খাওয়া শুরু হল। ফ্রান্সিস বরাবর যা বলে তাই বলল–পেটপুরে খাও। ভালো না লাগলেও খাও। এতেই শরীর ভালো থাকবে। সব সময় নিজেকে তৈরি রাখো।
খাওয়াদাওয়া শেষ হল। একজন যোদ্ধা এঁটো পাতাগুলো নিয়ে গেল। ঘরের বাঁ কোণায় জলের জালাটা থেকে কাঠের গ্লাস দিয়ে জল তুলে তুলে খেল সবাই।
একজন দু’জন করে আস্তে আস্তে সবাই শুয়ে পড়ল। মেঝেয় লম্বা লম্বা শুকনো ঘাস পাতা। তার ওপরে শোয়া।
ফ্রান্সিস ঘুমোতে পারল না। অনেক চিন্তা মাথায়। কী করে অক্ষত শরীরে পালানো যায় তার উপায় ভাবতে লাগল। ফ্রান্সিস দু’হাতের তেলোতে মাথা রেখে আকাশের দিকে তাকাল। ঘরটার ছাদ বলে তো কিছু নেই। কালো আকাশে অজস্র তারার ভিড়। সেই দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ফ্রান্সিসের দেশের বাড়ির কথা মনে পড়ল। কতদূরে সেই দেশ বাড়ি। পাখির পালকে তৈরি শুভ্র বিছানা। নরম বালিশ। আঃ কী আরাম। ফ্রান্সিস মাথা ঝাঁকিয়ে ফিরে উঠে বসল। মারিয়া তখনও ঘুমোয় নি। মারিয়াও উঠে বসল। বলল–কী হল ফ্রান্সিস? কিছু না-আজেবাজে চিন্তা। ফ্রান্সিস বলল।
–আর রাত করো না। ঘুমিয়ে পড়ো। মারিয়া বলল।
ফ্রান্সিস শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করলে। ততক্ষণে মারিয়াও শুয়ে পড়েছে। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়ল।
পরদিন ফ্রান্সিসরা সকালের খাবার খেল। দুপুরেও খেল। সন্ধে হল। রাত নামল। রাত বাড়তে লাগল।
বেশ রাতে বিদ্রোহী নেতা খাতিব এলো। সঙ্গে আট-দশজন যোদ্ধা। ওরা পাশের ঘরটায় গিয়ে বসল।
তখনই দলপতির সেই যোদ্ধাটি ফ্রান্সিসের কাছে এলো। বলল–খাতিব তোমাদের ডাকছেন।
–বেশ চলো। ফ্রান্সিস উঠে বসল। শাঙ্কো বলল–তুমি একা যাবে?
–হা হা–তোমরা ঘুমোও। ফ্রান্সিস বলল।
ঘরের পাথরের দেয়ালের খাঁজে মশাল জ্বলছে। সেই আলোয় দেখে দেখে ফ্রান্সিস পাশের ঘরে এলো। দলনেতা ওকে খাতিবের কাছে নিয়ে এলো। খাতিব ফ্রান্সিসকে বসতে ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিস বসল। খাতিব বলল–শুনলাম তোমরা ভাইকিং?
–হ্যাঁ দেশে দেশে জাহাজে চড়ে ঘুরে বেড়াই। কোনো ঝুট ঝামেলায় আমরা থাকি না। আমরা কাউকে অবিশ্বাস করি না। আমরা মনে করি সব মানুষই আমাদের বন্ধু।
–শুধু জাহাজে ঘুরে বেড়াও? খাতিব বলল।
–হ্যাঁ। তবে একটা কাজ করি। যদি কোনো দেশে দ্বীপে গুপ্তধন থাকে বুদ্ধি খাঁটিয়ে তা উদ্ধার করি। ফ্রান্সিস বলল।
তারপর খুঁজে পাওয়া গুপ্তধন নিয়ে পালিয়ে যাও। খাতিব বলল।
ফ্রান্সিস একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল–আপনার মতো অনেকেই আমাদের এরকম সন্দেহ করেছে। আমরা কিছু মনে করিনি। নিঃস্বার্থভাবে আমরা পরিশ্রম করে বুদ্ধি খাঁটিয়ে গুপ্ত ধনভাণ্ডার উদ্ধার করি আর যাদের মধ্যে গুপ্তধন প্রাপ্য তাদের হাতেই দিই। এটা মানুষ সহজে বিশ্বাস করে না। তারা আমাদের অবিশ্বাস করে। তাই বলে আমরা কোনো মানুষকে বিশ্বাস করব না? আমরা সবাইকে বিশ্বাস করি। এতে কিন্তু আমরা কখনো খুব ঠকি নি।
–ঠিক আছে–খাতিব বলল–তোমার সঙ্গে কারা আছে?
