–দিন তাহলে। শাঙ্কো বলল।
কিছু পরে কাঠের লম্বা টেবিলে পাতা পেতে খেতে দেওয়া হল। ফ্রান্সিসরা খেতে লাগল। মারিয়া খেতে খেতে দোকানদারকে বলল–সত্যি আপনার এই খাবারটা বেশ খাওয়ার মতো। আরো দুটো দিন। আমাদের তিনজনকেই। খাবার দেওয়া হল। খাবার খেয়ে তিনজনই খুশি।
খেতে খেতে ফ্রান্সিস দোকানিকে ডাকল। দোকানি এগিয়ে এলো। ফ্রান্সিস বলল– এখানে দেখবার মতো কী আছে?
-দুৰ্গটা দেখেছেন? দোকানদার বলল।
–হ্যাঁ দেখেছি। তবে বাইরে থেকে ভেতরে ঢুকতে দেয়নি। ফ্রান্সিস বলল।
বছরে মাত্র দু’দিন বাইরের লোকেরা দুর্গের ভেতর ঢুকে দেখার অনুমতি পায়। দোকানদার বলল।
–আর কী আছে? দেখবার মতো? ফ্রান্সিস বলল।
–উত্তরের দিকে মাইল কয়েক দূরে আছে একটা বিরাট হ্রদ। এখন অন্ধকারে তো ভালো করে দেখতে পারবেন না। দোকান থেকে বেরিয়ে ফ্রান্সিস বলল–চলো হ্রদটা দেখে আসি। ওরা একসময় হ্রদটার কাছে এলো। চাঁদের আলো অনুজ্জ্বল। হ্রদের জল অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। হ্রদের জলের ওপর নীলচে কুয়াশা ছড়িয়ে আছে। তাই ওপার দেখা যাচ্ছে না। চারপাশের ঝুঁকে পড়া গাছগাছালির গায়ে মাথায় কুয়াশামাখা চাঁদের নিষ্প্রভ আলো–এতেই হ্রদের সৌন্দর্য বেড়ে গেছে।
এবার ফেরা। রাত বেড়েছে। ফ্রান্সিসরা ফিরে আসতে লাগল। একটা মোড়ে এলো তিনজনে। ফ্রান্সিস বলল–ডানদিকের রাস্তা দিয়ে যেতে গেলে দুর্গা ঘুরে যেতে হবে। তাতে পরিশ্রম বেশি সময়ও নষ্ট। বাঁ রাস্তাটা দিয়ে গেলেই রাস্তাটা যেভাবে গেছে। দেখছি–তাতে এই রাস্তা দিয়ে গেলেই অল্পসময়ের মধ্যে জাহাজঘাটায় পৌঁছতে পারবো।
–কিন্তু এই রাস্তাটা বনের মধ্যে দিয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। এই অন্ধকারে বনের মধ্যে দিয়ে যাবো? শাঙ্কো বলল।
–তাতে কী হয়েছে। আমরা তাড়াতাড়ি যেতে পারবো। শাঙ্কো আর আপত্তি করল না। রাস্তা কিছুদূর এসে বনের মধ্যে ঢুকে গেছে। ফ্রান্সিসা বনে ঢুকল। এখন রাস্তাটা পায়ে চলা পথের মতো সরু।
অন্ধকারেই সরু রাস্তাটায় পা টিপে টিপে চলল ওরা। অন্ধকারে চলতে চলতে হঠাৎ ফ্রান্সিস বুঝল ওরা পায়ে চলা পথটা হারিয়ে ফেলেছে। ঝোঁপ জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ওরা যাচ্ছে। ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল–দাঁড়াও। শাঙ্কো আর মারিয়া দাঁড়িয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস বলল
–সমস্যায় পড়লাম। আমরা পথ হারিয়েছি। কোণদিকে জাহাজঘাটা বুঝতে পারছি না।
–কী করবে এখন? শাঙ্কো বলল।
চলো যেদিকে যাচ্ছি সেদিকেই যাই। দেখা যাক কোথায় গিয়ে পৌঁছুই। ফ্রান্সিস বলল।
তারপর তিনজনেই অন্ধকারেই চলল।
হঠাৎ ঝোপেঝাড়ে শব্দ তুলে তিন-চারজন লোক ওদের সামনে এসে দাঁড়াল। ওদের পরনে কানঢাকা জোব্বামতো পোশাকে। কোমরের ফেট্টিতে তলোয়ার গোঁজা।
একজন এগিয়ে এসে বলল–তোমরা কারা? কোথায় যাচ্ছো?
