ফ্রান্সিসের চোখে রোদ পড়তে চোখ দুটো জ্বালা করে উঠল। রোদ ছড়াল চারদিকে।
ফ্রান্সিস বেশছুটেই ওদের জাহাজের কাছে এলো। ও হাঁপাচ্ছে তখন। জাহাজ জনশূন্য। কেউ কোথাও নেই। তার মানে বন্ধুরা জাহাজে ফেরে নি। তবে কোথায় গেল ওরা?
জাহাজের মাস্তুলের আড়াল থেকে কে যেন মুখ বাড়াল। তাহলে একজন তো আছে। বন্ধুটি মাস্তুলের আড়াল থেকে আবার মুখ বের করল। আরে! এ তো ভেন।
ফ্রান্সিস বারাকাকে ডাকল–চলোজাহাজে উঠবো। দু’জনে পাতা কাঠের পাটাতনের ওপর দিয়ে জাহাজে উঠল।
ভেন মাস্তুলের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো। ফ্রান্সিস ভেনকে জড়িয়ে ধরলো। বলল–ভেন–তোমার খোঁজ রাজা ফার্নান্দোর সৈন্যরা পায় নি।
–আমি আটা ময়দার বস্তার পেছনে লুকিয়েছিলাম। আমাকে তাই ধরতে পারে নি। ভেন হেসে বলল। ওরা ডেক-এ বসল।
এবার ফ্রান্সিস ভেনকে সব ঘটনা বলল। শেষে বলল–এখনও বন্ধুদের কোনো খোঁজ পেলাম না। এবার সেই বনের ধারে যেতে হবে। বনেও ঢুকতে হবে। হয়তো হ্যারিরা বনে আশ্রয় নিয়েছে।
–ঠিক আছে। তাই যাও। তার আগে উপোস তুমি কিছু খেয়ে যাও। ভেন বলল।
–অসম্ভব। বন্ধুরা মারিয়া কেউ খায় নি এখনও। ফ্রান্সিস বলল।
–ফ্রান্সিস–আমি একজন চিকিৎসক। আমি বলছি–এই উপোসে থাকা আর এইসব দুশ্চিন্তা তোমার দেহের ক্ষতিই করবে। তুমি এতে অসুস্থ হয়ে পড়বে। তুমি অসুস্থ হলে আমরা দিশেহারা হয়ে যাবো। একটু থেমে ভেন বলল–ফ্রান্সিসকথা শোনো। তোমাকে সুস্থ থাকতেই হবে। খেতে এসো। আমার খাবার তৈরিই আছে। তোমরা খাবে এসো।
তিনজনেই খাবার ঘরে এলো। ভেন দু’জনকে কাঠের থালা গ্লাস দিল। খাবার দিল। জল দিল। ফ্রান্সিস পরপর তিন গ্লাস জল খেল।
ফ্রান্সিস হেসে বলল–ভেন–এতক্ষণে আমি বুঝতে পারছি আমি কতখানি তৃষ্ণার্ত আর ক্ষুধার্ত। ভেন বলল–ফ্রান্সিস–আমরা সবাই তোমার নির্দেশেই চলি। সেই তোমাকে এখন সুস্থ সবল থাকতে হবে।নাও খেতে শুরু করো। মোটা রুটি আর মাংসের ঝোল। ফ্রান্সিস হাপুস হাপুস্ খেতে লাগল। বারাকাও সমান আগ্রহে খেতে লাগল।
খাওয়া শেষ হল। ফ্রান্সিস বলল–তোমার খাবার আমাদের দিলে।
–তাতে কি? আমি বেঁধে নেব। ভেন বলল–তোমাকে এই বিপদের সময় সুস্থ থাকতে হবে সবল থাকতে হবে।
তিনজনে জাহাজের ডেক-এ উঠে এলো। তারপর পাতা পাটাতনের ওপর দিয়ে হেঁটে তীরে উঠল।
এবার দু’জনে হাঁটতে হাঁটতে চলল সেভিল্লার দিকে। একসময় বারাকা বলল তোমার বন্ধুরা কোথায় আছে বলে তোমার ধারণা।
