একটা গাছের তলায় ফ্রান্সিসদের আনা হল। দেখা গেল আগে থেকেই কয়েকজন। খাতিবের যোদ্ধাকে ওখানে বন্দি করে রাখা হয়েছে। ফ্রান্সিসদেরও হাত বেঁধে ওখানে রাখা হল। আলতোয়াইফের সৈন্যরা মারিয়ার হাত বাঁধতে গিয়ে বেশ আশ্চর্য হল। মেয়েটি কে? ওখানে এলো কী করে? ওরা মারিয়াকে কিছু বলল না। হাতও বাঁধল না।
ততক্ষণে লড়াই শেষ। বিদ্রোহী খাতিবের যোদ্ধারা হেরে গেল। অনেক যোদ্ধা মারা গেল। অনেকে বন্দি হল। খাতিবও বন্দি হল।
ভোর হল। সূর্য উঠল। বনের ডালপাতার ফঁক দিয়ে উজ্জ্বল রোদের আকাশ দেখা গেল।
আলতোয়াইফের সৈন্যরা বন্দিদের সারি দিয়ে দাঁড় করাল। তারপর হুকুম দিল– এবার চলো।
বনজঙ্গলের মধ্যে দিয়ে বন্দিরা চলল। পেছনে সৈন্যরা। সৈন্যদের দলপতি গলা চড়িয়ে বলে উঠল–কেউ পালাবার চেষ্টা করবে না। পালাতে গেলে মরবে।
বেশ কিছুক্ষণ পরে বন্দিরা বনের বাইরে এলো। দেখল আলতোয়াইফের ছোটো দুর্গটার কাছে এলো।
পরিখা পার হয়ে বন্দিদের দুর্গের বিরাট কাঠের দরজার সামনে আনা হল। ঘর ঘর শব্দে দরজা খুলে গেল। বন্দিরা ঢুকল। পেছনে সৈন্যরা।
দুটো টানা পাথরের ঘর। বোঝাই গেল কয়েদখানা। কাছে আসতে দেখা গেল কয়েকজন সৈন্য পাহারা দিচ্ছে। তলোয়ার খোলা নয়। কোষবদ্ধ।
কয়েদখানার লোহার দরজা–ঢং ঢং শব্দে খোলা হল। ফ্রান্সিসরা ঘরটায় ঢুকল। দেখল–ঘরটায় জানলা বলে কিছু নেই। ছাদটার কোণায় ছাদ একটু ভাঙা। খোদলমতো। ওখান দিয়েই আলো হাওয়া আসছে।
এই সকালেও দেয়ালের খাঁজে রাখা মশাল জ্বলছে। তাতে অন্ধকার ভাবটা কেটেছে। মেঝের বিছানা বলে কিছু নেই। কাঠের পাটাতন পরপর পাতা। এটাই বিছানা।
ফ্রান্সিস দরজার কাছাকাছি বসল। মারিয়া শাঙ্কোও বসল। একটু হাঁপাতে হাঁপাতে
মারিয়া বলল–আমার জন্যেই তোমাদের এত ভোগান্তি।শাঙ্কো বলল–রাজুকমারী A এসব ভাববেন না। এতে আপনার মন খারাপ হবে। সহ্যক্ষমতা কমে যাবে। দেখা
যাক–আমরা মুক্তি পাই কি না। এখন শুধু মুক্তির কথা ভাবতে হবে। ফ্রান্সিস কী ভাবতে ভাবতে বলল–শাঙ্কো–আমরা যখন দুৰ্গটা ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম তখন কোনদিকের পাথরের দেয়ালের একটা জায়গা বেশ ভাঙা ছিল দেখেছিলাম। শাঙ্কো একটু ভেবে বলল-দক্ষিণ দিককার দেয়ালটার মাঝামাঝি পাথরের পাটাগুলো খসে পড়েছে। সবটা নয়। তবে পাথরের পাটাগুলো আলগা হয়ে গেছে।
–ঠিক ঠিক বলেছো শাঙ্কো। এখন আমার মনে পড়ছে। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস চারদিকে ভালো করে দেখল। বুঝল এখান থেকে পালাতে হলে দরজা দিয়েই পালাতে হবে। ফ্রান্সিসের নজরে পড়ল দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে খাতিব বসে আছে। দু’চোখ বোজা। ফ্রান্সিস উঠে আস্তে আস্তে খাতিবের কাছে এলো। গলা নামিয়ে বলল– খাতিব–আপনারা সাহায্য করলে আমরা এই কয়েদঘর থেকে পালাতে পারি। খাতিব চোখ খুলল। বলল–কীভাবে?
