ফ্রান্সিস মারিয়াকে ডাকতে যাবে তখনই পেছন ফিরে দেখল মারিয়া দাঁড়িয়ে আছে। ফ্রান্সিস মারিয়ার ডান হাত ধরে বলে উঠল-শাঙ্কো–ছোটো দক্ষিণের দেয়ালের দিকে।
তিনজনে অন্ধকার মাঠে নেমে এলো। তারপর ছুটল দক্ষিণদিকের দেয়ালের দিকে। খাতিব আর যোদ্ধারাও সেদিকেই ছুটল।
ফ্রান্সিস ভাঙা দেওয়ালের জায়গায় এলো। লাথি মেরে কয়েকটা আলগা পাথরের পাটা ভাঙল। এখন পার হওয়া সহজ হল।
ফ্রান্সিসরা দেয়াল পার হয়ে বাইরে অন্ধকার রাস্তায় এলো। ফ্রান্সিসদের দেখাদেখি খাতিব আর খাতিবের যোদ্ধারাও ভাঙা দেয়াল পার হল। তখনই দুর্গে হৈ হৈ চিৎকার শোনা গেল। আলতোয়াইফের সৈন্যরা চিৎকার করতে লাগল–কয়েদী পালাচ্ছে। সাবধানে। ধরো সবাইকে। অন্ধকার মাঠে সৈন্যরা মশাল হাতে এদিক ওদিক ছুটোছুটি করতে লাগল। ফ্রান্সিসরা কোণদিক দিয়ে পালিয়েছে সৈন্যরা অন্ধকারে তা দেখতে পায় নি।
এবার ফ্রান্সিসরা একটু সমস্যায় পড়ল। জাহাজঘাটা কোণদিকে? ফ্রান্সিস খাতিবের এক যোদ্ধাকে থামাল। বলল–জাহাজঘাটটা কোণদিকে। যোদ্ধাটি ডানহাত দক্ষিণের দিকে তুলে বলল–ঐদিকে।
ফ্রান্সিসরা দক্ষিণমুখো ছুটল। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–মারিয়া ছুটতে পারবে তো?
–কিছু ভেবোনা। তোমাদের মতো ছুটতে না পারলেও আমি আমার মতো ছুটবো।
ফ্রান্সিসরা হাঁপাতে হাঁপাতে জাহাজঘাটায় পৌঁছল।
পাটাতনের ওপর দিয়ে ছুটে ওরা জাহাজে উঠল। ফ্রান্সিস হাঁপাতে হাঁপাতে প্রথমেই ছুটে গেল নোঙরের কাছে। পেছনে শাঙ্কো। দু’জনে নোঙরের দড়ি টেনে টেনে তুলল। জাহাজ হাওয়ার ধাক্কায় ঘুরে যেতে লাগল। ফ্রান্সিস ছুটে গিয়ে জাহাজ থেকে পাতা পাটাতনটা তুলে ফেলল। জাহাজটা ঘুরে গেল।
ওদিকে মারিয়ার ডাকাডাকিতে হ্যারি বিস্কোরা জাহাজের ডেক-এ উঠে এলো। হ্যারি ছুটে গিয়ে ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরল। ভাইকিং বন্দুরা উঠে আসতে লাগল। ফ্রান্সিস, মারিয়া আর শাঙ্কোকে ঘিরে দাঁড়াল। ধ্বনি তুলল–ওহোহো।
ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসব, আমাদের এক্ষুণি এই বন্দর থেকে পালাতে হবে। পাল খুলে দাও দাঁড়িয়া দাঁড় ঘরে যাও। জাহাজ যত জোরে পায়রা চালাও।
ভাইকিং বন্ধুরা কাজে নেমে পড়ল। অল্পক্ষণের মধ্যে জাহাজ মাঝ সমুদ্রে চলে এলো।
তখনই পুবদিকে গভীর কমলা রঙের সূর্য উঠল। আলো ছড়ালো সমুদ্রে জাহাজে।
জাহাজ চলল।
দিন তিনেকের মাথায় ফ্রান্সিসদের জাহাজ এলো হুয়েনভা বন্দরে। কাদিজ বন্দরেই এই হুয়েনভা বন্দরের নাম ওরা জেনে এসেছিল। ওরা নিশ্চিন্ত মনেই ওদের জাহাজ বন্দরে ভেড়াল। তখন সকাল। জাহাজ থেকে কাঠেরতক্তা তির পর্যন্ত পাতা হলো। কয়েকজন ভাইকিং বন্ধু বন্দর শহরটা দেখতে নেমে গেল।
দুপুরে খাওয়াদাওয়ার সময় হয়ে গেল তখনও বন্ধুরা ফিরল না। আরো সময় গেল। দুপুর পেরিয়ে বিকেলের মুখোমুখি সময় তখন। ফ্রান্সিসরা কেউ তখনও খেল না।
বিকেলের দিকে দেখা গেল বন্ধুদের বন্দি করে একদল যোদ্ধা ফ্রান্সিসদের জাহাজে উঠে আসছে। কেন ওর বন্ধুদের বন্দি করা হয়েছে, ফ্রান্সিস তার কোনো কারণই বুঝতে পারল না। মাথায় শিরস্ত্রাণ, বুকে বর্ম,হাতে খোলা তলোয়ার, যোদ্ধারা ফ্রান্সিসদের জাহাজে উঠল। ফ্রান্সিস,হ্যারি এগিয়ে গেল। যোদ্ধাদেরদলনেতা সবার আগে ছিল।একটু লম্বামতো। মুখে দাড়ি-গোঁফ। দেখেই ফ্রান্সিস বুঝল লোকটা চড়া মেজাজের মানুষ।
হ্যারি বলল, কী ব্যাপার বলুন তো?
