ফ্রান্সিস বলল, আমাদের কয়েদখানায় না রেখে এই জাহাজেই বন্দি করে রাখতে পারেন। আপনাদের যোদ্ধারা পাহারায় থাকবে।
না না, তোমাদের সবাইকে কয়েদখানায় থাকতে হবে। দলনেতা মাথা নেড়ে বলল।
–তাহলে একটা অনুরোধ, আমাদের সঙ্গে রয়েছেন আমাদের দেশের রাজকুমারী। তিনি কয়েদখানার অত কষ্ট সহ্য করতে পারবেন না। তাকে এই জাহাজেই বন্দি করে রাখুন। ফ্রান্সিস বলল।
দলনেতা বলল, সেসব রাজা ফার্নান্দোকে বলো।
–রাজা ফার্নান্দোকে কোথায় পাবো? ফ্রান্সিস বলল।
রাজা সেভিল্লায় আছেন। দলনেতা বলল।
সেভিল্লা কোথায়? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–এই হুয়েনভা থেকে মাইল কুড়ি উত্তরে। দলনেতা বলল।
–তাহলে কি আজ রাতে আমাদের সেভিল্লায় নিয়ে যাওয়া হবে? হ্যারি জিজ্ঞেস করল।
–না, কাল সকালে রওনা হবো আমরা। দলনেতা বলল।
এবার ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে হ্যারি আর শাঙ্কোর কাছে সরে এলো। নিজেদের দেশীয় ভাষায় বলল, আমি পালাচ্ছি। কেউ লড়াইয়ে নামবে না। সময়-সুযোগমতো সব করবো। তোমরা এগিয়ে এসে আমাকে আড়াল করে দাঁড়াও।
ফ্রান্সিসের বন্ধুরা আস্তে আস্তে ফ্রান্সিসকে আড়াল করে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে ডেক-এ বসে পড়ল। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে কিছুটা এসেই গড়িয়ে গিয়ে মাস্তুলের পেছনে চলে এলো। হাঁপাতে হাঁপতে একটুক্ষণ দাঁড়াল। তারপর ডেক-এর ওপর শুয়ে পড়ে দ্রুত গড়িয়ে সিঁড়িঘরের পেছনে চলে এলো। রাজা ফার্নান্দোর সৈন্যরা আর ওকে দেখতে পাবে না। ফ্রান্সিস দ্রুত পায়ে ছুটে গিয়ে হালের কাছে। এলো। হাল জড়িয়ে ধরে হালের কাঠের খাঁজে খাঁজে পা রেখে জলের কাছে নেমে এলো। তারপর হাল ধরে জলের মধ্যে আস্তে নিজের শরীরটা ডুবিয়ে দিল। জলে কোনো শব্দ হলো না।
ওদিকে ভাইকিং বন্ধুরা গজরাতে লাগল। ওরা এভাবে কাপুরুষের মতো বিনা যুদ্ধে বন্দিদশা মেনে নিতে পারছিল না। হ্যারি দেশীয় ভাষায় বলল, ভাইসব, ফ্রান্সিস পালিয়েছে। ও বলে গেছে আমরা যেন লড়াই না করি। সব মেনে নিই। হ্যারি থামল। তারপর বলল, ফ্রান্সিস মুক্ত। এখন আমাদের দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। ফ্রান্সিস আমাদের মুক্তির ব্যবস্থা করবেই। ভাইকিং বন্ধুরা একটু শান্ত হলো।
ফার্নান্দোর সৈন্যরা ভাইকিংদের হাত বাঁধার জন্যে দড়ি জোগাড় করে নিয়ে এলো। এবার হ্যারি দলনেতার দিকে তাকিয়ে বলল, দেখুন, আমাদের বন্ধুরা ফিরে আসছে না দেখে আমরা কেউ এখনও পর্যন্ত খাইনি। আগে আমাদের খেতে দিন। তারপর যেখানে নিয়ে যেতে চান নিয়ে যাবেন।
একটু ভেবে নিয়ে দলনেতা বলল, বেশ, খেয়ে নাও। আমার সৈন্যরা পাহারায় থাকবে। কেউ পালাবার চেষ্টা করলেই মরবে।
