বেলা বাড়তে লাগল। রোদের তেজও বাড়তে লাগল। হ্যারিদের সবচেয়ে কষ্ট দিতে লাগল মাঝেমধ্যে ছুটে আসা জোর বাতাস। সঙ্গে ধুলোবালি উড়ে এসে গায়ে মাথায় পড়ছে। এজন্যে ওদের চোখ-মুখ হাত দিয়ে ঢাকতে হচ্ছে। দাঁড়িয়ে পড়তে হচ্ছে। এভাবেই হ্যারিদের হাঁটতে হচ্ছে সেভিল্লার দিকে।
বেলা বাড়তে লাগল। রোদের তেজও বাড়তে লাগল। হ্যারিরা কাহিল হয়ে পড়ল। সেই সকালে খেয়েছে। তারপর এখনো পর্যন্ত একফেঁটা জলও খেতে পায়নি। সবচেয়ে কষ্ট হতে লাগল মারিয়ার। দু’হাত খোলা থাকলে কি হবে, এতক্ষণ হাঁটা, রোদের তেজ, ধুলো ওড়ানো দমকা হাওয়া–এত সব মারিয়া সহ্য করতে পারছিল না। বেশ দুর্বল পায়ে সে হাঁটছিল। হ্যারি মারিয়ার কষ্ট বুঝতে পারল। কিন্তু মারিয়াকে কী বলবে বুঝে উঠতে পারল না। হ্যারি ভাবল, এক পাত্র জল খেতে পেলে মারিয়া আর বন্ধুদের কষ্ট একটু কমবে। সে দ্রুতপায়ে হেঁটে দলনেতার কাছে এলো। বলল, আমাদের জলতৃষ্ণা পেয়েছে, জলের ব্যবস্থা করুন।
দলনেতা বলল, আর কিছুক্ষণ হাঁটলেই একটা গ্রাম পাওয়া যাবে। সেখানে ইঁদারা আছে। পেটভরে জল খেও।
হ্যারি কিছু বলল না। ফিরে এলো বন্ধুদের কাছে। গলা চড়িয়ে বলল, ভাইসব, সামনেই একটা গ্রামে ইঁদারা আছে। জল পাওয়া যাবে।
হ্যারিরা হাঁটতে লাগল। হাঁটার গতি অনেকটা কমে গেছে। হ্যারি মারিয়াকে বলল, রাজকুমারী, আপনার খুব কষ্ট হচ্ছে বুঝতে পারছি।
মারিয়া হেসে বলল, ফ্রান্সিসও কি কম কষ্ট সহ্য করছে! ওর কথা ভেবেই আমি সব কষ্ট সহ্য করছি।
কিছুটা এগিয়েই একটা গ্রাম পাওয়া গেল। পাথর আর কাঠ দিয়ে তৈরি ঘরদোর। পাঁচ-সাতটা বাড়ি নিয়ে গ্রাম। দলনেতার নির্দেশে হ্যারিরা গ্রামে ঢুকল। গ্রামটার মাঝামাঝি জায়গায় একটা বড়ো ইঁদারা। গ্রামের বৌ-ঝিরা দড়ি বাঁধা কাঠের পাত্র ডুবিয়ে জল তুলছে। হ্যারিদের দেখে ওরা সরে দাঁড়াল। বিস্কো হাঁদারার ধারে গেল। কিন্তু দু’হাত তো বাঁধা। জল তুলবে কী করে! মারিয়া এগিয়ে এলো। কাঠের পাত্র ইঁদারায় ডুবিয়ে জল তুলতে লাগল। তৃষ্ণার্ত ভাইকিংরা দু’হাত পেতে অঞ্জলির মতো জল ধরে খেতে লাগল। গায়ে-মাথায় জল ছিটোতে লাগল। সাত-আট পাত্র জল তুলতেই মারিয়া হাঁপাতে লাগল। কয়েকজন ভাইকিং বাঁধা দু’হাত তুলে দলপতিকে বলল, আমাদের হাত খুলে দিন। রাজকুমারী একা সবাইকে জল খাওয়াতে পারবেন না। দলপতি দু’জন সৈন্যকে ইঙ্গিত করল। সৈন্য দুজন ঘোড়া থেকে নেমে দারার ধারে এলো। কাঠের পাত্রে জল তুলে ভাইকিংদের জল খাওয়াল। নিজেরাও খেল।