দলনেতা বলল, শুনলাম তোমরা ভাইকিং। ক্যামেরিনাল বন্দর হয়ে এখানে এই হুয়েনভা বন্দরে এসেছে।
হ্যারি বলল, হ্যাঁ।
তোমরা জানো কি এই অঞ্চলের রাজা হচ্ছেন ফার্নান্দো? দলনেতা বলল।
–সেটা আমরা কী করে জানবো? হ্যারি বলল।
–ক্যামেরিনাল অঞ্চলে এখন রাজত্ব করছে ফার্নান্দোর ভাই গার্সিয়া।
–হ্যাঁ, শুনেছি। হ্যারি বলল।
–ফার্নান্দো আর গার্সিয়ার মধ্যে ভীষণ রেষারেষি।
–ও। হ্যারি মুখে শব্দ করল।
যে কোনোদিন দুই ভাইয়ে যুদ্ধ লেগে যেতে পারে।
–আমরা এসব কিছুই জানি না। হ্যারি বলল।
–তোমরা সব জানেনা। দলনেতা চিৎকার করে বলে উঠল।
–না, আমরা জানি না। ফ্রান্সিস বলল।
দলনেতা আবার চিৎকার করে উঠল, তোমরা গার্সিয়ার গুপ্তচর। গার্সিয়া তোমাদের এখানে পাঠিয়েছে গোপনে সব খবর নিতে আমাদের ক’টা যুদ্ধজাহাজ, সৈন্যসংখ্যা কত, কোন্ কোন্ জায়গা আমরা সুরক্ষিত রেখেছি, কোণগুলি আমাদের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা।
ফ্রান্সিস বুঝল, খুবই বিপদে পড়েছে ওরা। এই দলনেতাকে কিছু বলে লাভ নেই। দলনেতার এখন যা মনের অবস্থা,ফ্রান্সিসরা এসব ব্যপারে যে জড়িত নয় সেটা কিছুতেই বোঝানো যাবে না। তবু ফ্রান্সিস হাল ছাড়ল না। যুক্তি দিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করল। বলল, দেখুন, আমরা বিদেশি। আপনাদের কোনো ব্যাপারেই আমরা জড়িয়ে নেই। জড়াবার বিন্দুমাত্র ইচ্ছেও নেই।
–আমি বিশ্বাস করি না। দলনেতা বলল।
–গুপ্তচরবৃত্তি করে আমাদের কী লাভ বলুন! হ্যারি বলল।
–গার্সিয়া তোমাদের অনেক স্বর্ণমুদ্রা দিয়েছে। দলনেতা বলল।
–বেশ, আপনারা জাহাজে তল্লাশি চালিয়ে দেখুন। ফ্রান্সিস বলল।
–সেসব পরে হবে। এখন তোমাদের সবাইকে বন্দি করা হলো। দলনেতা বলল। তারপর যোদ্ধাদের দিকে তাকিয়ে বলল, এই জাহাজের কোথাও থেকে দড়ি নিয়ে আয়। টুকরো করে দড়ি কেটে সকলের হাত বাঁধ। তারপর কয়েদখানায় নিয়ে চল।