–আমার একজন বন্ধু আর আমাদের দেশের রাজকুমারী। ফ্রান্সিস বলল।
–সে কি! রাজকুমারী রাজপ্রাসাদের আরাম আয়েস ছেড়ে তোমাদের সঙ্গে এলেন কেন? খাতিব জিজ্ঞেস করল।
–আমি রাজকুমারীর স্বামী। আমি যেখানে যাবো তিনিও সেখানে যাবেন। যত কষ্টকর জীবনই হোক আমি তা মেনে নি, বলে উনিও মেনে নেন। ফ্রান্সিস বলল।
–হুঁ। তোমার সঙ্গী আর কেউ নেই? খাতিব জিজ্ঞেস করল।
–আছে। আমার পঁচিশজন বন্ধু এখানকার কাদিজ জাহাজঘাটায় আমাদের জাহাজে আছে। ফ্রান্সিস বলল।
তুমি যা বললে সেসব সত্যি কিনা–আমরা খোঁজ করে দেখবো। ততদিন এখানেই
বন্দি থাকতে হবে। খাতিব বলল।
এবার ফ্রান্সিস বলল–আমার সঙ্গে রাজকুমারী রয়েছেন। তিনি এই বন্দিদশায় অসুস্থ হয়ে পড়বেন। রাজকুমারীকে অন্য কোথাও রাখুন।
–দেখছি সেসব। এখন তোমরা এখানেই থাকবে। খাতিব বলল।
ফ্রান্সিস শাঙ্কোদের কাছে চলে এলো।
শাঙ্কো বলল–ফ্রান্সিস–কী কথা হল?
–আমাদের এখন মুক্তি দেওয়া হবে না। এখানেই বন্দি হয়ে থাকতে হবে। আমাদের খোঁজখবর নিয়ে তবে আমাদের মুক্তি দেবে। ফ্রান্সিস বলল।
–তাহলে তো এখন এই বন্দি জীবনই চলবে। শাঙ্কো বলল।
–হ। মারিয়াকে অন্য কোথাও রাখার জন্যে অনুরোধ করলাম। খাতিব অনুরোধ রাখল না। মারিয়াকে এভাবেই থাকতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
সন্ধেবেলা খাতিব এলো। খাতিব ফ্রান্সিসদের পাশের ঘরে রইল।
রাত গম্ভীর হল। সবাই ঘুমিয়ে আছে। ফ্রান্সিসও ঘুমিয়ে পড়েছে। নিঃশব্দ চারদিক। শুধু কখনও কখনও রাতজাগা পাখির ডাক। হঠাৎ প্রচণ্ড চিৎকার স্তব্ধতা ভেঙে খান খান হয়ে গেল। আলতোয়াইফের সৈন্যরা খোলা দরজা দিয়ে চিৎকার করতে করতে ঢুকল। নিরস্ত্র খাতিবের যোদ্ধাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। খাতিবের যোদ্ধারা ঘরের কোণায় জড়ো করে রাখা তলোয়ার বর্শা নেবার জন্যে ছুটে গেল। তারা অনেকেই অস্ত্রাঘাতে মেঝেয় পড়ে গেল। দু’চারজন কোনোরকমে তলোয়ার বর্শা হাতে নিয়ে লড়াইয়ে নামল।
ফ্রান্সিস বুঝল এই লড়াইয়ের সময়ই পালানো ভালো। কারো নজরে পড়বে না। ফ্রান্সিস শাঙ্কো আর মারিয়াকে বলল–পাশের ঘরে ঢুকে পালাতে হবে। চলো।
অন্ধকারে ওরা পাশের ঘরে এলো। সেখানেও লড়াই চলছে। ফ্রান্সিসরা ঘরটা থেকে ভাঙা দরজা পার হয়ে ছুটল। কিন্তু কিছুটা গিয়েই দাঁড়িয়ে পড়তে হল। খোলা তলোয়ার হাতে আলতোয়াইফের সৈন্যরা এগিয়ে এলো। বোঝা গেল সারা বাড়িটাই ওরা ঘিরে ফেলেছে।