আবার পথ চলা শুরু হলো। ছোটো ছোটো নুড়িপাথর আর ধুলোভর্তি রাস্তা। মাঝে মাঝেই দমকা হাওয়া বইতে লাগল। ধুলো উড়তে লাগল। হ্যারিদের তখন হাত দিয়ে চোখ ঢাকতে হচ্ছে। দাঁড়িয়ে পড়তে হচ্ছে। হ্যারিদের মাঝে মাঝেই এরকম দাঁড়িয়ে পড়তে হচ্ছে বলেই চলার গতি কমে যাচ্ছে। এভাবেই চলল হ্যারিরা।
হ্যারিরা একটা জায়গায় এলো। বাঁ দিকে ঝুঁকে পড়া পাথরের চাঁই, ডান দিকে সবুজ ঘাসে-ঢাকা উপত্যকা মতো। হ্যারিরা কিছু বোঝবার আগেই একজন ভাইকিং বন্ধু চিৎকার করে বলে উঠল, আমি দেশে ফিরে যাচ্ছি। কথাটা শেষ করেই বন্ধুটি দল থেকে বেরিয়ে গেল। তারপর ছুটল ডান দিকের উপত্যকার ওপর দিয়ে।
দলপতি সঙ্গে সঙ্গে ভাইকিং বন্ধুর দিকে ঘোড়া ছোটাল। এতটা পথ হেঁটে হেঁটে ক্ষুধার্ত-তৃষ্ণার্ত বন্ধুটি বাঁধা দু’হাত নিয়ে বেশি দূর যেতে পারল না। দলপতি ঘোড়া ছুটিয়ে অল্পক্ষণের মধ্যেই তাকে ধরে ফেলল। তলোয়ার কোষমুক্ত করে মুহূর্তে ঢুকিয়ে দিল বন্ধুটির পিঠে। বন্ধুটি মুখে একটা শব্দ করল। তারপর ঘাসে-ঢাকা জমির ওপর মুখ থুবড়ে পড়ল।
ঘটনাটা খুব দ্রুত ঘটে গেল। ভাইকিংদের চোখের সামনে। ওরা প্রথমে বুঝে উঠতে পারল না কী করবে। পরক্ষণেই শাঙ্কো চিৎকার করে উঠল, ও-হো-হো। সঙ্গে সঙ্গে ভাইকিং বন্ধুরাও চিৎকার করে উঠল, ও-হো-হো। প্রথমে শাঙ্কো ছুটে চলল দলপতির দিকে। পেছনে আরো কয়েকজন। হ্যারি বুঝল ভীষণ বিপদ। হ্যারি চিৎকার করে বলল, শাঙ্কো মাথা গরম করো না। কথা শোনো৷ বাঁধা হাত নিয়ে লড়াই হয় না। এবাবে লড়ইয়ে নামলে আমার কেউ বাঁচবো না। ফিরে এসো।
ঘোড়ায় বসা দলপতিকে শাঙ্কো হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলল, আপনি আমাদের বন্ধুকে মারলেন কেন? ও তো ধরা পড়তই। তবে কেন ওকে মেরে ফেললেন?
দলপতি বলল, এইরকম মৃত্যু দেখে আর কেউ পালাতে যাবে না।
শাঙ্কো আর অন্য বন্ধুরা মৃত বন্ধুটির কাছে এসে তাকে ঘিরে দাঁড়াল। তার মুখের দিকে চেয়ে কেঁদে ফেলল। অন্য বন্ধুদের চোখেও জল এলো। ততক্ষণে হ্যারি ছুটে এসেছে। মৃত বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে হ্যারি কেঁদে ফেলল। জলে-ভেজা চোখে দলপতির দিকে তাকিয়ে বলল, আমাদের নিরস্ত্র বন্ধুটিকে এভাবে হত্যা করলেন কেন? ও তো আপনাদের কাউকে আক্রমণ করেনি।
দলপতি বলল, ওসব বলে লাভ নেই। কাউকে পালাতে দেখলেই মেরে ফেলবো। চলো সব, দলে ঢোকো।
–না, বন্ধুটি শেষকৃত্য না করে আমরা যাবো না। হ্যারি বলল।
দলপতি খোলা তলোয়ার শূন্যে ঘুরিয়ে বলল, সবাই দলে যাও। আজ সন্ধের আগেই আমাদের সেভিল্লে পৌঁছেতে হবে।
হ্যারি চেঁচিয়ে বলল, না, আমাদের মৃত বন্ধুকে ফেলে আমরা যাবো না।
