একটু পরে হ্যারি চোখ মেলে তাকাল। গোঙানির শব্দ বন্ধ হল। মারিয়া ঝুঁকে পড়ে বলল–হ্যারি এখন কেমন লাগছে?
হ্যারি অল্প হাসল। আস্তে বলল–ভালো লাগছে। মারিয়া ও অন্য বন্ধুরা এতক্ষণে হাসল।
শাঙ্কো বিছানায় উঠে দাঁড়িয়ে বলল–ভাইসব–সারাদিন আমরা কিছু খাই নি। ক্ষুধায় আমাদের শরীর টলছে। রাতের খাবার আমরা এখুনি খাবো। ভাইকিং বন্ধুরা হৈ হৈ করে শাঙ্কোর কথা সমর্থন করল।
এবার শাঙ্কো লোহার দরজার কাছে এলো। দেখল এখন চারজন পাহারাদার পাহারা দিচ্ছে। সেই থুতনিতে দাড়িওয়ালা পাহারাদারটিও আছে। শাঙ্কো তাকেই বলল–ও ভাই–আমাদের খিদে পেয়েছে। খেতে দাও। দাড়িওয়ালা পাহারাদারটি কথাটা কানেই তুলল না। শাঙ্কো আবার বলল। পাহারাদারটি কোনো কথাই বলল না।
ততক্ষণে কয়েকজন ভাইকিং উঠে এসে শাঙ্কোর পাশে দাঁড়িয়েছে। তাদের মধ্যে ছিল নজরদার পেড্রো। পেড্রো বন্ধুদের পেছনে লাগতে ওস্তাদ। পেড্রো দেখল ব্যাপারটা। ও প্রচণ্ড জোরে চেঁচিয়ে বলল–এই ছাগলদাড়ি। চিৎকার শুনে পাহারাদার দু’জন, দাঁড়িয়ে পড়ল। আরো কয়েকজন ভাইকিং দরজার কাছে এলো।
দাড়িওয়ালা পাহারাদারটি তলোয়ার উঁচিয়ে ছুটে এলো। নাকিসুরে বলল–কেঁ? কেঁ বলেছে কথাটা? পেড্রো এগিয়ে এসে নাকিসুরে বলল–আমি–আমি বলেছি কথাটা।
পাহারাদারটি একবার সঙ্গীদের দিকে আর একবার পেড্রোর দিকে তাকাতে লাগল। কী করবে বুঝে উঠতে পারল না।
এবার পেড্রো নাকিসুরে বলল–এই ব্যাটা ছাঁগলদাঁড়ি খেতে দে তাড়াতাড়ি।
এবার ভাইকিংরা কয়েকজন পেড্রোর সঙ্গে গলা মেলাল–এই ব্যাটা ছাগলদাঁড়ি– খেতে পেঁ তাড়াতাড়ি। আস্তে আস্তে সব ভাইকিংরা দরজায় এসে ভিড় করল। সমস্বরে বলতে লাগল–এই বাঁচা ছাগরদাঁড়ি-ঘেঁতে দে তাড়াতাড়ি।
এবারে দাড়িওয়ালা পাহারাদারটি বলল–দাঁড়াও–দেখাচ্ছি মজা। ও সিঁড়ি দিয়ে নেমে ছুটল। ভাইকিংরাও চুপ করল।
কিছু পরে দেখা গেল সেনাপতি আসছে। সঙ্গে সেই পাহারাদার।
ওরা লোহার দরজার সামনে এলো।
সেনাপতি বলল–আমাদের প্রহরীকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করছো কেন?