–পাহারাদাররা যখন খাবার নিয়ে দুপুরবেলা আসবে তখন ওরা কীভাবে খেতে দেয় সেটা লক্ষ্য করতে হবে। তখনই আমি ঠিক করবো কখন কীভাবে পালাবো।
–বেশ–উপায় ভাবুন। খাতিব বলল। ফ্রান্সিস নিজের জায়গায় চলে এলো। অপেক্ষা করতে লাগল কখন দুপুরের খাবার খেতে দেয়।
দুপুরে সৈন্যরা তিনজন খাবারের ঝুড়ি হাতে আর কাঠের গামলায় ঝোল নিয়ে এলো। পাহারাদার দু’জন দরজার কাছে খোলা তলোয়ার নিয়ে দাঁড়াল। দরজা খোলা হল। সৈন্যরা খাবার নিয়ে ঢুকল।
খেতে খেতে ফ্রান্সিস নিম্নস্বরে বলল–শাঙ্কো তিনজন ঢোকে। দু’জন পাহারায় থাকে। রাতে খাবার দেবার সময় তুমি একজন পাহারাদারকে কাবু করবে আমি অন্যটাকে ধরবো। যারা খাবার দেবে তাদের সামলাবে খাতিবের যোদ্ধারা।
সন্ধের একটু পরে ফ্রান্সিস খাতিবের কাছে গেল। বলল–পরিকল্পনা ছকে ফেলেছি।
–কী পরিকল্পনা করলেন?
–খাবার দিতে তিনজন সৈন্য ঘরের মধ্যে ঢোকে। তাদের আপনারা আটকাবেন। তাদের যেভাবেই হোক এই ঘরেই বন্ধ করে রাখা হবে। ততক্ষণ আমি আর আমার বন্ধু দু’জন পাহারাদারকে আহত করবো যাতে আমাদের পেছনে ছুটতে না পারে। এ সবের মধ্যেই আপনাদের আমাদের পালাতে হবে।
খাতিব মাথা ওঠানামা করে বলল–পরিকল্পনা খুবই ভালো আর কার্যকরী। দাঁড়ান আমাদের যোদ্ধাদের বলছি।
খাতিব উঠে দাঁড়াল। বলল–সবাই শোনো। খাতিবের সৈন্যরা এগিয়ে এলো। খাতিব বলল–রাতে যখন তিনজন সৈন্য খাবার দিতে আসবে তখন তোমরা ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ওদের কোমরে গোঁজা তলোয়ার কেড়ে নেবে। তারপর খোলা দরজা দিয়ে বাইরে এসে দরজার লোহার হুড়কো টেনে দেবে যাতে সৈন্য তিনজন পালাতে না পারে। এবার সবাই তৈরি থেকো।
রাত হল। তিনজন সৈন্য খাবার নিয়ে এসে দরজায় দাঁড়াল। দু’জন পাহারাদারের একজন দরজা খুলে দিল। ঢং শব্দ তুলে দরজা খুলে গেল।
তিনজন খাবার নিয়ে ঢুকল। তখনই খাতিবের কয়েকজন যোদ্ধা সৈন্য তিনজনের এ ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ওদের খাবারের ঝুড়ি কাঠের গামলা সব ছিটকে গেল। ওরা কাঠের মেঝের ওপর উবু হয়ে পড়ল। খাতিবের যোদ্ধারা তিনজন সৈন্যের কোমর থেকে ঝোলানো তলোয়ার খাপ থেকে খুলে ফেলে যোদ্ধাদের একজন বলল–কেউ কোনোরকম শব্দ করবে না।
ওদিকে ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো খোলা তলোয়ার হাতে দু’জন সৈন্যের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস একজনের কাঁধে–এক রদ্দা কষাল। ওর হাত থেকে তলোয়ার খসে পড়ল। শাঙ্কো অন্যটার পেটে ঢু মারল। সেই সৈন্যটি দু’হাত উঁচু করে চিৎ হয়ে মেঝেয় পড়ে গেল।