ভাইকিংরা সিঁড়ির দিকে চলল। সৈন্যরাও পেছনে পেছনে চলল। ভাইকিংরা খেতে গেল। সৈন্যরা পাহারায় রইল।
খেতে খেতে মারিয়া বলল, হ্যারি, আমার জন্যেই তোমাদের এত কষ্ট।
হ্যারি হেসে বলল, কী যে বলেন! আপনি না থাকলেও এই রাজা ফার্নান্দোর যোদ্ধারা আমাদের বন্দি করতো। যাকগে, আপনি এসব নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন না।
খাওয়াদাওয়া সেরে হ্যারি ডেক-এ উঠে এলো। দেখল দলনেতা আরো সৈন্য আনিয়েছে। ভাইকিংরা ডেক-এ উঠে আসতে লাগল। সবাইকে সারি দিয়ে দাঁড় করানো হলো। তারপর তাদের দু’হাত দড়ি দিয়ে বাঁধা হতে লাগল। সবার হাত বাঁধা হলো শুধু মারিয়ার হাত বাঁধা হলো না।
দলনেতা গলা চড়িয়ে ভাইকিংদের বলল, সবাই জাহাজঘাটায় গিয়ে দাঁড়াও।
হ্যারিরা একে একে পাটাতনের ওপর দিয়ে নেমে এলো। রাজা ফার্নান্দোর সৈন্যরাও নেমে এলো। হ্যারিদের ঘিরে দাঁড়াল।
দলনেতা হাত তুলে পুবদিক দেখিয়ে গলা চড়িয়ে বলল, চলো। হ্যারিরা হাঁটতে শুরু করল। সৈন্যরাও ওদের দু’পাশ থেকে ঘিরে হাঁটতে লাগল।
তখন সন্ধে হয়েছে। হুয়েনভা বন্দরের রাস্তায় লোকজনের তেমন ভিড় নেই। রাস্তার এখানে-ওখানে মশাল জ্বলছে। দু’পাশের বাড়িঘরেও আলো দেখা যাচ্ছে। বন্দি হ্যারিদের দেখে পথচলতি অনেকেই দাঁড়িয়ে পড়ে দেখল ওদের।
একসময় বাড়িঘর শেষ হলো। ডানদিকে একটা প্রান্তর। সেটা পার হয়ে হ্যারিরা এখটা পাথরের বাড়ির কাছে এলো। বাড়িটা তেমন বড়ো না। দরজার কাছে মশাল জ্বলছে। হ্যারি মশালের আলোয় দেখল লোহার দরজা। তাতে তালা ঝুলছে। বুঝল আবার কয়েদঘরের বন্দিজীবন।
লোহার দরজা ঠং ঠং শব্দে খোলা হলো। হ্যারিদের ঠেলে ঠেলে ঢোকানো হলো। ঘরের মধ্যে দেয়ালের খাঁজে দুটো মশাল আটকানো। মশাল দুটো জ্বলছে। হ্যারি চারদিকে তাকাল। কয়েদঘর যেমন হয় তেমনি ঘর। ছাদের কাছে দু’দিকে দুটো ঘুলঘুলির মতো। মেঝেয় পুরু করে শুকনো ঘাসের বিছানা। হ্যারি দেখল আগে থেকেই বন্দি হয়ে আছে। জনা দশেক লোক।
হ্যারি মারিয়াকে বলল, রাজকুমারী, আমার সঙ্গে আসুন। ঘরের এক কোণায় হ্যারি না এলো। মারিয়াকে বসতে বলল। নিজেও বসল। হ্যারির শরীর বরাবরই দুর্বল। ক্লান্তিতে সে বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারল না। শুয়ে পড়ল। বাঁধা হাত রাখল কপালের ওপর। মারিয়া আস্তে আস্তে বলল, এ তো কষ্টের শুরু। কপালে আরও দুর্ভোগ আছে। তবে সান্ত্বনা একটাই, ফ্রান্সিস মুক্ত। ও আমাদের মুক্তির ব্যবস্থা করতে পারবে।
-হ্যাঁ, এখন ওটাই একমাত্র ভরসা। হ্যারি বলল।
.
ওদিকে ফ্রান্সিস সাঁতার কেটে সমুদ্রতীরে এলো। পেছল পাথরে সাবধানে পা রেখে রেখে তীরে উঠে এলো। ভেজা পোশাক নিয়েই একটা বড়ো পাথরের চাইয়ের ওপর বসল। ওখান থেকে জাহাজ-ডেক, মানুষজন দেখা যাবে।