–খিদের জ্বালায়। শাঙ্কো বলল।
তার মানে? সেনাপতি বলল।
হুয়েনভা থেকে এই সেভিল্লায় হাত বাঁধা অবস্থায় আমাদের হটিয়ে আনা হয়েছে। আমরা তৃষ্ণার্ত ক্ষুধার্ত। এখানে খাবার জল পেয়েছি। কিন্তু এখনও খাবার পাই নি। আপনার প্রহরীকে এই কথা বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ও আমাদের কথা কানেও তুলল না। বিস্কো বলল।
সেনাপতি একটু ভাবল। তারপর বলল–তোমাদের রাতের খাবার এখনই দেওয়া হবে। কোনোরকম গোলমাল পাকালে চাবুক খেতে হবে। মনে থাকে যেন।
সেনাপতি দরজার কাছ থেকে সরে গেল। তারপর সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল। দলপতি চলল তার পেছনে পেছনে। ভাইকিংরাও গিয়ে বিছানায় বসল। কেউ কেউ শুয়ে পড়ল।
দাড়িওয়ালা পাহারাদারের জায়গায় অন্য এক পাহারাদারকে দেখা গেল।
সেনাপতির হুকুমেই বোধহয় হ্যারিদের তাড়াতাড়ি খেতে দেওয়া হল। খাবার খেয়ে হ্যারিরা শুয়ে বসে বিশ্রাম করতে লাগল।
ওদিকে ফ্রান্সিস আর বারাকা গাছের আড়াল থেকে হ্যারিদের দেখছিল। হ্যারিরা তখন বনের পাশের ঘাস-ঢাকা প্রান্তরে শুয়ে বসে বিশ্রাম করছিল।
বারাকা বলল–এখন এখানে থেকে কোনো লাভ নেই। তোমার বন্ধুদের এখন মুক্ত করা যাবে না। তাই বলছিলাম চলো আমরা সেভিল্লা নগরে চলে যাই। ওখানে কয়েদঘরের কাছে গিয়ে অপেক্ষা করি। দলপতি নিশ্চয়ই ওদের কয়েদঘরে বন্দি করে রাখবে। ফ্রান্সিসও ভেবে দেখলো এখন কিছুতেই বন্ধুদের মারিয়াকে মুক্ত করা যাবে না। বরং সেভিল্লা নগরে গিয়ে কয়েদঘরের কাছে অপেক্ষা করা ভালো। কয়েদঘরের পাহারাদারদের পাহারা দেওয়ার নিয়ম জানা যাবে হ্যারিদের কীভাবে মুক্ত করা যায় তাও ভেবে ঠিক করা যাবে। ফ্রান্সিস বলল–চল–আমরা আগেই চলে যাই।
ফ্রান্সিস আর বারাকা গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে চলল সেভিল্লা নগরের দিকে।
সেভিল্লা নগরে যখন এসে পৌঁছল তখন সন্ধে হয়েছে। সদর রাস্তায় কোথাও কোথাও মশাল জ্বলছে। বাড়িঘরদোরে মোমবাতির আলো।
বারাকা কয়েদঘরের কাছে ফ্রান্সিসকে নিয়ে এলো। কয়েদঘরের দরজায় দুটো মশাল জ্বলছে। দু’জন সশস্ত্র পাহারাদার খোলা তলোয়ার হাতে পাহারা দিচ্ছে।
ফ্রান্সিস কয়েদঘরের সামনে মাঠটায় বসল। বারাকাও ওর পাশে বসল।
সময় বয়ে চলল। কিন্তু হ্যারিদের দেখা নেই।
বারাকা বলল–চলো তোমার বন্ধুদের আসার আগে আমরা কিছু খেয়ে আসি গে। ফ্রান্সিস হেসে মাথা নাড়ল। বলল–বন্ধুরা এখনও উপবাসী। আমি কী করে খাবো? ওরা আসুক–এখানে খাবার খা জলটল খা–তবেই আমি খেতে যাবো।
বারাকা একটু আশ্চর্যই হল। বলল–তোমার বন্ধুদের সঙ্গে তুমিও উপোস করে থাকবে?
–হ্যাঁ–আমি এখন কিছু খাব না। তুমি খেয়ে এসো। ফ্রান্সিস বলল। বারাকা কী ভাবল। বলল–না তোমার বন্ধুরা না খাওয়া পর্যন্ত আমিও কিছু খাবো না।
দু’জনে মাঠটায় বসে রইল।
রাত বাড়তে লাগল। বন্ধুদের দেখা নেই।
একসময়ে ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। বলল-বারাকা এখানে বসে থেকে বন্ধুদের খোঁজ পাওয়া যাবে না। আমাদের সেই বনের কাছে যেতে হবে। ঐ বনের ধারেই বন্ধুরা বিশ্রাম করছিল।
–বেশ চলো। কিন্তু কিছুক্ষণ আগে হুয়েনভা থেকে হেঁটে এখানে এসেছি। আবার হাঁটবে? বারাকা বলল।
