দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর ভাইকিং বন্ধুরা ফ্রান্সিসের কাছে এলো। বলল, ফ্রান্সিস, এখানে পড়ে থেকে শুধু দেরিই হবে। জাহাজ বিকেলেই ছেড়ে দিতে বলো।
ফ্রান্সিস বলল, ঠিক আছে। ফ্লেজারকে গিয়ে বলো আমি বলেছি বিকেলে জাহাজ ছেড়ে দিতে।
বন্ধুরা খুশিতে ছুটল ফ্লেজারকে কথাটা বলতে।
সূর্যাস্ত হবার আগেই জাহাজের নোঙর তোলা হলো। ভাইকিংরা পালের দড়িদড়া ঠিক করল। জোর বাতাসে পালগুলো ফুলে উঠল। জাহাজ পূর্ণবেগে বড়ো বড়ো ঢেউ ভেঙে চলল।
তীরভূমির কাছ দিয়েই জাহাজ চলল।
দু’দিন পরেই জাহাজ এলো কাদিজ বন্দরে। এখন ফ্রান্সিসরা অনেকটা নিশ্চিন্ত। ওরা কাদিজ বন্দরের জাহাজঘাটায় জাহাজ নোঙর করল। কাদিজ বেশ বড়ো বন্দর। অনেক জাহাজ জাহাজঘাটা নোঙর করা আছে।
ফ্রান্সিস ডেক-এ দাঁড়িয়েছিল। বিস্কো ফ্রান্সিসের কাছে এলো। বলল, এই কাদিজ বন্দর বেশ বড়ো। এখানে জাহাজ মেরামতি করা যাবে।দুদিন থেকে আমাদের জাহাজের মেরামতির কাজটা সেরে নাও। এখনও এই জাহাজে চড়ে আমাদের অনেক দূরে যেতে হবে।
বেশ তাই করো, ফ্রান্সিস বলল।
দু’দিন মেরামতির কাজটাজ চলল। সেদিন সন্ধেবেলা মারিয়া বলল-চলো কাদিজ নগরবন্দরটা দেখে আসি।
–অচেনা অজানা জায়গা–এখানে যাওয়া কি ঠিক হবে? ফ্রান্সিস বলল।
–আমরা তো একটু ঘোরাঘুরি করবো। তারপর রাত বেশি হওয়ার আগেই চলে আসবো। মারিয়া বলল।
–ঠিক আছে চলো। দিনরাত শুধু সমুদ্রের জল দেখে দেখে তোমার একঘেয়ে লাগারই কথা। চলো শাঙ্কোকেও নিয়ে যাবো। তুমি তৈরি হয়ে নাও। আমি শাঙ্কোকে ডাকতে যাচ্ছি।
মারিয়া ওর ভাঙা আয়নাটা নিয়ে বসল। নিজের মুখ দেখে বুঝল–ওর মুখের দুধে আলতার রং এখন তামাটে হয়ে গেছে। মাথার চুলও জট পাকাচ্ছে। মারিয়া আয়না রেখে চলল পোশাক বের করতে। নিজের গাউনটা বের করল আবার ফ্রান্সিসের পোশাকটাও বড়ো চামড়ার বাক্স থেকে বের করল। গাউনটা পরল। গাউনটা একটু ঢিলে লাগল। বুঝল ওর জাহাজী জীবন ওর শরীর রোগা করে দিয়েছে। কিন্তু এসব ভেবে আর কী হবে। মারিয়া চুল আঁচড়াতে বসল।
ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে নিয়ে কেবিন ঘরে এলো। মারিয়ার সাজের বহর দেখে মুখ টিপে হাসল। কিন্তু কিছু বলল না। এই সাজ পোশাক নিয়ে রসিকতা করলে মারিয়া মনে দুঃখ পাবে। ফ্রান্সিস চুপ করে রইল।
মারিয়ার সাজগোজ শেষ হল। এবার মারিয়া ফ্রান্সিসের নতুন পোশাকটা বের করল। বলল–এই পোশাকটা পরো। ফ্রান্সিস বলল–কী পাগলামো! আমরা কিনাচের আসরে যাচ্ছি নাকি?
-না–তোমাকে আজ নতুন পোশাক পরতে হবে। মারিয়া বলল।ফ্রান্সিস বলল– কি কাণ্ড!
