রাত হলো। ফ্রান্সিস তখনও বসে আছে। তাকিয়ে আছে ওদেরজাহাজের দিকে। জাহাজের কাঁচটাকা আলোয় দেখল হ্যারিদের সারি দিয়ে দাঁড় করানো হলো। তারপর হ্যারিরা হাত বাঁধা অবস্থায় জাহাজ থেকে নেমে এলো। সামনে-পেছনে রাজা ফার্নান্দোর সৈন্যরা।
ফ্রান্সিস পাথরটা থেকে উঠে দাঁড়াল। চলল বড়ো রাস্তার দিকে। ঝোঁপঝাড়। গাছগাছালি বাড়িঘর পার হয়ে সদর রাস্তায় এলো। রাস্তায় এখানে-ওখানে মশাল জ্বলছে। তারই আলোয় দেখল হ্যারিরা চলেছে। দেখল মারিয়ার হাত দড়ি দিয়ে বাঁধা নয়। ফ্রান্সিস এই ভেবে আশ্বস্ত হলো যে মারিয়ার বেশি কষ্ট হবে না।
ফ্রান্সিস হ্যারিদের পেছনে কিছু দূরে থেকে হাঁটতে লাগল। হ্যারিদের কয়েদঘরে ঢোকানো পর্যন্ত সবই ফ্রান্সিস দেখল। এবার চিন্তা কী করে বন্ধুদের মুক্ত করা যায়।
এখন তো কিছু করার নেই। ফ্রান্সিস বেশ দুর্বল বোধ করতে লাগল। সারাদিন কিছুই খাওয়া হয়নি।
ফ্রান্সিস জাহাজঘাটার দিকে চলল। জাহাজঘাটায় পৌঁছে দেখল ওদের জাহাজটায় আলো জ্বালা হয়নি। ও খুব সাবধানে অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে জাহাজের ডেক-এ উঠে এলো। আশপাশের জাহাজগুলো থেকে আলো পড়েছে ওদের জাহাজে। সেই সামান্য আলোতে দেখল ডেক-এ কোনো পাহারাদার সৈন্য নেই। ফ্রান্সিস হাঁফ ছাড়ল। ও নিজের কেবিনঘরে নেমে এলো। ভেজা পোশাক পালটাল। তারপর রসুইঘরে এলো।
রসুইঘরের টেবিলে ঢাকনা দেওয়া পাত্রগুলোর ঢাকনা খুলে দেখতে লাগল ফ্রান্সিস। মশলা নুন এসব রাখা। হঠাৎ দেখল টেবিলের ধারে রাখা একটা ঢাকা দেওয়া বড়ো পাত্র। ফ্রান্সিস ঢাকনা খুলল। দেখল রুটি মাংস আলুভাজা পরিপাটি রাখা। রাঁধুনি ভাইকিং বন্ধুটি জানতো ফ্রান্সিস পালিয়েছে। ফ্রান্সিস অভুক্ত থাকবে। এই জাহাজে ও নিশ্চয়ই আসবে। তাই রাঁধুনি বন্ধুটি সব খাবার সাজিয়ে রেখে গেছে। একে ক্ষুধার্ত, সামনেই খাবার আর রাঁধুনি বন্ধুটির ভালোবাসা–ফ্রান্সিস আবেগে চোখ বুজল। মনে মনে গভীর ভালোবাসা জানাল বন্ধুটিকে। তারপর খেতে বসল। গোগ্রাসে খেতে লাগল সে। খিদে যা পেয়েছে!
.