আমরা জাতিতে ভাইকিং বিদেশি। আমরা জাহাজে চড়ে এখানে এসেছি। এই বনের মধ্যে দিয়ে গেলে তাড়াতাড়ি জাহাজটায় পৌঁছবো এই ভেবেই এই রাস্তায় এসেছি।
তাহলে তোমরা জাহাজঘাটায় যাবে। সৈন্যটি বলল।
–হ্যাঁ। কিন্তু মনে হচ্ছে আমরা পথ হারিয়েছি। ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ–তোমরা জাহাজঘাটার উল্টোদিকে যাচ্ছিলে। জাকগে–তোমরা এখানকার আলতোয়াইদের গুপ্তচর। আমাদের ব্যাপারে খোঁজখবর করতে এসেছো। ফ্রান্সিস বুঝল–ভীষণ বিপদ। ও বলে উঠল–আমাদের সঙ্গে আমাদের দেশের রাজকুমারী আছেন। তাকে সঙ্গে নিয়ে আমরা গুপ্তসংবাদ সংগ্রহে আসবো এত বোকা আমরা নই।
যাক গে–তোমাদের বন্দি করা হল। আমাদের বিদ্রোহী নেতা খাতিব কাল রাতে আসবেন। উনি যদি বলেন তোমাদের ছেড়ে দিতে তাহলে তোমরা ছাড়া পাবে। এখন বন্দি থাকতে হবে। সৈন্যটি ইঙ্গিতে ফ্রান্সিসদের আসতে বলল।
ফ্রান্সিসরা সৈন্যদের পাহারায় চলল। ঝোঁপঝাড় জঙ্গল দু’হাতে সরিয়ে ফ্রান্সিসরা চলল। শাঙ্কো ফ্রান্সিসের কানের কাছে মুখ এনে মৃদুস্বরে বলল–ফ্রান্সিস আমরা এই অন্ধকারে পালাতে পারি।
–মারিয়া রয়েছে। পালাবার চেষ্টা করলে ধরা পড়ে যাবো। তখন বিপদ বাড়বে। তার চেয়ে চলোকয়েদখানা তো আমাদের কাছে নতুন কিছু নয়। কয়েদঘরে আটক থাকা আমাদের অভ্যেস হয়ে গেছে। চিন্তা মারিয়াকে নিয়ে। ওর তো অত কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা নেই। ফ্রান্সিস বলল।
সবাই ঝোঁপঝাড় জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলল। বনের বেশ ভেতরে ঢুকল যোদ্ধারা। তখনই অন্ধকারে দেখা গেল একটা পাথরের বাড়ি। বেশ বড়ো! ভাঙা বাড়ি।
যোদ্ধারা বাড়ির দরজার কাছে গেল। অন্ধকারে দেখা গেল ভাঙা পাথরের দরজা। সবাই ঘরটায় ঢুকল। ঘরটা বেশ বড়ো। ফ্রান্সিস ওপরে তাকিয়ে দেখল আকাশ দেখা যাচ্ছে। তারায় ভরা আকাশ। ছাদ বলে কিছু নেই।
ফ্রান্সিস দেখল অনেক যোদ্ধা। শুয়ে বসে আছে। সঙ্গের যোদ্ধাটি ফ্রান্সিসদের বলল– তোমরা এ ঘরে থাকবে। তোমাদের হাত পা বাঁধা হল না। পালাবার চেষ্টা করলে মরবে।
ফ্রান্সিস ঘরটার কোণায় দেয়াল ঘেঁষে বসল। মারিয়া শাঙ্কোও বসল–এখন কী করবে?
–বন্দি জীবন মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। এখন দেখা যাক বিদ্রোহী নেতা খাতিব এসে আমাদের কী করে। এখন কিছু করা যাবে না। ফ্রান্সিস বলল।
প্রায় ঘণ্টা খানেক পরে যোদ্ধাদের মধ্যে তিন-চারজন যোদ্ধা এসে দাঁড়াল। যোদ্ধারা সব উঠে বসল। আগত যোদ্ধাদের হাতে বড়ো বড়ো কাঁচা পাতা। একজন যোদ্ধা সকলের সামনে পাতা পেতে দিল। যোদ্ধাকে অন্য যোদ্ধাটি একটা বড়ো ঝুড়ি থেকে প্রত্যেককে চারটে করে কাটা রুটি দিল। অন্য যোদ্ধাটি কাঠের বড়ো পাত্র থেকে পাখির মাংস ঝোল দিতে লাগল।
