ফ্রান্সিসদের কেবিনঘরে ফ্রান্সিস বিছানায় আধশোয়া হয়ে আছে। মারিয়া সেলাই ফেঁড়াইয়ের কাজ করছে বিছানায় বসে।
হ্যারি কেবিনঘরে ঢুকল। ওকে দেখে ফ্রান্সিস উঠে বসল। হ্যারি বিছানায় বসতে বসতে বলল, ফ্রান্সিস, এবার কী করবে?
–তোমরা সবাই তো দেশে ফেরার জন্যে আকুল। কাজেই ফ্লেজারকে বলেছি উত্তরমুখো চালাও। ফ্রান্সিস বলল।
সে তো হলো, হ্যারি বলল, কিন্তু কোথায় এলাম, আমাদের দেশই বা কত দূরে কিছুই বুঝতে পারছি না।
মারিয়া বলল, দেখ হ্যারি, আমার যা জ্ঞানগম্যি তাতে বুঝেছি আমরা জিব্রলটার প্রণালী পার হয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে পড়েছি।
–সেটা বুঝলে কী করে? ফ্রান্সিস বলল।
-খুব সহজে। লক্ষ্য করলে বুঝবে গত কদিন জাহাজের দুলুনি খুব বেড়ে গেছে। ভূমধ্যসাগর অঞ্চলটা অনেক শান্ত। তাই জাহাজের দুলুনি খুব বেশি ছিল না। মারিয়া বলল।
–তাহলে রাজকুমারী, আমরা কি স্পেনের কাছাকাছি এসেছি? হ্যারি বলল।
–আমার তো তাই মনে হচ্ছে। তবে এই এলাকায় কোনো দ্বীপ নেই। ডাঙা পেলেই। বুঝবো কোনো দ্বীপ নয়, স্পেনে এসেছি। মারিয়া বলল।
ফ্রান্সিস বলল, একবার চলো তো ফ্লেজারের কাছে যাই। ও কী বলে শুনি।
হ্যারি উঠে দাঁড়িয়ে বলল, চলো।
মারিয়া ওর সেলাই-ফোঁড়াইয়ের জিনিসপত্র একটা চামড়ার থলিতে রাখতে রাখতে বলল, আমিও যাবো। সূর্যাস্ত দেখবো।
তিনজনে একটু পরেই ডেক-এ উঠে এলো। চলল জাহাজচালক ফ্লেজারের কাছে। ফ্লেজার হুইলে হাত রেখে সামনে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ছিল। ফ্রান্সিস বলল, ফ্লেজার, আমরা কোথায় এলাম সেটা কিছু আন্দাজ করতে পেরেছো?
–আমরা ভূমধ্যসাগর থেকে বেরিয়ে এসেছি এটা বুঝতে পারছি। কিন্তু ডাঙার দেখা না পাওয়া পর্যন্ত কিছুই বোঝা যাবে না। ফ্লেজার বলল।
–এখন তো তাহলে শুধু জাহাজ চালিয়ে যাওয়া। হ্যারি বলল।
–হ্যাঁ। ফ্লেজার বলল, উত্তর দিকটা ঠিক রেখে জাহাজ চালিয়ে যাওয়া। হ্যারি বলল।
ফ্লেজারের সঙ্গে কথা বলে তিনজনে ফিরে এসে রেলিং ধরে দাঁড়াল। পশ্চিম দিকে তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে। সূর্যের আলোর গভীর কমলা রঙ মাঝ আকাশ পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে। এবং রং সূর্য অস্ত যাওয়ার পরেও রইল। তারপর আস্তে আস্তে রঙ মুছে গেল। সন্ধ্যা নেমে এলো।
সেদিন ভোর ভোর সময়ে নজরদার পেড্রোর চড়া গলা শেনা গেল, ডাঙা, ডাঙা দেখা যাচ্ছে। যে ভাইকিংরা ডেকে শুয়েছিল তারা উঠে বসল। একজন ছুটল ফ্রান্সিস হ্যারিকে খবর দিতে।
একটু পরেই ফ্রান্সিস আর হ্যারি ডেক-এ উঠে এলো। পেছনে মারিয়াও এলো। ওরা রেলিং ধরে দাঁড়াল। ভোরের নরম রোদে উত্তরদিকে দেখা গেল একটা বন্দর। বেশ কয়েকটা জাহাজ নোঙর করে আছে। জাহাজগুলোতে নানা রঙের বিভিন্ন দেশের পতাকা উড়ছে।