–না কোনও কথা শুনবো না–তোমাকে পরতেই হবে। মারিয়া বলল।
–ঠিক আছে। তুমি যখন অত করে বলছো। পোশাকটা দাও। ফ্রান্সিস বলল।
মারিয়া ফ্রান্সিসের পোশাকটা দিল। ফ্রান্সিস নিজের পোশাকের ওপরেই নতুন পোশাকটা পরল। মারিয়া ভাঙা আয়নাটা ফ্রান্সিসের মুখের সামনে ধরল। বলল দ্যাখো–তোমাকে কী সুন্দর দেখাচ্ছে। ফ্রান্সিস আয়নাটায় মুখ দেখল।
–মুণ্ডু। ফ্রান্সিস মারিয়াকে আয়নাটা ফিরিয়ে দিল। এবার শাঙ্কো বলল–ফ্রান্সিস তাহলে আমিও নতুন পোশাকটা পরে আসি।
–বেশ তো–ফ্রান্সিস বলল।
মোটামুটি একটু ফিটফাট হয়ে ফ্রান্সিস, মারিয়া আর শাঙ্কো জাহাজ থেকে নেমে এলো।
ওরা দেখল রাস্তায় লোকজনের খুব একটা ভিড় নেই। ফ্রান্সিসরা একটু এগিয়েই একটা ছোটো দুর্গ দেখল। দুর্গ ঘিরে পাথরের দেয়াল। তার বাইরে পরিখা। দুর্গের সদর দরজায় ওরা এলো। চার-পাঁচজন সৈন্য পাহারা দিচ্ছে। কাঠের বিরাট দরজা বন্ধ।
ওরা দুর্গার চারদিকে একবার ঘুরে এলো ফ্রান্সিস লক্ষ্য করল দক্ষিণ দিকের দেওয়ালে ফাটল ধরেছে। দুতিন জায়গায়। জোরে কয়েকটা ধাক্কা দিলে ওখানকার পাথুরে দেয়াল সবটা না হলেও কিছু অংশে ধস নামবে। দেয়ালের ঐ জায়গাগুলো সুরক্ষিত নয়।
সদর দেউড়ির সামনে পরিখার ওপর কাঠের সেতু। ফ্রান্সিস বলল–চলো একটু খোঁজ-খবর নেওয়া যাক। সেতু পার হয়ে ওরা সদর দরজার কাছে এলো।
তখনই একজন লম্বা মতো সৈন্য চড়া গলায় বলে উঠল–তোমরা কারা! ওখানেই থাকো। দরজার কাছে আসবে না। ফ্রান্সিস বলল–আমরা জাতিতে ভাইকিং। জাহাজে দেশ-বিদেশ বেড়িয়ে বেড়ানোই আমাদের কাজ। আমরা দুৰ্গটা দেখছি।
–তা দেখো তবে পাহারাদার সৈন্যদের ফাঁকি দিয়ে দুর্গে ঢোকার চেষ্টা করবে না। সেরকম কিছু করতে গেলে মৃত্যু নিশ্চিত। লম্বামতো লোকটা বলল।
ফ্রান্সিস বুঝল ঐ লম্বামতো লোকটিই দলনেতা। ফ্রান্সিস একটু এগিয়ে দলনেতার কাছে গেল। বলল–এই দুর্গা কার? কে থাকে এই দুর্গে?
–এই দুর্গে থাকেন এখানকার আলতোয়াইফ–মানে রাজা গার্সিয়ারের প্রতিনিধি। দলনেতা বলল।
–ও। ফ্রান্সিস মুখে শব্দ করল।
দুর্গ দেখার পর এলো সবচেয়ে ব্যস্ত এলাকায়। বেশি ভিড়। গাড়ি ঘোড়া চলছে।
ফ্রান্সিস বলল–চলো কিছু খাওয়া যাক। একটা খাবার দোকানে ওরা ঢুকল। বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন দোকানটি। দোকানদার ফ্রান্সিসদের দেখে এগিয়ে এলো। হেসে বলল– আসুন–আসুন। ফ্রান্সিসরা বলল।
ফ্রান্সিস মারিয়াকে বলল–বলো কী খাবে?
মারিয়া বলল-মিষ্টি পিঠে আর পাউরুটি কেটে দিন। দোকানদার বলল–দুধ থেকে একটা বিশেষ মিষ্টি আমরা তৈরি করি। আপনাদের দেব? অনেক লোক আমাদের এই বিশেষ খাবারটি খেতে আসে।