ভোর হলো। হ্যারির ঘুম ভেঙে গেল। ও উঠে বসল। দেখল বন্ধুরাও কেউ কেউ ঘুম ভেঙে উঠে বসেছে। মারিয়া তখনও ঘুমোচ্ছে। হ্যারি মারিয়ার ঘুম ভাঙাল না। ভালোমতো ঘুম আর বিশ্রাম রাজকুমারীর এখন অবশ্য প্রয়োজন।
বেলা হলো। ঢং ঢঙাস্ শব্দে কয়েদঘরের লোহার দরজা খুলে গেল। সকালের খাবার নিয়ে ঢুকল পাহারাদার সৈন্যরা। বন্দিদের হাতে বাঁধা দড়ি খুলে দেওয়া হলো। লম্বাটে সবুজ পাতায় গোল করে কাটা রুটি, আনাজের তরকারি আর মাংসের ঝোল। হ্যারি একটু অবাকই হলো–সকালের খাবারে এত কিছু! হ্যারিরা খাচ্ছে তখনই শুনল একজন পাহারাদার সৈন্য বলল, একটু পরেই তোমাদের সেভিল্লো নিয়ে যাওয়া হবে। পথে তেমন খাবার নাও জুটতে পারে। কাজেই যতটা পারো পেট পুরে খেয়ে নাও।
একটু বেলা হতেই ঢং ঢং শব্দে কয়েদঘরের দরজা খুলে গেল। দলনেতা ভেতরে ঢুকল। গলা চড়িয়ে বলল, সবাই বেরিয়ে এসো। সবাইকে হেঁটে সেভিল্লা যেতে হবে। বাইরে গিয়ে সারি দিয়ে দাঁড়াও।
হ্যারি বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল, চলো সবাই।
দু’জন ভাইকিং বন্ধু ঘাড় নাড়ল। একজন বলল, এখান থেকে আমরা যাবো না। এখানেই থাকবো। ফ্রান্সিস এখানে আছে। ওর সাহায্যেই আমরা মুক্ত হবো।
হ্যারি বলল, জেনো, ফ্রান্সিস সবসময় আমাদের সঙ্গে সঙ্গে আছে। এখনই বাইরে গেলে দেখবে ফ্রান্সিস বড়ো রাস্তায় আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে। সেভিল্লো যাওয়ার পথে ফ্রান্সিস আত্মগোপন করে ঠিক আমাদের সঙ্গে সঙ্গে থাকবে। হ্যারি থামল। পরে বলল, ফ্রান্সিস বলে গেছে আমরা যেন দলনেতার কথামতো চলি। এখন দলনেতার কথামতো সেভিল্লো যেতেই হবে। তার কথা না মানলে আমরাই বিপদে পড়বো।
সব বন্দি বাইরে এলো। সার বেঁধে দাঁড়াল। দেখা গেল চারটে ঘোড়া আনা হয়েছে। হাতের খোলা তলোয়ার কোষবদ্ধ করে দলনেতা একটা ঘোড়ার পিঠে উঠে বসল। তিনজন সৈন্য বাকি তিনটে ঘোড়ায় উঠে বসল। দলনেতা তার সৈন্যদের দিকে তাকিয়ে বলল, আমরা চারজন এই গুপ্তচরদের পাহারা দিয়ে সেভিল্লো নিয়ে যাচ্ছি। তোমরা হুয়েনভা বন্দরে খুঁজে বের করো রাজা গার্সিয়ার গুপ্তচরদের। ধরতে পারলেই কয়েদঘরে বন্দি করে রাখবে। আমি ফিরে এসে যা করার করবো।
দলনেতা ঘোড়া চালিয়ে একটু এগিয়ে গেল। তারপর হ্যারিদের দিকে তাকিয়ে বলল, আমার পেছনে পেছনে এসো। হ্যারিরা এগিয়ে এলো। তখনই তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে হ্যারিদের দেখতে দেখতে দলনেতা বলল, তোমাদের মধ্যে একজন আমার সঙ্গে কথা বলেছিল। কথা শুনে আমার মনে হয়েছিল সে-ই তোমাদের নেতা। তাকে তো দেখছি না।
হ্যারি বলল, আমরা সবাই তো আছি। আপনি কার কথা বলছেন বুঝতে পারছি না।
দলপতি মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, সে নিশ্চয়ই চালাকি করে আমাদের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়েছে। চিন্তা নেই–আমরা ঠিক খুঁজে বের করবো। এবার চলো সবাই।
দলনেতা ঘোড়া চালাল। হ্যারিরা পেছনে পেছনে চলল। সবার পেছনে চলল তিনটি ঘোড়ায় তিনজন সৈন্য।
হুয়েনভা বন্দর শহর ছাড়িয়ে হ্যারিরা একটা টানা রাস্তায় পড়ল। বালি আর পাথরের টুকরো ছড়ানো রাস্তাটা বেশ চওড়া। এই রাস্তাটাই বোধহয় সেভিল্লা গেছে।