ফ্রান্সিস বলল, হ্যারি, আমরা বন্দরে জাহাজ ভেড়াবো না। এখানেই নোঙর করবো। শুধু শাঙ্কো নৌকোয় চড়ে বন্দরে যাবে। এটা কোন্ দেশের কোণ বন্দর, লোকজন কেমন–এসব জেনে আসবে।
ফ্রান্সিসরা কথা বলছে, তখনই দুই রাঁধুনি ভাইকিং ফ্রান্সিসদের কাছে এলো। বলল, খাদ্য আর জল ফুরিয়ে এসেছে। এই বন্দর থেকেই খাদ্য আর জল নিতে হবে। নইলে কখন ঝড়বৃষ্টিতে জাহাজ কোণদিকে চলে যাবে। আবার কোনো বন্দর পাওয়া যাবে কিনা কে জানে।
ফ্রান্সিস একটু ভেবে বলল, কথাটা ঠিক। তখন অনেক ভাইকিং বন্ধু ফ্রান্সিসকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে। ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে ডাকল। বলল, শাঙ্কো, তুমি একা নৌকোয় চড়ে বন্দরে যাও। সব জেনে এসো। যথেষ্ট খাদ্য আর জল পাবো কিনা সেটাও জেনে এসো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই শাঙ্কো তৈরি হয়ে নিল। দড়ির মই বেয়ে নৌকোয় নেমে নৌকো ছেড়ে দিল। শাঙ্কো শুধু ছোরাটা জামার নীচে নিয়েছে। তলোয়ার নিতে ফ্রান্সিস মানা করেছে। তাই তলোয়ার নেয়নি।
ততক্ষণে ঘরঘর শব্দে নোঙর ফেলা হয়েছে। ফ্রান্সিসদের জাহাজ থেমে রইল। সমুদ্রের বড়ো বড়ো ঢেউয়ের ধাক্কায় দুলতে লাগল।
রেলিং ধরে ফ্রান্সিসরা অপেক্ষা করতে লাগল।
কিছুক্ষণ পরে দুরেশাঙ্কোর নৌকো আসছে দেখা গেল। ফ্রান্সিস তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে শাঙ্কোর নৌকোর দিকে তাকিয়ে রইল। ভাবতে লাগল, আমাদের বিপদ হতে পারে এমন কিছু হলে শাঙ্কো নিশ্চয়ই নৌকোয় উঠে দাঁড়িয়ে সঙ্কেত করবে। কিন্তু দেখা গেল শাঙ্কো আস্তে আস্তে ঢেউয়ের ধাক্কা বাঁচিয়ে নৌকো চালিয়ে আসছে।
জাহাজে নৌকো বেঁধে শাস্কো দড়ির মই বেয়ে ডেকে উঠে এলো। ভাইকিং বন্ধুরা এ ওকে ঘিরে দাঁড়াল। একুট হাঁপাতে হাঁপাতে শাঙ্কো বলল, এটা স্পেনের দক্ষিণ ভাগ। # বন্দরটার নাম ক্যামেরিনাল। এখানকার রাজার নাম গার্সিয়া। এখানে যথেষ্ট খাদ্য আর জল পেতে কোনো অসুবিধা নেই। রাজার যোদ্ধারা কেউ কেউ আমাকে দেখেছে। বুঝেছে আমি বিদেশি। তবু কিছু বলেনি।
এবার ফ্রান্সিস বলল, শাঙ্কো তুমি বিস্কো আর রাঁধুনি বন্ধুদের নিয়ে যাও। খাদ্য-জল আনার জন্যে বস্তা-পীপে সব নাও। সঙ্গে যে নৌকোটা নেবে সেটাতেই থাকবে এসব।
কিছুক্ষণের মধ্যেই শাঙ্কোরা একটা নৌকোয় চড়ে অন্য একটা নৌকো দড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়ে ক্যামেরিনাল বন্দরের দিকে চলল।
দুপুরের একটু আগেই শাঙ্কোরা ফিরে এলো। খাদ্য-জল সব রসুইঘরের পাশে নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা হলো। ফ্রান্সিস মনে মনে বলল, যাক–কয়েক মাসের জন্যে নিশ্চিন্ত।
